Advertisement Banner

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের নিবন্ধ

বাংলাদেশের কালো টাকার ‘নিরাপদ গন্তব্য’ যুক্তরাজ্য

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
বাংলাদেশের কালো টাকার ‘নিরাপদ গন্তব্য’ যুক্তরাজ্য
প্রতীকী ছবি। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

গত বছর আওয়ামী লীগের পতনের পর দলটির ১৫ বছরের শাসনামলের আর্থিক অসঙ্গতি নিয়ে তদন্ত শুরু হয় বাংলাদেশে। গত মে মাসে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ) বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহযোগীদের মালিকানাধীন প্রায় ৯০ মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের বিলাসবহুল সম্পত্তি জব্দ করেছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল ইউকের তদন্তে শেখ হাসিনার সরকার সংশ্লিষ্ট লোকজনের ৪০০ মিলিয়ন পাউন্ডেরও বেশি মূল্যের সম্পত্তির সন্ধান পাওয়া গেছে। যার মধ্যে মেফেয়ারের বিলাসবহুল ভবন, সারে এস্টেট এবং মার্সিসাইডের ফ্ল্যাটও রয়েছে। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার অনুমান করছে, হাসিনার শাসনামলে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার লুট করা হয়েছে।

এসব তথ্য প্রকাশের পর রাজনৈতিক মহলে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠার পর শেখ হাসিনার ভাগনি টিউলিপ সিদ্দিককে মন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। এই পদের দায়িত্ব দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমের তত্ত্বাবধান করা।

শুধু বাংলাদেশ নয় মালয়েশিয়াসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের তদন্তকারীরা পাচার করা অর্থের সুরক্ষায় ব্রিটেনের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে ভাবছেন। কারণ দেশটি বিশ্বজুড়ে দুর্নীতিগ্রস্তদের জন্য অর্থ পাচারের অন্যতম নিরাপদ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের সম্পদের বাজার এসব কালো টাকার জন্য নিরাপদ বিনিয়োগস্থল হিসেবে কাজ করছে।

চলতি মাসের শুরুতে মালয়েশিয়ার তদন্তকারীরা সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের লন্ডনে থাকা সম্পদের তদন্ত শুরু করেছেন। মাহাথির তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। গত জুনে মালয়েশিয়ার দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুরোধে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ প্রয়াত মালয়েশিয়ার ব্যবসায়ী দাইম জাইনুদ্দিনের ১৮০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের সম্পত্তি জব্দ করে। দাইম ছিলেন মাহাথির মোহাম্মদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। এই সম্পদের মধ্যে লন্ডনের সিটি এলাকার দুটি বাণিজ্যিক ভবন এবং ম্যারিলিবোন ও বেইজওয়াটারে বিলাসবহুল বাড়ি ও অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে।

london

বিশেষজ্ঞদের মতে, মালয়েশিয়া থেকে যুক্তরাজ্যে অবৈধ অর্থের প্রবাহ নতুন কোনো ঘটনা নয়। এই অবৈধ অর্থ প্রায়শই বৈধ সম্পদের সঙ্গে মিশিয়ে শেল কোম্পানি এবং অফশোর কোম্পানির মাধ্যমে পাচার করা হয়। ফলে তাদের উৎস শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ২০২০ সালে মার্কিন কর্তৃপক্ষ অনুমান করে, মালয়েশিয়ার ওয়ান মালয়েশিয়া ডেভেলপমেন্ট (১ এমডিবি) নামে রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে থেকে চুরি করা ৩৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্রিটিশ সম্পত্তি ক্রয়ের জন্য ব্যবহৃত হয়েছিল। ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জ বর্তমানে ট্যাক্স জাস্টিস নেটওয়ার্কের কর্পোরেট ট্যাক্স হ্যাভেন ইনডেক্সে প্রথম স্থানে রয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক আজমি হাসান বলেছেন, লন্ডন মালয়েশিয়ার অভিজাতদের জন্য স্বাভাবিক পছন্দ। যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তাদের অর্থ সেখানে রাখার ক্ষেত্রে স্বাচ্ছন্দ্য দেয়।

এশিয়াজুড়ে এই চিত্রটি খুবই পরিচিত। সিঙ্গাপুরে ২ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থ পাচার চক্রে জড়িত ১০ চীনা নাগরিকের মধ্যে শেষ অভিযুক্তকে গত বছর কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে দুজন অফশোর কোম্পানির মাধ্যমে লন্ডনের কেন্দ্রে ৫৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের সম্পত্তি কিনেছিলেন।

আন্তর্জাতিক চাপ সত্ত্বেও ব্রিটেনের আইনগত প্রতিক্রিয়া ধীর। যদিও ২০১৮ সাল থেকে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট মূল ভূখণ্ডের বাইরের অঞ্চলগুলোতে মালিকানা নিবন্ধনের জন্য আরও স্বচ্ছতা আনার চেষ্টা করছে। তবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের মতে, ক্যারিবীয় অঞ্চলের পাঁচটি ব্রিটিশ বিদেশি অঞ্চল (যার মধ্যে কেম্যান আইল্যান্ডস এবং ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস অন্তর্ভুক্ত) এখনও বৈশ্বিক অর্থ পাচারের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। এই অঞ্চলগুলো দিয়ে গত ৩০ বছরে ৭৯টি দেশ থেকে প্রায় ২৫০ বিলিয়ন পাউন্ডের অবৈধ অর্থ পাচার হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক কার্যালয়ের (ইউএনওডিসি) বলছে, উন্নয়নশীল দেশগুলো ঘুষ, আত্মসাৎ এবং অন্যান্য দুর্নীতির কারণে বছরে ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হারায়। ইউএনওডিসি সম্পদ পুনরুদ্ধার নির্দেশিকায় বলেছে, ‘এই কারণেই এই অর্থ পুনরুদ্ধার করা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।’

নেপালে রাজনৈতিক অভিজাতদের লুটপাটের অভিযোগে মাসের শুরুতে জেন-জি'দের আন্দোলনে বেশ কয়েকজন নিহত হন। ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো বিরোধীদের চাপের মুখে সংসদ সদস্যদের বেতন বৃদ্ধি বাতিল ও মন্ত্রিসভার পুনর্গঠন করতে বাধ্য হন।

লন্ডনের বড় বড় ভবনগুলো এখনও ঝলমল করছে, কিন্তু আদতে এটি এশিয়ার কোটি কোটি মানুষের চুরি করা স্বপ্নের ওপর নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ। এটি এমন একটি ব্যবস্থা যা এখনও ক্ষমতাবানদের জবাবদিহিতায় আনার জন্য লড়াই করছে।

সম্পর্কিত