Advertisement Banner

পর্ব–৪

পুতিনকে এড়াতে পারেন না মাখোঁ, স্ট্যারমাররা

পুতিনকে এড়াতে পারেন না মাখোঁ, স্ট্যারমাররা
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

ইউরোপে সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয়টি হলো, ঈশ্বরের দোহাই, অন্য পক্ষের সঙ্গে কথা বলবেন না। এটি হয়তো কিছুটা বিরক্তিকর হতে পারে। তাই আমরা এমন এক দৃশ্য দেখছি যেখানে স্টারমার, মেরৎজ, মাখোঁর মতো প্রাপ্তবয়স্ক মানুষেরাও প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে আলোচনা করতে রাজি নন। কোনো আলাপ, কোনো ধারণা, কোনো সৎ বিনিময় নয়।

এটি একটি ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু এটি এতটাই অজ্ঞতাপূর্ণ যে বিশ্বাস করা কঠিন। স্নায়ুযুদ্ধ এবং তার বাস্তবতা সম্পর্কে এটি সত্যিই অবিশ্বাস্য। ইতিহাসবিদ জেফ রবার্টস সম্প্রতি আমাকে অর্থনীতিবিদ জোয়ান রবিনসনের একটি নিবন্ধ দিয়েছেন। তিনি তখন বলেছিলেন, যদি রুশ আধিপত্য বিস্তারের পুরো ভিত্তিটাই ভুল হয়, তাহলে আমাদের পুরো নীতিই অর্থহীন। আমি সেই নিবন্ধটি পড়িনি, তবে পড়ার অপেক্ষায় আছি।

জেফ রবার্টস সম্প্রতি সোভিয়েত-ফিনিশ যুদ্ধ নিয়েও একটি চমৎকার নিবন্ধ লিখেছেন। তিনি আরেকটি মৌলিক বিষয় তুলে ধরেছেন, যা মানুষ সম্ভবত জানবে না, যদি না তারা গভীর মনোযোগ দেয়। ১৯৩৯ সালে একটি বিখ্যাত বা কুখ্যাত ‘মলোটোভ-রিবেনট্রপ’ চুক্তি হয়েছিল, যেখানে আপাতদৃষ্টিতে জার্মানি ও সোভিয়েত ইউনিয়ন পোল্যান্ডকে ভাগ করে নেয়। আমাদের ও আমাকে শেখানো হয়েছিল যে, এটি সোভিয়েত ইউনিয়নের লোভ ও সম্প্রসারণবাদের প্রমাণ এবং স্নায়ুযুদ্ধের মূল কারণ এটাই। এটি আসলে হিটলার ও স্তালিনের পোল্যান্ডকে গ্রাস করার একটি যৌথ চুক্তি ছিল এবং ফিনল্যান্ডের সঙ্গে সোভিয়েতের যুদ্ধের ক্ষেত্রেও একই কথা বলা হয়েছিল।

কিন্তু আপনি যদি এই বিষয়ে আরও গভীরভাবে খোঁজ করেন, তাহলে দেখবেন যে, পুরো গল্পটি উল্টো। বাস্তবতা ছিল এমন কিছু, যা পশ্চিমা বিশ্ব এবং আমাদের মতো ছাত্ররা কখনো শিখতে পারতাম না। ১৯৩০-এর দশকের শেষের দিকে স্তালিন বরং মরিয়া হয়ে হিটলারের বিরুদ্ধে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের সঙ্গে একটি জোট গঠনের চেষ্টা করছিলেন। কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে হিটলার তার দেশ আক্রমণ করতে যাচ্ছে। হিটলারই শান্তির জন্য একটি সম্প্রসারণবাদী হুমকি।

কিন্তু ১৯৩৯ সালে ব্রিটিশ ও ফরাসিরা স্তালিনকে প্রত্যাখ্যান করে। এর ফলে তিনি মরিয়া হয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নকে রক্ষা করার জন্য একটি সুরক্ষা বলয় তৈরির চেষ্টা করেন, যা ফিনল্যান্ড ও পোল্যান্ড উভয় দিকেই ছিল। কারণ তিনি জানতেন যে একটি জার্মান আক্রমণ আসছে। আমরা অর্থাৎ রুশরা এবং পশ্চিমা বিশ্ব, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে প্রতিরোধ করার সুযোগ হারিয়েছিলাম। কারণ রাশিয়ার প্রতি ঘৃণা এতটাই বেশি ছিল যে ব্রিটিশ অভিজাতদের অনেকেই মনে করতেন ‘বলশেভিজমের’ চেয়ে ‘হিটলারিজম’ ভালো।

আমরা সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিটি পদক্ষেপকে সবচেয়ে বেশি পশ্চিমা-বিরোধী হিসেবে ব্যাখ্যা করি, কারণ আমরা সত্যের দিকে তাকাতে ভয় পাই। সত্য হলো, আমরা (পশ্চিমারা) মূলত রাশিয়ার সঙ্গে জোট করার একটি সুযোগ প্রত্যাখ্যান করেছিলাম। আর ফিনল্যান্ডের ক্ষেত্রে, স্তালিন জানতেন যে জার্মানরা বাল্টিক রাষ্ট্র এবং ফিনল্যান্ডের মধ্য দিয়ে আসবে এবং পরে লেনিনগ্রাদ অবরোধে ঠিক সেটাই ঘটেছিল। এখানে লাখ লাখ মানুষ অনাহারে মারা যায়। স্তালিন এই বিষয়টি বুঝেছিলেন এবং লেনিনগ্রাদকে (বর্তমান সেন্ট পিটার্সবার্গ) রক্ষা করার জন্য সোভিয়েত সৈন্যদের সেখানে স্থানান্তরিত করা বা কিছু ভূমি পরিবর্তনের অনুমতি চেয়েছিলেন। কিন্তু ফিনল্যান্ড তাকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছিল। আর এটাই ছিল পরবর্তীতে যা ঘটেছিল তার মূল কারণ।

সুতরাং, আমরা অন্য কোনো দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো কিছু দেখতেও চাই না। এর একটি নাম আছে, যাকে বলা হয় ‘সিকিউরিটি ডিলেমা’ বা ‘নিরাপত্তা সংকট’, যা তাদের জন্য যারা এই বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা করতে চান। এর অর্থ হলো, আপনি অন্য পক্ষের সবচেয়ে খারাপ ব্যাখ্যাটি গ্রহণ করেন। আমার এক প্রয়াত সহকর্মী, কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রবার্ট জার্ভিস নামের একজন সত্যিই বুদ্ধিমান ও ভদ্র মানুষ এ বিষয়ে চমৎকার লিখেছিলেন। মূল ধারণাটি হলো, আপনি অন্য পক্ষের সবকিছুকে সবচেয়ে নেতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেন, যা আংশিকভাবে আপনার নিজের প্রচারের জন্য এবং আংশিকভাবে আপনার অজ্ঞতা ও মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়ার কারণে ঘটে।

এই পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার উপায় হলো আসলে অন্য পক্ষের সঙ্গে কথা বলা। তাদের উদ্দেশ্য বোঝার চেষ্টা করা এবং একটি আপস মীমাংসার পথ খোঁজা। আরেকটি বিষয় যোগ করতে চাই, এ জে পি টেলরও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের সেই পুরো সোভিয়েত কূটনীতির সময়কাল নিয়ে খুব আকর্ষণীয় লেখা লিখেছেন। অবশ্য জেফ রবার্টসও তা করেছেন।

**চলবে...

সম্পর্কিত