পর্ব ৩
করিম সাদজাদপোর

সোভিয়েত ইউনিয়ন দেরিতে নিজেকে পরিবর্তনের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিল। কিন্তু চীন ১৯৭৬ সালে মাও সে তুংয়ের মৃত্যুর পর বিপ্লবী পথ বদলে টিকে থাকতে সক্ষম হয়। তারা বিপ্লবী আদর্শের বদলে অগ্রাধিকার দেয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে।
‘চায়না মডেল’ দীর্ঘদিন ধরে ইরানের শাসকগোষ্ঠী, বিশেষ করে যারা বর্তমান ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে চান, তাদের অনেকের কাছে আকর্ষণীয়। কিন্তু তারা একই সঙ্গে বুঝতে পারেন অর্থনীতির দুরবস্থা ও জনরোষের সমাধান করতে কিছু সংস্কার প্রয়োজন।
এই পরিস্থিতিতে ইরানের শাসনব্যবস্থা নিপীড়নমূলক ও কর্তৃত্ববাদীই থাকবে, তবে তা বিপ্লবী নীতিমালা ও সামাজিক রক্ষণশীলতা কিছুটা শিথিল করে আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন, বৈশ্বিক সংযোগ বৃদ্ধি, এবং ধর্মতন্ত্র থেকে প্রযুক্তিনির্ভর শাসনে ধীরে ধীরে রূপান্তরের পথে যেতে পারে।
এক্ষেত্রে হয়ত ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) তাদের ক্ষমতা ও আর্থিক প্রভাব বজায় রাখবে, তবে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির মতোই তারা বিপ্লবী লড়াই থেকে সরে এসে জাতীয়তাবাদী করপোরেট স্বার্থে মনোযোগ দিতে পারে।
ইরানের জন্য চায়না মডেল নেওয়া দুই কারণে কঠিন। এক, এটি শুরু করা; দুই, এটি চালিয়ে রাখা। চীনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া শুরু হয় ১৯৭০-এর দশকে মাও-এর সময়। কিন্তু দেশকে বদলে দিয়ে ব্যবহারিক পথে নিয়ে যাওয়া এবং বড় পরিবর্তন আনার কাজ করেছেন তার উত্তরসূরি দেং শিয়াও পিং।
ইরানেও এমন কিছু নেতা আছেন, যেমন সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি এবং বিপ্লবের প্রতিষ্ঠাতার নাতি হাসান খোমেনি। কিন্তু কেউই খামেনি এবং তার মতো কট্টরপন্থীদের বাধা পার হতে পারেননি। তারা মনে করেন যে, বিপ্লবী নীতিতে কোনো ছাড়, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা, দেশকে দুর্বল করবে, শক্তিশালী করবে না।
চীনের ক্ষেত্রে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা সহজ হয়েছিল কারণ তাদের উভয়েরই একই সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে খারাপ সম্পর্কের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল। শত্রুর মোকাবিলা করছিল। এর বিপরীতে, যদিও ইরান ও আমেরিকা অভিন্ন শত্রু যেমন ইরাকি নেতা সাদ্দাম হুসেইন বা আল-কায়েদা, তালেবান ও ইসলামিক স্টেটের মতো উগ্র সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের মুখোমুখি হলেও খামেনির জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে শত্রুতা সবসময়ই প্রধান বিষয়।
চীনের মডেল অনুসরণ করতে হলে হয়তো খামেনির শেষ সময়ে তাকে তার সারা জীবনের আমেরিকাবিরোধী মনোভাব ত্যাগ করতে হবে, যা বাস্তবে প্রায় অসম্ভব। অথবা ইরানকে এমন একজন নেতা খুঁজে আনতে হবে যিনি কম কট্টর। এটাও সহজ নয়।

