Advertisement Banner

আমেরিকার ভুলকেই কৌশল বানাতে চায় চীন

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
আমেরিকার ভুলকেই কৌশল বানাতে চায় চীন
ছবি: এআই দিয়ে বানানো

ইরানকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ শুরু হয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য বদলে দেওয়ার উচ্চাভিলাষ নিয়ে। সমর্থকদের মতে, এটি শুধু একটি “বিরূপ শাসনব্যবস্থা” দুর্বল করার উদ্যোগ ছিল না, বরং বিশ্ব রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে চীনের মতো উদীয়মান শক্তিকে চাপের মুখে ফেলবে। যুক্তরাষ্ট্রের তেল সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেখিয়ে চীনকে দুর্বল প্রমাণ করা এবং সামরিক শক্তির প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো–এই ছিল সেই কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু যুদ্ধের এক মাস পরেই এই ধারণা ক্রমশ ভ্রান্ত এবং অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী বলে প্রতীয়মান হচ্ছে, বিশেষত বেইজিংয়ের দৃষ্টিতে। বিখ্যাত বিট্রিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট তাদের সম্পাদকীয় নিবন্ধে এমনটাই লিখেছে।

ইকোনমিস্ট বলছে, চীনের কূটনীতিক, নীতিনির্ধারক, গবেষক এবং সাবেক কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় যে চিত্র উঠে এসেছে, তা থেকে স্পষ্ট যে, তাদের কাছে এই যুদ্ধ আমেরিকার একটি গুরুতর ভুল। চীন সরাসরি জড়ায়নি, কারণ তাদের কৌশল অনেকটাই নেপোলিয়নের সেই বিখ্যাত উক্তির মতো, “শত্রু যখন ভুল করছে, তখন তাকে বাধা দিও না।” বেইজিংয়ের দৃষ্টিতে, আমেরিকা নিজেই এমন এক পথে হাঁটছে, যা তার দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানকে দুর্বল করে দিতে পারে।

সাময়িকীটি লিখেছে, প্রথমত, চীনের বিশ্লেষকদের মত হলো, এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির অবক্ষয়েরই প্রতিফলন। উনিশ শতকের ব্রিটেনের মতো, আজকের আমেরিকাও সামরিক শক্তি প্রদর্শন করছে, কিন্তু কৌশলগত স্পষ্টতা ও সংযমের অভাব স্পষ্ট। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ উপেক্ষা করে হঠকারী সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, কখনও হুমকি দিচ্ছেন, আবার কখনও পিছু হটার ইঙ্গিত দিচ্ছেন। এই অনিশ্চয়তা আমেরিকাকে দীর্ঘমেয়াদি ব্যর্থতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

চীনের ধারণা, এই যুদ্ধ আমেরিকার ‘অবক্ষয়ের বয়ান’কে আরও জোরদার করবে। যদি সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়, ইরানে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয় বা শাসনব্যবস্থা টিকে থাকে–তাহলে আমেরিকাকে বছরের পর বছর মধ্যপ্রাচ্যে জড়িয়ে থাকতে হতে পারে। এমনকি ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পথে এগোয়, তবে নতুন করে যুদ্ধের সম্ভাবনাও তৈরি হবে। এসবই আমেরিকাকে পূর্ব এশিয়া থেকে মনোযোগ সরিয়ে দেবে–যেখানে চীন ২১ শতকের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

এই পরিস্থিতি মার্কিন মিত্র দেশগুলোকেও অস্বস্তিতে ফেলছে। তারা শুধু একটি অনির্ভরযোগ্য মিত্রের মুখোমুখি হচ্ছে না, বরং এই যুদ্ধের অর্থনৈতিক মূল্যও তাদের দিতে হচ্ছে বর্ধিত জ্বালানি ও কাঁচামালের দামে। ফলে এশিয়ার দেশগুলো চীনের বিরাগভাজন হওয়ার ঝুঁকি নিতে আরও সতর্ক হতে পারে–এমনটাই মনে করছে বেইজিং।

