ড. মো. আবদুল্লাহ আল মাসুদ

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন। চারদিকে নির্বাচনী আমেজ–মিছিল আর স্লোগান। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রতিশ্রুতির ঝুলি নিয়ে জনগণের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছে। কিন্তু এই ডামাডোলের মধ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন প্রায়ই আড়ালে পড়ে থাকছে, আর তা হলো আমাদের পরিবেশ। আমরা এমন এক সময়ে নির্বাচনে যাচ্ছি যখন আমাদের নদীগুলো বিষাক্ত হয়ে পড়ছে, বাতাস শ্বাস নেওয়ার অযোগ্য হয়ে উঠছে এবং জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের অস্তিত্বের ওপর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদল বা ধারাবাহিকতার প্রশ্ন নয়; এটি আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ, জনস্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা এবং অর্থনীতির স্থায়িত্বের প্রশ্নও।
আজ যখন নদী দখল ও দূষণ, শিল্প-কারখানার বর্জ্য, বায়ুদূষণ, বন উজাড়, প্লাস্টিকের মহামারী, খাল–বিল–জলাশয় ভরাট, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত আমাদের জীবন–জীবিকাকে বহুমাত্রিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, তখন রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচন ইশতেহারে পরিবেশ সুরক্ষা ও পুনরুদ্ধারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। আর ভোটারদেরও উচিত, পরিবেশকে কেন্দ্র করে জবাবদিহিমূলক প্রতিশ্রুতি আদায় করা।
শহরাঞ্চলে PM₂.₅ ও NOx–এর মাত্রা স্বাস্থ্যঝুঁকির সীমার ওপরে চলে যায় ঘন ঘন। এতে হাঁপানি, COPD, হৃদরোগ, স্ট্রোকসহ দীর্ঘমেয়াদি অসুখ বাড়ে। নির্মাণ-পরিবহন-ইটভাটা-জ্বালানি হিসেবে নিম্নমানের ফসিল ফুয়েল, সব মিলিয়ে একটি ধোঁয়াশা-নির্ভর অর্থনীতি টেকসই হতে পারে না। নগর ও শিল্প বর্জ্য পরিশোধন ছাড়া নদীতে পড়ে জলাশয়ের জৈবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়, মাছের প্রজনন কমে, পানীয় জলে ক্ষতিকর জীবাণু ও রাসায়নিকের উপস্থিতি বাড়ে। গ্রামে-শহরে অসুরক্ষিত স্যানিটেশন ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুর্বলতা অনিয়ন্ত্রিত দূষণে অবদান রাখছে। অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশক, ভারী ধাতুর উপস্থিতি, প্লাস্টিকের মাইক্রোফাইবার মাটির উর্বরতা কমায়, খাদ্যচক্রে বিষ ঢুকিয়ে দেয়। কৃষকের স্বাস্থ্য যেমন ঝুঁকিতে, তেমনি ভোক্তার প্লেটেও বিষের অনুপ্রবেশ। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক শহরের নালা-খাল বন্ধ করে জলাবদ্ধতা বাড়ায়; নদী-সমুদ্রে গেলে মাছ-পাখি-কচ্ছপের জীবননাশ ঘটায়। প্লাস্টিকের মাইক্রোপার্টিকল এখন বাতাস-জল-খাদ্য–সবখানেই।
বাংলাদেশের নদ-নদীগুলো আজ ওষুধ শিল্প (Pharmaceutical pollution), টেক্সটাইল ডাই (PFAS) এবং প্লাস্টিক বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক এক বৈশ্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের নদীগুলোতে ওষুধের অবশিষ্টাংশের উপস্থিতি জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিক দূষণ আমাদের অজান্তেই ‘সুপারবাগ’ তৈরি করছে, যার ফলে সাধারণ অসুখও ভবিষ্যতে নিরাময় অযোগ্য হয়ে উঠতে পারে। টেক্সটাইল কারখানা থেকে নির্গত বিষাক্ত রাসায়নিক (যেমন পিএফএএস বা চিরস্থায়ী রাসায়নিক) আমাদের ভূগর্ভস্থ পানি ও খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে।
