Advertisement Banner

জাপান ও রাধাবিনোদ পাল আজও অবিচ্ছিন্ন

প্রবীর বিকাশ সরকার
প্রবীর বিকাশ সরকার
জাপান ও রাধাবিনোদ পাল আজও অবিচ্ছিন্ন
টোকিওর ইয়াসুকুনি জিনজা মন্দিরের প্রাঙ্গণে বিচারপতি পালের স্মৃতি ফলক।

জাপানের সঙ্গে বিচারপতি পালের বন্ধন আজও অবিচ্ছিন্ন। ২০১৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর তারিখের দৈনিক সানকেইশিম্বুন পত্রিকায় আমেরিকার প্রভাবশালী সংবাদপত্র দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমসের প্রাক্তন টোকিও ব্যুরো প্রধান বিশিষ্ট ব্রিটিশ সাংবাদিক হেনরি স্কট-স্টকস (১৯৩৮-২০২২) এক সাক্ষাৎকারে টোকিও ট্রাইব্যুনালকে “ফুকুশুউ গেকি” অর্থাৎ “প্রতিশোধমূলক প্রহসন” বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বিচারপতি পালের রায়কেই সমর্থন করেছেন। বিগত অর্ধশতাব্দির অধিক জাপানে বসবাস করে তার দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। যদিও তরুণকালে আর দশজন শ্বেতাঙ্গের মতো তিনিও এই ট্রাইবুন্যালকে সঠিক মনে করেছিলেন। কিন্তু বহু বছর ধরে জাপানে বসবাস করার ফলে আজ তার চোখে ধরা পড়ছে জাপানের আসল ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জাপানিদের শান্তিবাদী চিন্তাচেতনা। জাপান যে এশিয়ায় আগ্রাসী অভিযান চালায়নি, স্বেচ্ছায় গণহত্যা সংঘটিত করেনি–এটা এখন দিনের আলোর মতো সুস্পষ্ট। তার এই ‘ফুকুশুউ গেকি’ বা “প্রতিশোধমূলক প্রহসন” মন্তব্যটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু টোকিও ট্রাইব্যুনাল সম্পর্কিত জাপানিদের ইতিহাসভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মিত্রশক্তি কর্তৃক প্রদত্ত রায়ের প্রতি নতিস্বীকারের কারণে পররাষ্ট্রনীতি আদৌ সন্তোষজনক নয় বলেও  হেনরি এস স্টকস তীব্র সমালোচনা করেছেন। প্রতিশোধমনা বিজয়ীর বিচারের মতো এই বিচারে প্রদত্ত শান্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ, মানবতাবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং চীনে গণহত্যা সংঘটনের জন্য যেভাবে জাপানকে অবৈধভাবে অপবাদ দিয়ে নির্মমভাবে বিদ্ধ করেছে আমেরিকা, সেই অপবাদ থেকে বেরিয়ে না এলে নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন তার বই “এইকোকুজিন জা-নারিসুতো গা মিতা গেনদাই নিহোনশি নো শিনজিৎসু” (ব্রিটিশ জার্নালিস্টের দৃষ্টিতে বর্তমান জাপানি ইতিহাসের প্রকৃত অবস্থা”, ২০১৬।