ছবি: এআই দিয়ে বানানো
ছবি: এআই দিয়ে বানানো

দ্বিতীয়ত, চীনা কর্মকর্তারা মনে করেন, এই যুদ্ধ প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ‘স্বনির্ভরতা’ নীতির যথার্থতা প্রমাণ করছে। প্রযুক্তি ও সম্পদে আত্মনির্ভর হওয়ার প্রচেষ্টা এখন কৌশলগতভাবে লাভজনক বলে মনে হচ্ছে। যদিও তা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষতি করেছে। চীন ইতিমধ্যে বিপুল পরিমাণ তেল মজুত করেছে, শক্তি উৎপাদনে বৈচিত্র্য এনেছে এবং নিজস্ব কয়লার ব্যবহার বজায় রেখেছে। একই সঙ্গে, তারা ইরানের তেল বাণিজ্য চালু রাখতে সাহায্য করছে, যা তাদের বাস্তববাদী কৌশলেরই অংশ।

শুধু প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান নয়, চীন নিজেও নতুন ‘চোকপয়েন্ট’ তৈরি করতে চাইছে। বিরল খনিজ, ফার্মাসিউটিক্যাল উপাদান, চিপ প্রযুক্তি–এসব ক্ষেত্রেও প্রভাব বাড়িয়ে আমেরিকার ওপর চাপ সৃষ্টি করার পরিকল্পনা করছে বেইজিং। একই সঙ্গে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, রোবোটিক্সের মতো নতুন প্রযুক্তিতে আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যও রয়েছে।

তৃতীয়ত, যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিকে চীন একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখছে। উপসাগরীয় দেশগুলো ও ইরান পুনর্গঠনের জন্য বিশাল প্রকল্প হাতে নেবে, যেখানে চীনা কোম্পানিগুলো অংশ নিতে পারে। একই সঙ্গে, হরমুজ প্রণালির ঝুঁকির কারণে অনেক দেশ বিকল্প শক্তি প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকবে, যেখানে চীনের অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতা কাজে লাগবে।

এ ছাড়া, দুর্বল অবস্থানে থাকা আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনাতেও চীন সুবিধা নিতে চায়। আসন্ন শি-ট্রাম্প বৈঠকে তারা শুল্ক ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কমানোর চেষ্টা করবে। এমনকি তাইওয়ান প্রসঙ্গেও আমেরিকার অবস্থান নরম করার আশা করছে বেইজিং।

ছবি: এআই দিয়ে বানানো
ছবি: এআই দিয়ে বানানো

তবে এই আত্মবিশ্বাসের মাঝেও উদ্বেগ রয়েছে। আমেরিকা যেভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে যুদ্ধ পরিচালনা করছে, তা চীনকে বিস্মিত করেছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, প্রযুক্তিগত দিক থেকে আমেরিকা এখনো শক্তিশালী। একই সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চীনের অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষত রপ্তানির ওপর।

সবচেয়ে বড় কৌশলগত সীমাবদ্ধতা হলো, চীন এখনো এমন একটি পরিস্থিতি কল্পনা করতে অনিচ্ছুক, যেখানে আমেরিকা নিজেই বিশ্বব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলতে পারে। অথচ সেই ব্যবস্থার মধ্যেই চীন এতদিন সমৃদ্ধ হয়েছে। বৈশ্বিক অস্থিরতা চীনের জন্যও বিপজ্জনক। কারণ তাদের অর্থনীতি এখনো রপ্তানিনির্ভর।

ইকোনমিস্ট তাদের সম্পাদকীয় নিবন্ধটি এভাবে শেষ করেছে যে, শেষ পর্যন্ত চীন অনেকটাই বাজি ধরছে এই ধারণার ওপর যে, আমেরিকা এই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই দুর্বল হয়ে পড়বে। কিন্তু ইতিহাস বলছে, আমেরিকা বারবার নিজেদের পুনর্গঠন করতে পেরেছে। অন্যদিকে, চীন নিজেই অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ। ফলে ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত এবং সেই অনিশ্চয়তার মধ্যেই নতুন শক্তির ভারসাম্য গড়ে উঠতে পারে।

সম্পর্কিত