পরিবেশগত ঝুঁকি সরাসরি জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকিতে রূপ নেয়। শিশুরা বায়ুদূষণে বেশি আক্রান্ত হয়। তাদের ফুসফুসের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। গর্ভবতী মায়ের রক্তে দূষক থাকলে নবজাতকের ওজন কমে, জটিলতা বাড়ে। দীর্ঘমেয়াদি ভারী ধাতু-কীটনাশক-এন্ডোক্রাইন ডিসরাপ্টর এক্সপোজার ক্যান্সার, কিডনি-লিভারের রোগ, থাইরয়েড-হরমোনাল সমস্যা বাড়ায়।
সর্বোপরি, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত তাপপ্রবাহ, বন্যা, লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড়, এগুলো রোগ–জীবাণুর বংশবিস্তার, অপুষ্টি, মানসিক চাপ, এবং স্বাস্থ্যসেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে। অর্থাৎ পরিবেশ সংকট মানে স্বাস্থ্য সংকট, আর স্বাস্থ্য সংকট মানে উৎপাদনশীলতা ও অর্থনীতির সংকট।
নির্বাচনের আগে দলগুলো অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও অবকাঠামোর প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু পরিবেশ ধ্বংস করে যে উন্নয়ন, তা টেকসই হতে পারে না। রাজনৈতিক দলগুলোকে বুঝতে হবে যে, সুস্থ নাগরিক ছাড়া একটি সমৃদ্ধ দেশ গঠন অসম্ভব। তাই ভোটারদের সামনে ভোট চাওয়ার সময় তাদের ইশতেহারে পরিবেশ রক্ষা ও দূষণ রোধে সুনির্দিষ্ট এবং বাস্তবসম্মত অঙ্গীকার থাকা অপরিহার্য। দলগুলো নির্বাচিত হওয়ার পর যেন ভুলে না যায় যে, মাটি, পানি আর বাতাস রক্ষা করা তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব।
আমরা যদি এখনই সচেতন না হই, তবে আগামী প্রজন্ম এক রুগ্ন বাংলাদেশের মুখোমুখি হবে। দূষিত পানির কারণে কিডনি জটিলতা, চর্মরোগ এবং ক্যানসারের প্রকোপ বাড়ছে। গর্ভবতী মায়েরা বিষাক্ত বায়ুর সংস্পর্শে আসার ফলে বিকলাঙ্গ বা স্বল্প ওজনের শিশুর জন্ম হার বাড়ছে। এটি কেবল একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি একটি জাতীয় স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা।
আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে পরিবেশ সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে ছয়টি যুগান্তকারী ও উদ্ভাবনী পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জোরালো হচ্ছে। পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে শিল্প কারখানায় 'গ্রিন ট্যাক্স' বা সবুজ কর আরোপ এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি (যেমন: ETP) ব্যবহারকারীদের বিশেষ কর ছাড় দেওয়া এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি, বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের লক্ষ্যে একটি শক্তিশালী ‘সার্কুলার ইকোনমি’ বা বৃত্তাকার অর্থনীতি নীতিমালা প্রণয়ন করে প্লাস্টিক ও শিল্প বর্জ্য পুনর্ব্যবহারকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় প্রতিটি বড় কারখানার চিমনি ও ড্রেনেজে সেন্সরভিত্তিক ‘স্মার্ট মনিটরিং সিস্টেম’ চালু করা যেতে পারে, যা সরাসরি পরিবেশ অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় সার্ভারের মাধ্যমে দূষণকারীকে শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জরিমানা নিশ্চিত করবে।