এ রকমভাবে বিশ্বব্যাপী বহু শ্বেতাঙ্গ তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করেছেন বিগত দশকগুলোতে। আমেরিকা, ব্রিটেন, রাশিয়া, জাপানসহ নানা দেশে নতুন নতুন তথ্য প্রকাশিত হচ্ছে সরকারিভাবে ৫০-৬০ বছর ধরে নিষিদ্ধ হিমাগারে হিমায়িত থাকার পর। প্রদর্শনীতে বা গ্রন্থাকারে উন্মুক্ত তথ্যাদি থেকে সুস্পষ্টভাবেই বোঝা যাচ্ছে যে, জাপান নাৎসি জার্মানিদের মতো আদৌ যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত করেনি, পরিস্থিতিগত কারণে হতাহত হয়েছে শত্রু-মিত্র দুপক্ষের বহু সেনা এবং নিরীহ মানুষ, যা যুদ্ধের সময় সংঘটিত হয়ে থাকে সাধারণত। জাপান কখনোই শান্তির বিরুদ্ধে, মানবতাবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেই জড়াতে চায়নি জাপান। জড়ানো হয়েছে গভীর ষড়যন্ত্র করে। তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ জাপানের কাছে প্রেরিত ভয়ঙ্কর “ভেনোনা প্রজেক্টে”র নকল “হাল নোট”, যেটা ছিল আমেরিকার তখনকার স্বরাষ্ট্র সচিব কর্ডেল হাল স্বাক্ষরিত মূল নোটের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। কাজেই কুখ্যাত “হাল নোট” যা জাপানের আত্মসম্মানে আঘাত দিয়েছিল প্রচণ্ডভাবে, সেটি ছিল নকল হাল নোট। বিচারপতি পাল এই তথ্য জানতেন না। তার প্রদত্ত  রায়ের পরে এই তথ্য উদঘাটিত হয় ১৯৫০ সালে। জাপান ১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর হাওয়াই দ্বীপে অবস্থিত আমেরিকার নৌসেনা ঘাঁটি “পার্ল হারবার” আক্রমণ করেছিল। মূলত এর পেছনে ছিল আমেরিকার গভীর ষড়যন্ত্রমূলক পরিকল্পনা। যা এখন গবেষণার মাধ্যমে জানা যাচ্ছে। অর্থাৎ, আমেরিকা সুকৌশলে এমন ফাঁদ পেতেছিল, যাতে জাপানের দিক থেকে বন্দুকের প্রথম “গুলি”টা বেরিয়ে আসে, তাহলে জাপানকে সহজে “আগ্রাসনে”র জন্য দায়ী করা যাবে, এবং আমেরিকা তৎক্ষণাৎ শত্রু জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবে। অথচ জাপান আক্রমণের আগেই যুদ্ধ ঘোষণাপত্র পাঠিয়েছে আমেরিকাস্থ জাপানি রাষ্ট্রদূতের কাছে। সেই ঘোষণাপত্র জাপানি রাষ্ট্রদূত আমেরিকার সরকারের কাছে পাঠিয়েছেন পার্ল হারবার আক্রমণের এক ঘণ্টা পর। এই রহস্যের সমাধান আজও হয়নি। তথাপি জাপান যুদ্ধে জড়িয়েছে বিধায় নিজের আত্মরক্ষার্থে যুদ্ধ করা ছাড়া উপায় ছিল না, উপায় ছিল না জ্বালানি ও খাদ্যের জন্য এশিয়ার দেশগুলোকে দখল করা ছাড়া। এবং এটাই সত্য যা বিচারপতি পালের রায় এবং মার্কিন জেনারেল ডগলাস ম্যাক-আর্থারের স্বীকারোক্তিতে প্রমাণিত হয়েছে। (বিস্তারিত জানা যাবে আমার লিখিত “জাপানের শেষ সামুরাই: তোজো হিদেকি” প্রবন্ধে [জানা অজানা জাপান ২য় খ-, ২০০৯।])

জাপানে অনুষ্ঠিত টোকিও মিলিটারি ট্রাইব্যুনাল (১৯৪৬-৪৮)।
জাপানে অনুষ্ঠিত টোকিও মিলিটারি ট্রাইব্যুনাল (১৯৪৬-৪৮)।

বিচারপতি পালের “জাপান নির্দোষ রায়” আজও জাপান তথা এশিয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রক্ষাকবচ। তিনি তার সুদীর্ঘ রায়ে কাউকেই শত্রু বলেননি, শত্রু হওয়ার জন্য আহ্বানও জানাননি। তাই সময় এসেছে আজকে তার রায়টি নিয়ে গবেষণা এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষাদানের। এশিয়ায় বর্তমানে নতুন সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র এনার্জি-বুভুক্ষু চীনের যে আগ্রাসী রুদ্ররূপ আমরা দেখছি, তা শান্তির জন্য বড় হুমকি। এই অনাকাঙ্ক্ষিত উত্থিত শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হলে শান্তিবাদী বিচারপতি পালের মহান রায়টিই যে একমাত্র সাহস এবং ভরসা, তা আর না বললেও চলে। জাপানের বিশ্ববিদ্যালয়সহ এশিয়ার অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, হিরোশিমা-নাগাসাকি এবং টোকিও ট্রাইব্যুনালকে কেন্দ্র করে গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার বিভাগ উন্মুক্ত করা জরুরি বলে মনে করি।