তবে চীনের মডেল অনুসরণ করলেও ইরান অনেক সমস্যার সম্মুখীন হবে। কারণ চীন তার বিশাল জনবল ব্যবহার করে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে তুলেছিল। চীনের বিশাল শ্রমশক্তি কোটি কোটি মানুষকে দারিদ্র্য থেকে উত্তোলন করতে সাহায্য করেছে, যা সরকারের ওপর বিশ্বাসযোগ্যতা এবং জনগণের আস্থা বাড়িয়েছে। কিন্তু ইরানের অর্থনীতি রাশিয়ার মতো পুরোটাই রাষ্ট্রনির্ভর।
মানুষের জীবনে বাস্তবিক পরিবর্তন না এনে শুধু আদর্শগত পরিবর্তন দিয়ে সরকারের আয়ুষ্কাল বাড়ানো যায় না।
যদি ইরান কট্টর পথ ছেড়ে আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে এবং ইসরায়েলের অস্তিত্ব মেনে নেয় তা ইরানের বর্তমান পরিস্থিতির তুলনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। তবে চীনের অভিজ্ঞতা থেকেই দেখা যায় যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক সখ্য নতুন চ্যালেঞ্জও আনতে পারে। আজকের সমস্যা শেষ করে নতুন সমস্যাও শুরু হতে পারে। পাশাপাশি, এমন তীব্র পরিবর্তনের সময় ইরান নিজের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে পারবে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
**ফরেন অ্যাফেয়ার্স ডটকমে প্রকাশিত লেখাটি অনুবাদ করে প্রকাশিত**
করিম সাদজাদপোর কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর সিনিয়র ফেলো। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের সাবেক ‘চিফ ইরান অ্যানালিস্ট’ সাদজাদপোরের কাজের প্রধান ক্ষেত্র ইরান এবং মধ্যপ্রাচ্য সংক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র নীতি।
অনুবাদ করেছেন: রিতু চক্রবর্ত্তী

সোভিয়েত ইউনিয়ন দেরিতে নিজেকে পরিবর্তনের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিল। কিন্তু চীন ১৯৭৬ সালে মাও সে তুংয়ের মৃত্যুর পর বিপ্লবী পথ বদলে টিকে থাকতে সক্ষম হয়। তারা বিপ্লবী আদর্শের বদলে অগ্রাধিকার দেয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে।
‘চায়না মডেল’ দীর্ঘদিন ধরে ইরানের শাসকগোষ্ঠী, বিশেষ করে যারা বর্তমান ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে চান, তাদের অনেকের কাছে আকর্ষণীয়। কিন্তু তারা একই সঙ্গে বুঝতে পারেন অর্থনীতির দুরবস্থা ও জনরোষের সমাধান করতে কিছু সংস্কার প্রয়োজন।
এই পরিস্থিতিতে ইরানের শাসনব্যবস্থা নিপীড়নমূলক ও কর্তৃত্ববাদীই থাকবে, তবে তা বিপ্লবী নীতিমালা ও সামাজিক রক্ষণশীলতা কিছুটা শিথিল করে আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন, বৈশ্বিক সংযোগ বৃদ্ধি, এবং ধর্মতন্ত্র থেকে প্রযুক্তিনির্ভর শাসনে ধীরে ধীরে রূপান্তরের পথে যেতে পারে।
এক্ষেত্রে হয়ত ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) তাদের ক্ষমতা ও আর্থিক প্রভাব বজায় রাখবে, তবে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির মতোই তারা বিপ্লবী লড়াই থেকে সরে এসে জাতীয়তাবাদী করপোরেট স্বার্থে মনোযোগ দিতে পারে।
ইরানের জন্য চায়না মডেল নেওয়া দুই কারণে কঠিন। এক, এটি শুরু করা; দুই, এটি চালিয়ে রাখা। চীনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া শুরু হয় ১৯৭০-এর দশকে মাও-এর সময়। কিন্তু দেশকে বদলে দিয়ে ব্যবহারিক পথে নিয়ে যাওয়া এবং বড় পরিবর্তন আনার কাজ করেছেন তার উত্তরসূরি দেং শিয়াও পিং।
ইরানেও এমন কিছু নেতা আছেন, যেমন সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি এবং বিপ্লবের প্রতিষ্ঠাতার নাতি হাসান খোমেনি। কিন্তু কেউই খামেনি এবং তার মতো কট্টরপন্থীদের বাধা পার হতে পারেননি। তারা মনে করেন যে, বিপ্লবী নীতিতে কোনো ছাড়, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা, দেশকে দুর্বল করবে, শক্তিশালী করবে না।
চীনের ক্ষেত্রে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা সহজ হয়েছিল কারণ তাদের উভয়েরই একই সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে খারাপ সম্পর্কের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল। শত্রুর মোকাবিলা করছিল। এর বিপরীতে, যদিও ইরান ও আমেরিকা অভিন্ন শত্রু যেমন ইরাকি নেতা সাদ্দাম হুসেইন বা আল-কায়েদা, তালেবান ও ইসলামিক স্টেটের মতো উগ্র সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের মুখোমুখি হলেও খামেনির জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে শত্রুতা সবসময়ই প্রধান বিষয়।
চীনের মডেল অনুসরণ করতে হলে হয়তো খামেনির শেষ সময়ে তাকে তার সারা জীবনের আমেরিকাবিরোধী মনোভাব ত্যাগ করতে হবে, যা বাস্তবে প্রায় অসম্ভব। অথবা ইরানকে এমন একজন নেতা খুঁজে আনতে হবে যিনি কম কট্টর। এটাও সহজ নয়।