একই সাথে ইউনিভার্সিটি অফ ইয়র্কসহ বিভিন্ন গবেষণায় উঠে আসা ওষুধের বিপজ্জনক উপস্থিতি রোধে হাসপাতাল ও ফার্মাসিউটিক্যালস খাতের জন্য কঠোর ‘বর্জ্য নিষ্কাশন প্রটোকল’ তৈরি এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কেবল বিদেশের মুখাপেক্ষী না থেকে প্রতিটি উপজেলা বাজেটে নিজস্ব ‘জলবায়ু অভিযোজন তহবিল’ রাখা জরুরি। সর্বোপরি, স্কুল পর্যায় থেকে পরিবেশ রক্ষাকে বাধ্যতামূলক পাঠ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা এবং তরুণদের নেতৃত্বে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় ‘পরিবেশ রক্ষা কমিটি’ গঠন করার মাধ্যমে একটি জনসচেতনতামূলক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার প্রস্তাব করা হচ্ছে। এই পদক্ষেপগুলো কেবল প্রকৃতিকেই বাঁচাবে না, বরং আগামীর বাংলাদেশকে একটি আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠিত করবে।
বাংলাদেশে উদীয়মান দূষণকারী উপাদানগুলো (যেমন: PFAS, আধুনিক কীটনাশক বা ন্যানো-প্লাস্টিক) বিশ্লেষণের জন্য পর্যাপ্ত উচ্চমানের গবেষণাগার বা ল্যাবরেটরির অভাব একটি বড় অন্তরায়। বর্তমানে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন, বিসিএসআইআর এবং বুয়েটের মতো হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে কিছু সুযোগ-সুবিধা থাকলেও তা অত্যন্ত সীমিত। আধুনিক যন্ত্রপাতির স্বল্পতার পাশাপাশি দক্ষ ও বিশেষায়িত জনশক্তিরও সংকট রয়েছে এখানে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই আমরা দূষণের সঠিক মাত্রা ও ধরণ নির্ণয় করতে পারছি না।
এই সংকট নিরসনে পরবর্তী সরকারের জন্য একটি বড় সুযোগ হতে পারে বহির্বিশ্বে কর্মরত খ্যাতিমান বাংলাদেশি পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের কাজে লাগানো। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে বহু বাংলাদেশি গবেষক ও বিজ্ঞানী পরিবেশ প্রকৌশল ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে অত্যন্ত উচ্চমানের গবেষণা করছেন। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে এই বিশেষজ্ঞদের একটি বিশেষ প্যানেল বা ‘অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল’ গঠন করা প্রয়োজন। তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দেশে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগার তৈরি এবং স্থানীয় জনশক্তিকে প্রশিক্ষিত করার মাধ্যমে আমরা একটি ‘স্মার্ট এনভায়রনমেন্টাল মনিটরিং সিস্টেম’ গড়ে তুলতে পারি। রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এই মেধাবীদের মাধ্যমেই আমাদের পরিবেশগত বিপর্যয় রোধ করা সম্ভব।
নির্বাচনের এই সময়ে ভোটারদের উচিত প্রার্থীদের প্রশ্ন করা, ‘পরিবেশ রক্ষায় আপনাদের পরিকল্পনা কী?’। আমরা এমন একজন জনপ্রতিনিধি চাই যিনি কেবল রাস্তাঘাট বানাবেন না, বরং আমাদের সন্তানদের জন্য একটি দূষণমুক্ত পৃথিবী নিশ্চিত করার সাহস রাখবেন।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের লড়াই নয়, এটি আমাদের নিরাপদ ভবিষ্যতের লড়াই। রাজনৈতিক দলগুলো যদি তাদের ইশতেহারে পরিবেশ রক্ষা ও জনস্বাস্থ্যের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয় এবং নির্বাচিত হওয়ার পর তা বাস্তবায়নে কঠোর হয়, তবেই আমরা একটি সমৃদ্ধ ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব। মনে রাখতে হবে, প্রকৃতি প্রতিশোধ নিতে শুরু করলে কোনো রাজনীতি বা অর্থনীতিই আমাদের বাঁচাতে পারবে না।
লেখক: গবেষক ও পরিবেশ প্রকৌশলী