যুদ্ধহীন শান্তিময় ও সমৃদ্ধ সমাজ গড়ার লক্ষ্যে সত্য ইতিহাসকে জানতে হবে, আর তাই বিচারপতি রাধাবিনোদ পালের রায় পাঠের বিকল্প নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তির ৮১তম স্মরণবছরে তাকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা।

১৯৯৭ সালে কিয়োতোর উপশহরে বিচারপতি পালের স্মৃতি ফলক উদ্বোধন।
১৯৯৭ সালে কিয়োতোর উপশহরে বিচারপতি পালের স্মৃতি ফলক উদ্বোধন।

পুনশ্চ

বিশ্বখ্যাত ন্যায়দণ্ডের মূর্তপ্রতীক, অমিত সাহসী যে মহান বাঙালি বিচারপতি রাধাবিনোদ পাল, তাকে কিন্তু আজ পর্যন্ত অবহেলাভরে কোনোদিন সম্মান দেয়নি ভারত সরকার। ১৯৫৭ সালে ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন মুভমেন্ট কর্তৃক কিয়োতো শহরে আয়োজিত শান্তি সম্মেলনে অতিথি হয়ে এসেছিলেন বিচারপতি পালের পুরনো বন্ধু প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু। কিন্তু তিনি বিচারপতি পাল সম্পর্কে একটি কথাও বলেননি। আর বাংলাদেশ তো তার নামই জানে না! আজ পর্যন্ত বাংলাদেশ দূতাবাস বিচারপতি রাধাবিনোদ পালের স্মৃতিফলক পরিদর্শন বা অন্তত একটি আলোচনা সভারও আয়োজন করেনি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীরা জাপানে যতবারই এসেছেন, কারো মুখেই এই বীর বাঙালি বাংলাদেশের সন্তান বিচারপতি পালের নাম উচ্চারিত হয়ছে বলে আমার জানা নেই। অথচ, বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে যেসব জাপানি নেতৃবন্দ অবদান রেখেছেন, তারা সকলেই ছিলেন বিচারপতি পালের পরম ভক্ত ও অনুসারী। ভারতবাসীর অবহেলিত আর বাঙালির অজ্ঞাত সেই মানুষটির সম্মান ও মর্যাদা আজ জাপানে পর্বতসমান। তার প্রদর্শিত পথ ও শিক্ষাকে বর্তমান ও অনাগত প্রজন্মকে আলোকিত করার লক্ষ্যে ১৯৭৫ সালে কানাগাওয়া প্রদেশের হাকানো নামক জায়গায় স্থাপিত হয়েছে “পা-রু-শিমোনাকা কিনেনকান” অর্থাৎ “পাল-শিমোনাকা স্মারক জাদুঘর” যা ভারতীয় বা বাঙালি জানে না বললেই চলে। ১৯৯৭ সালে কিয়োতো শহরের হিগাশিয়ামা রিয়োজান নামক স্থানে “শোওয়া নো মোরি” উদ্যানে এবং ২০০৫ সালে টোকিওর কেন্দ্রস্থল কুদানশিতা শহরে অবস্থিত শিন্তোও ধর্মীয় মন্দির “ইয়াসুকুনি জিনজা” প্রাঙ্গণে দুটি স্মৃতিফলক স্থাপন করে জাপান-বাংলা মৈত্রী বন্ধনকে আরও সুদূরপ্রসারী করেছেন জাপানি নেতৃবৃন্দ। প্রতিষ্ঠা করেছেন শান্তিবাদের অনন্য এক দৃষ্টান্ত।

প্রবীর বিকাশ সরকার: সাহিত্যিক ও গবেষক

সম্পর্কিত