সাকলাইন রিজভী

ঢাকা থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূরে জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ী উপজেলার আওনা ইউনিয়ন। এখানেই শীতের বিকেলে দেখা যায় এক ঘর থেকে আরেক ঘরে, বাজার থেকে বাজারে সহকর্মীদের নিয়ে নিয়ে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন মো. মাহবুব জামান জুয়েল। কাস্তে প্রতীকের লাল পতাকা নিয়ে কৃষক, দোকানদার ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করে ভোট চাইছেন তিনি ও তার সহকর্মীরা।
এই যে পরিবেশে তিনি ভোট চেয়ে বেড়াচ্ছেন, তার চারপাশে তাকালে চোখে পড়ে এক অতিপরিচিত বাস্তবতা। যেখানে কৃষকদের লাভের পরিমাণ দিন দিন কমছে, সারের দাম বাড়ছে, আর ফসল ফলানো মানুষের চেয়ে মধ্যস্বত্বভোগীরাই বেশি লাভ কুড়াচ্ছে। এমন সময় মাইকে ভেসে আসে ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও!’
নিজ নির্বাচনী এলাকায় জুয়েল নতুন মুখ নন, তবে তিনি এমন এক রাজনৈতিক ধারার প্রতিনিধিত্ব করছেন, যা বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতির কেন্দ্রে বহুদিন ধরেই ম্লান। তা হলো দেশের বাম রাজনীতি।
আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে তিনি জামালপুর-৪ আসনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। জুয়েল তার প্রচারকে ক্ষমতার প্রচলিত প্রতিযোগিতা হিসেবে নয়, বরং বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এক নৈতিক হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদ সাময়িকী দ্য ডিপ্লোম্যাটকে জুয়েল বলেন, “পুঁজিবাদ গরিবদের রক্ষা করতে পারে না। কৃষক ফসল ফলায়, কিন্তু লাভ যায় ব্যবসায়ী, সিন্ডিকেট আর রাজনৈতিক অভিজাতদের পকেটে।”
জুয়েলের গল্পে অতীতের এক রাজনৈতিক যুগের প্রতিধ্বনি শোনা যায়। তিনি একজন সাবেক শ্রমিক ইউনিয়ন নেতার সন্তান। ছোটবেলা থেকেই জুয়েল মিছিল, সমাবেশ, বক্তৃতা আর তৃণমূল সংগঠনের চর্চা দেখে বড় হয়েছেন। ওই সময়ে অর্থ ও পেশিশক্তি নির্বাচনী রাজনীতিকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেনি। বিদেশে এক দশকের বেশি সময় মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করার পর তিনি স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে এসেছেন। ‘রাজনৈতিক বিনিয়োগকারী নয়, রাজনৈতিক কর্মী’ হিসেবে প্রচার চালাতে চান বলে জানান জুয়েল।
জুয়েলের প্রচারের মূল বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে ন্যায্য ফসলমূল্য, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য রেশন কর্মসূচি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কারিগরি প্রশিক্ষণ। তবে তার সামনে রয়েছে বিশাল চ্যালেঞ্জ।
জুয়েল বলেন, “আজকের বাংলাদেশে নির্বাচন ব্যয়বহুল, পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক নেটওয়ার্ক, আর রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা আদর্শের চেয়ে আর্থিক সক্ষমতার ওপর বেশি নির্ভরশীল। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো ভোটাররা যেন নিরাপদে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেন–তা নিশ্চিত করা। ভোটকেন্দ্রগুলো নিরাপদ থাকলে নির্বাচনের ফল একেবারেই ভিন্ন হতে পারে।”
জুয়েলের এই প্রচার সারা দেশে চলমান এক বৃহত্তর রাজনৈতিক পরীক্ষার প্রতিচ্ছবি। হাসিনা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের বামপন্থীদের একাংশ ডেমোক্রেটিক ইউনাইটেড ফ্রন্ট নামে একটি জোট গঠন করে সমন্বিতভাবে নির্বাচনী অঙ্গনে ফেরার চেষ্টা করছে।