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন। চারদিকে নির্বাচনী আমেজ–মিছিল আর স্লোগান। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রতিশ্রুতির ঝুলি নিয়ে জনগণের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছে। কিন্তু এই ডামাডোলের মধ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন প্রায়ই আড়ালে পড়ে থাকছে, আর তা হলো আমাদের পরিবেশ। আমরা এমন এক সময়ে নির্বাচনে যাচ্ছি যখন আমাদের নদীগুলো বিষাক্ত হয়ে পড়ছে, বাতাস শ্বাস নেওয়ার অযোগ্য হয়ে উঠছে এবং জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের অস্তিত্বের ওপর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদল বা ধারাবাহিকতার প্রশ্ন নয়; এটি আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ, জনস্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা এবং অর্থনীতির স্থায়িত্বের প্রশ্নও।
আজ যখন নদী দখল ও দূষণ, শিল্প-কারখানার বর্জ্য, বায়ুদূষণ, বন উজাড়, প্লাস্টিকের মহামারী, খাল–বিল–জলাশয় ভরাট, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত আমাদের জীবন–জীবিকাকে বহুমাত্রিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, তখন রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচন ইশতেহারে পরিবেশ সুরক্ষা ও পুনরুদ্ধারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। আর ভোটারদেরও উচিত, পরিবেশকে কেন্দ্র করে জবাবদিহিমূলক প্রতিশ্রুতি আদায় করা।
শহরাঞ্চলে PM₂.₅ ও NOx–এর মাত্রা স্বাস্থ্যঝুঁকির সীমার ওপরে চলে যায় ঘন ঘন। এতে হাঁপানি, COPD, হৃদরোগ, স্ট্রোকসহ দীর্ঘমেয়াদি অসুখ বাড়ে। নির্মাণ-পরিবহন-ইটভাটা-জ্বালানি হিসেবে নিম্নমানের ফসিল ফুয়েল, সব মিলিয়ে একটি ধোঁয়াশা-নির্ভর অর্থনীতি টেকসই হতে পারে না। নগর ও শিল্প বর্জ্য পরিশোধন ছাড়া নদীতে পড়ে জলাশয়ের জৈবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়, মাছের প্রজনন কমে, পানীয় জলে ক্ষতিকর জীবাণু ও রাসায়নিকের উপস্থিতি বাড়ে। গ্রামে-শহরে অসুরক্ষিত স্যানিটেশন ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুর্বলতা অনিয়ন্ত্রিত দূষণে অবদান রাখছে। অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশক, ভারী ধাতুর উপস্থিতি, প্লাস্টিকের মাইক্রোফাইবার মাটির উর্বরতা কমায়, খাদ্যচক্রে বিষ ঢুকিয়ে দেয়। কৃষকের স্বাস্থ্য যেমন ঝুঁকিতে, তেমনি ভোক্তার প্লেটেও বিষের অনুপ্রবেশ। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক শহরের নালা-খাল বন্ধ করে জলাবদ্ধতা বাড়ায়; নদী-সমুদ্রে গেলে মাছ-পাখি-কচ্ছপের জীবননাশ ঘটায়। প্লাস্টিকের মাইক্রোপার্টিকল এখন বাতাস-জল-খাদ্য–সবখানেই।
বাংলাদেশের নদ-নদীগুলো আজ ওষুধ শিল্প (Pharmaceutical pollution), টেক্সটাইল ডাই (PFAS) এবং প্লাস্টিক বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক এক বৈশ্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের নদীগুলোতে ওষুধের অবশিষ্টাংশের উপস্থিতি জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিক দূষণ আমাদের অজান্তেই ‘সুপারবাগ’ তৈরি করছে, যার ফলে সাধারণ অসুখও ভবিষ্যতে নিরাময় অযোগ্য হয়ে উঠতে পারে। টেক্সটাইল কারখানা থেকে নির্গত বিষাক্ত রাসায়নিক (যেমন পিএফএএস বা চিরস্থায়ী রাসায়নিক) আমাদের ভূগর্ভস্থ পানি ও খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে।
