Advertisement Banner

অর্থনীতি পুনরুদ্ধারই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, পারবে তারেক সরকার?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
অর্থনীতি পুনরুদ্ধারই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, পারবে তারেক সরকার?
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: রয়টার্স

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে ক্ষমতায় এসেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার মাধ্যমে দেশের শাসনভার গ্রহণ করেছেন। তবে এই বিজয়ের পাশে একটি বড় বাস্তবতা হলো–নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ। ফলে এই নির্বাচন যেমন পরিবর্তনের বার্তা দিয়েছে, তেমনি ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভারসাম্য নিয়েও প্রশ্ন রয়ে গেছে। টাইমসের এক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা যায়।

নতুন শক্তির উত্থান

এই নির্বাচনের আরেকটি দিক হলো জামায়াতে ইসলামীর পুনরুত্থান। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের রাজনীতি মূলত বিএনপি ও আওয়ামী লীগের দ্বিদলীয় কাঠামোর মধ্যেই ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের নির্বাচনে ইসলামী দল জামায়াতে ইসলামীর উত্থান নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।

সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় সরকার আইন প্রণয়নে আপাতত কোনো বাধার মুখে পড়বে না। তবে রাজনৈতিক সাফল্যের পাশাপাশি ক্ষমতায় আসার পর তারেক রহমানের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার–যা গত দুই বছরে রাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, উচ্চ সুদের হার, মূল্যস্ফীতি ও আমলাতান্ত্রিক স্থবিরতায় মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

অর্থনীতি: সবচেয়ে বড় পরীক্ষা

তারেক সরকারের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে অর্থনীতির ওপর। বিএনপি নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষণা দিয়েছে, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার প্রায় ৪৬০ বিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা হবে। এই লক্ষ্য অর্জনে বছরে গড়ে প্রায় ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, যেখানে বর্তমানে প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে প্রায় ৪ শতাংশে।

একই সঙ্গে শিক্ষা খাতে ব্যয় জিডিপির ২ শতাংশ থেকে ৬ শতাংশ এবং স্বাস্থ্য খাতে শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি। কিন্তু এত ব্যয় মেটানোর কোনো স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা এখনো দৃশ্যমান হয়নি। প্রবৃদ্ধি দ্বিগুণ করতে হলে বেসরকারি বিনিয়োগকে জিডিপির ২৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে অন্তত ৩৫ শতাংশে নিতে হবে, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে কঠিন।

কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থার সংস্কার

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষির অবদান প্রায় ১২ শতাংশ, অথচ কর্মসংস্থানের দিক থেকে এটি সবচেয়ে বড় খাত। প্রায় ৪৪ শতাংশ মানুষ কৃষির সঙ্গে যুক্ত। শহরে খাদ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে মধ্যস্বত্বভোগী চক্র। ক্ষেত থেকে শহর পর্যন্ত খাদ্যপণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খলে এরা দাম বাড়ালেও কৃষক ন্যায্য দাম পান না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের খাদ্যবাজার তিন থেকে চারটি গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে। তারেক রহমান প্রশাসন যদি তাদের সঙ্গে সংঘাতে যায়, তাহলে অভ্যন্তরীণ চাপ বাড়তে পারে। আর যদি নিয়ন্ত্রণহীন রাখা হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের ওপর নিত্যপণ্যের ভোগান্তি কমবে না।

রেমিট্যান্স: অর্থনীতির জীবনরেখা

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয়ের গুরুত্ব আইএমএফ কর্মসূচির চেয়েও কম নয়। প্রায় ১ কোটি বাংলাদেশি বিদেশে কাজ করেন, মূলত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে। ২০২৩ সালে রেমিট্যান্স ছিল প্রায় ২১ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৩০ বিলিয়ন ডলারে। এই ৯ বিলিয়ন ডলারের বাড়তি আয় একাই যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের বার্ষিক তৈরি পোশাক রপ্তানির চেয়েও বেশি।

২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ‘হুন্ডি’ নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে পড়ায় বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে। কিন্তু যদি চ্যানেলের বিরুদ্ধে নজরদারি শিথিল হয়, তাহলে এই বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ আবার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। যেটা বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে যাবে।