তবে চীনের মডেল অনুসরণ করলেও ইরান অনেক সমস্যার সম্মুখীন হবে। কারণ চীন তার বিশাল জনবল ব্যবহার করে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে তুলেছিল। চীনের বিশাল শ্রমশক্তি কোটি কোটি মানুষকে দারিদ্র্য থেকে উত্তোলন করতে সাহায্য করেছে, যা সরকারের ওপর বিশ্বাসযোগ্যতা এবং জনগণের আস্থা বাড়িয়েছে। কিন্তু ইরানের অর্থনীতি রাশিয়ার মতো পুরোটাই রাষ্ট্রনির্ভর।
মানুষের জীবনে বাস্তবিক পরিবর্তন না এনে শুধু আদর্শগত পরিবর্তন দিয়ে সরকারের আয়ুষ্কাল বাড়ানো যায় না।
যদি ইরান কট্টর পথ ছেড়ে আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে এবং ইসরায়েলের অস্তিত্ব মেনে নেয় তা ইরানের বর্তমান পরিস্থিতির তুলনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। তবে চীনের অভিজ্ঞতা থেকেই দেখা যায় যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক সখ্য নতুন চ্যালেঞ্জও আনতে পারে। আজকের সমস্যা শেষ করে নতুন সমস্যাও শুরু হতে পারে। পাশাপাশি, এমন তীব্র পরিবর্তনের সময় ইরান নিজের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে পারবে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
**ফরেন অ্যাফেয়ার্স ডটকমে প্রকাশিত লেখাটি অনুবাদ করে প্রকাশিত**
করিম সাদজাদপোর কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর সিনিয়র ফেলো। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের সাবেক ‘চিফ ইরান অ্যানালিস্ট’ সাদজাদপোরের কাজের প্রধান ক্ষেত্র ইরান এবং মধ্যপ্রাচ্য সংক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র নীতি।
অনুবাদ করেছেন: রিতু চক্রবর্ত্তী

অনিরাপদ বিশ্ব নিরাপদ হবে না যতদিন একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারীর ক্ষমতা খর্ব না হয়। সেটি সম্ভব-যদি Balance of Terror প্রতিষ্ঠিত হতো। ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ভারতের পারমাণবিক শক্তি অর্জনের সমর্থনে বলেছিলেন, ‘Strength respects strength’। জানি না কতদিনে বিশ্বের এই একতরফা ক্ষমতার অবাসন হবে?