পরিবেশগত ঝুঁকি সরাসরি জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকিতে রূপ নেয়। শিশুরা বায়ুদূষণে বেশি আক্রান্ত হয়। তাদের ফুসফুসের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। গর্ভবতী মায়ের রক্তে দূষক থাকলে নবজাতকের ওজন কমে, জটিলতা বাড়ে। দীর্ঘমেয়াদি ভারী ধাতু-কীটনাশক-এন্ডোক্রাইন ডিসরাপ্টর এক্সপোজার ক্যান্সার, কিডনি-লিভারের রোগ, থাইরয়েড-হরমোনাল সমস্যা বাড়ায়।
সর্বোপরি, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত তাপপ্রবাহ, বন্যা, লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড়, এগুলো রোগ–জীবাণুর বংশবিস্তার, অপুষ্টি, মানসিক চাপ, এবং স্বাস্থ্যসেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে। অর্থাৎ পরিবেশ সংকট মানে স্বাস্থ্য সংকট, আর স্বাস্থ্য সংকট মানে উৎপাদনশীলতা ও অর্থনীতির সংকট।
নির্বাচনের আগে দলগুলো অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও অবকাঠামোর প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু পরিবেশ ধ্বংস করে যে উন্নয়ন, তা টেকসই হতে পারে না। রাজনৈতিক দলগুলোকে বুঝতে হবে যে, সুস্থ নাগরিক ছাড়া একটি সমৃদ্ধ দেশ গঠন অসম্ভব। তাই ভোটারদের সামনে ভোট চাওয়ার সময় তাদের ইশতেহারে পরিবেশ রক্ষা ও দূষণ রোধে সুনির্দিষ্ট এবং বাস্তবসম্মত অঙ্গীকার থাকা অপরিহার্য। দলগুলো নির্বাচিত হওয়ার পর যেন ভুলে না যায় যে, মাটি, পানি আর বাতাস রক্ষা করা তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব।
আমরা যদি এখনই সচেতন না হই, তবে আগামী প্রজন্ম এক রুগ্ন বাংলাদেশের মুখোমুখি হবে। দূষিত পানির কারণে কিডনি জটিলতা, চর্মরোগ এবং ক্যানসারের প্রকোপ বাড়ছে। গর্ভবতী মায়েরা বিষাক্ত বায়ুর সংস্পর্শে আসার ফলে বিকলাঙ্গ বা স্বল্প ওজনের শিশুর জন্ম হার বাড়ছে। এটি কেবল একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি একটি জাতীয় স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা।
আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে পরিবেশ সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে ছয়টি যুগান্তকারী ও উদ্ভাবনী পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জোরালো হচ্ছে। পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে শিল্প কারখানায় 'গ্রিন ট্যাক্স' বা সবুজ কর আরোপ এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি (যেমন: ETP) ব্যবহারকারীদের বিশেষ কর ছাড় দেওয়া এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি, বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের লক্ষ্যে একটি শক্তিশালী ‘সার্কুলার ইকোনমি’ বা বৃত্তাকার অর্থনীতি নীতিমালা প্রণয়ন করে প্লাস্টিক ও শিল্প বর্জ্য পুনর্ব্যবহারকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় প্রতিটি বড় কারখানার চিমনি ও ড্রেনেজে সেন্সরভিত্তিক ‘স্মার্ট মনিটরিং সিস্টেম’ চালু করা যেতে পারে, যা সরাসরি পরিবেশ অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় সার্ভারের মাধ্যমে দূষণকারীকে শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জরিমানা নিশ্চিত করবে।
একই সাথে ইউনিভার্সিটি অফ ইয়র্কসহ বিভিন্ন গবেষণায় উঠে আসা ওষুধের বিপজ্জনক উপস্থিতি রোধে হাসপাতাল ও ফার্মাসিউটিক্যালস খাতের জন্য কঠোর ‘বর্জ্য নিষ্কাশন প্রটোকল’ তৈরি এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কেবল বিদেশের মুখাপেক্ষী না থেকে প্রতিটি উপজেলা বাজেটে নিজস্ব ‘জলবায়ু অভিযোজন তহবিল’ রাখা জরুরি। সর্বোপরি, স্কুল পর্যায় থেকে পরিবেশ রক্ষাকে বাধ্যতামূলক পাঠ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা এবং তরুণদের নেতৃত্বে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় ‘পরিবেশ রক্ষা কমিটি’ গঠন করার মাধ্যমে একটি জনসচেতনতামূলক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার প্রস্তাব করা হচ্ছে। এই পদক্ষেপগুলো কেবল প্রকৃতিকেই বাঁচাবে না, বরং আগামীর বাংলাদেশকে একটি আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠিত করবে।