প্রতি বছর প্রায় ১০ লাখ বাংলাদেশি বিদেশে কাজ করতে যান, যা দেশে বেকারত্বের চাপ কমানোর একটি পথ। কিন্তু এই শ্রম রপ্তানি খাত দুর্নীতিতে ভরা। ইতিমধ্যে কয়েকটি দেশ বাংলাদেশি শ্রমিক নেওয়া বন্ধ করেছে। ফলে সৌদি আরবের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।

এলডিসি উত্তরণ ও শিল্প খাতের চাপ

২০২৬ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পথে। এটি মর্যাদার দিক থেকে ইতিবাচক হলেও অর্থনীতির জন্য চ্যালেঞ্জ। এই উত্তরণের ফলে রপ্তানি খাতের অনেক পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা হারাবে বাংলাদেশ, বিশেষ করে পোশাক শিল্প। শিল্প খাতকে প্রতিযোগিতামূলক করতে না পারলে কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয় দুটোই ঝুঁকিতে পড়বে।

ভূরাজনীতির জটিল ভারসাম্য

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে কঠিন অংশটি হলো–যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ভারসাম্য রক্ষা করা। চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহকারী। চীনের প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি রয়েছে, যার মধ্যে অবকাঠামো ও উৎপাদন খাত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সম্প্রতি বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের ড্রোন উৎপাদন কারখানা স্থাপনের চুক্তিও হয়েছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির সবচেয়ে বড় বাজার এবং জ্বালানি খাতে বৃহৎ বিনিয়োগকারী। নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন ইঙ্গিত দিয়েছেন–চীনা বিনিয়োগের ঝুঁকি সম্পর্কে বাংলাদেশকে সতর্ক করা হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র সামরিক সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী।

বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমান যদি যুক্তরাষ্ট্রকে পরিষ্কার ‘প্রো–ওয়েস্ট সিগন্যাল’ দেন, তবে আমেরিকান বিনিয়োগ বাড়তে পারে। কিন্তু এতে চীনের সাথে সম্পর্ক শীতল হয়ে যেতে পারে, যা দেশের অবকাঠামো উন্নয়নকে ধীর করে দিতে পারে।

ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক

২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনার ভারতে পালিয়ে যাওয়া, দিল্লির তাকে আশ্রয় দেওয়া এবং বাংলাদেশের নতুন সরকারের তাকে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি–দুই দেশের সম্পর্ককে উত্তপ্ত করে তুলেছে। ভিসা সাসপেনশন, খেলা বর্জন, কঠোর বিবৃতি–সব মিলিয়ে প্রতিবেশী সম্পর্ক এখন খারাপ অবস্থানে।

ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় স্থল প্রতিবেশী, কিন্তু বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহায়তায় ভারত কখনোই চীনের সমকক্ষ হতে পারেনি। তিস্তা পানি বণ্টন থেকে শুরু করে বিদ্যুৎচুক্তি–সবকিছু নিয়ে বাংলাদেশের জনমনে ক্ষোভও আছে। এমন অবস্থায় তারেক সরকারের উচিত–ভারতের সঙ্গে ঠান্ডা মাথায় আলোচনার পথ খোলা রাখা, একইসঙ্গে সার্বভৌমত্বের বিষয়ে কঠোর থাকা।

অর্থনীতিবিদ ড. সায়ীদ মুরশিদ টাইমসকে বলেন, সরকারকে এখন ‘বড় পরিকল্পনার পাশাপাশি ছোট কিন্তু উচ্চ প্রভাব প্রকল্প’ বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিতে হবে। আর্থিক খাত সংস্কার, ব্যাংকিং দুর্নীতি দমন, স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং শ্রমবাজার সম্প্রসারণ–সবকিছু মিলিয়ে আগামী পাঁচ বছর হবে তারেক রহমানের সবচেয়ে কঠিন সময়।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রেখে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হলে দেশের সামনে বড় সম্ভাবনার দরজা খুলতে পারবে। তারেক সরকারের ভবিষ্যৎ টিকে থাকা, জনপ্রিয়তা এবং রাজনৈতিক স্থায়িত্ব–সবকিছুই এখন নির্ভর করছে অর্থনীতির দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর ওপর।

তথ্যসূত্র: টাইমস

সম্পর্কিত