বাংলাদেশে উদীয়মান দূষণকারী উপাদানগুলো (যেমন: PFAS, আধুনিক কীটনাশক বা ন্যানো-প্লাস্টিক) বিশ্লেষণের জন্য পর্যাপ্ত উচ্চমানের গবেষণাগার বা ল্যাবরেটরির অভাব একটি বড় অন্তরায়। বর্তমানে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন, বিসিএসআইআর এবং বুয়েটের মতো হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে কিছু সুযোগ-সুবিধা থাকলেও তা অত্যন্ত সীমিত। আধুনিক যন্ত্রপাতির স্বল্পতার পাশাপাশি দক্ষ ও বিশেষায়িত জনশক্তিরও সংকট রয়েছে এখানে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই আমরা দূষণের সঠিক মাত্রা ও ধরণ নির্ণয় করতে পারছি না।
এই সংকট নিরসনে পরবর্তী সরকারের জন্য একটি বড় সুযোগ হতে পারে বহির্বিশ্বে কর্মরত খ্যাতিমান বাংলাদেশি পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের কাজে লাগানো। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে বহু বাংলাদেশি গবেষক ও বিজ্ঞানী পরিবেশ প্রকৌশল ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে অত্যন্ত উচ্চমানের গবেষণা করছেন। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে এই বিশেষজ্ঞদের একটি বিশেষ প্যানেল বা ‘অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল’ গঠন করা প্রয়োজন। তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দেশে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগার তৈরি এবং স্থানীয় জনশক্তিকে প্রশিক্ষিত করার মাধ্যমে আমরা একটি ‘স্মার্ট এনভায়রনমেন্টাল মনিটরিং সিস্টেম’ গড়ে তুলতে পারি। রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এই মেধাবীদের মাধ্যমেই আমাদের পরিবেশগত বিপর্যয় রোধ করা সম্ভব।
নির্বাচনের এই সময়ে ভোটারদের উচিত প্রার্থীদের প্রশ্ন করা, ‘পরিবেশ রক্ষায় আপনাদের পরিকল্পনা কী?’। আমরা এমন একজন জনপ্রতিনিধি চাই যিনি কেবল রাস্তাঘাট বানাবেন না, বরং আমাদের সন্তানদের জন্য একটি দূষণমুক্ত পৃথিবী নিশ্চিত করার সাহস রাখবেন।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের লড়াই নয়, এটি আমাদের নিরাপদ ভবিষ্যতের লড়াই। রাজনৈতিক দলগুলো যদি তাদের ইশতেহারে পরিবেশ রক্ষা ও জনস্বাস্থ্যের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয় এবং নির্বাচিত হওয়ার পর তা বাস্তবায়নে কঠোর হয়, তবেই আমরা একটি সমৃদ্ধ ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব। মনে রাখতে হবে, প্রকৃতি প্রতিশোধ নিতে শুরু করলে কোনো রাজনীতি বা অর্থনীতিই আমাদের বাঁচাতে পারবে না।
লেখক: গবেষক ও পরিবেশ প্রকৌশলী

অনিরাপদ বিশ্ব নিরাপদ হবে না যতদিন একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারীর ক্ষমতা খর্ব না হয়। সেটি সম্ভব-যদি Balance of Terror প্রতিষ্ঠিত হতো। ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ভারতের পারমাণবিক শক্তি অর্জনের সমর্থনে বলেছিলেন, ‘Strength respects strength’। জানি না কতদিনে বিশ্বের এই একতরফা ক্ষমতার অবাসন হবে?