এই জোটে রয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (বাংলাদেশ জাসদ), বাংলাদেশ রেভ্যুলুশনারি কমিউনিস্ট লীগ, ডেমোক্রেটিক রেভল্যুশনারি পার্টি, সোনার বাংলা পার্টি, ঐক্য ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি এবং অন্যান্য বামঘেঁষা দল। জোট নেতাদের ভাষ্য, তারা বাংলাদেশের সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে প্রায় ১৫০টিতে প্রার্থী দিচ্ছেন।
তাদের যৌথ ইশতেহারে ১৮ দফা অঙ্গীকার তুলে ধরা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে-রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন, আইনের শাসন জোরদার, নির্বাচনব্যবস্থার সংস্কার, স্থানীয় সরকারকে ক্ষমতায়ন, বৈষম্য হ্রাস এবং মানবাধিকার, নারী অধিকার ও শ্রমিক অধিকারের সুরক্ষা।
জোটটি অর্থনৈতিক কাঠামো পুনর্বিন্যাস, জনস্বাস্থ্য ও শিক্ষা সংস্কার, পরিবেশ সংরক্ষণ, তরুণদের ক্ষমতায়ন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সংস্কৃতি ও বিজ্ঞানচর্চার প্রসারে গুরুত্ব দিচ্ছে। তাদের লক্ষ্য সংসদকে সম্পদ, অপরাধ ও সাম্প্রদায়িক প্রভাবের কেন্দ্র থেকে বের করে জনগণকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ১৯৯০ ও ২০২৪ সালের গণআন্দোলনের আদর্শ সমুন্নত রাখা।
একসময় দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে যে রাজনৈতিক ধারা সক্রিয় ছিল, সেটিকে পুনরুজ্জীবিত করাই তাদের উদ্দেশ্য বলেও জানান জুয়েল। অবশ্য এই উদ্দেশ্য বর্তমানে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য ডানপন্থী শক্তির প্রাধান্যে আড়ালে পড়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে জুয়েলের মতো প্রার্থীরা যখন গ্রামীণ জনপদে প্রচার চালাচ্ছেন, তখন একটি প্রশ্ন সামনে আসছে, বাংলাদেশের বামপন্থীরা কি আসলেই ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, নাকি ডান ও অতি-ডান রাজনীতির উত্থানের মধ্যে নিজেদের প্রান্তিক হয়ে পড়ার বিষয়টি লক্ষ্য করছেন?
প্রান্তিক এলাকায় প্রচার: অর্থ, ভৌগোলিক বাধা ও রাজনৈতিক প্রভাবের লড়াই
নেত্রকোনার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে, যেখানে জল, বিচ্ছিন্নতা ও মৌসুমি ঝুঁকি মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে, সিপিবি প্রেসিডিয়াম সদস্য ও প্রার্থী জলি তালুকদার সেখানে প্রচার চালাচ্ছেন। এখানকার মানুষ বছরের অর্ধেক সময় জীবিকা নির্ভর করে মাছ ধরে ও কৃষিকাজ করে, বাকি অর্ধেক সময় বেকারত্ব, বন্যা ও ঋণের চাপ দৈনন্দিন বাস্তবতা হয়ে ওঠে।
জলি দ্য ডিপ্লোম্যাটকে বলেন, “এখানকার মানুষ ছয় মাস কাজ আর ছয় মাস অনিশ্চয়তার মধ্যে বেঁচে থাকে।”
তার প্রচারের মূল বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে বন্যা প্রতিরোধ, মৎস্য আহরণের ন্যায্য অধিকার, কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা এবং ভূমি নিরাপত্তা, যা ওই অঞ্চলের নাজুক অর্থনীতিকে সরাসরি প্রভাবিত করে।
তবে হাওরাঞ্চলে সংগঠিত প্রচার চালাতে লজিস্টিক ও রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে নৌযান, পরিবহন ও নিয়মিত উপস্থিতি প্রয়োজন, যা বামপন্থী দলগুলোর সীমিত সম্পদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
জলি তালুকদারের অভিযোগ, “ক্ষমতাবানরাই ঠিক করে কে মাছ ধরবে, কে চাষ করবে, আর কে সহায়তা পাবে। সাধারণ মানুষ নির্ভরশীলই থেকে যায়।”
স্থানীয়দের সহানুভূতি থাকলেও মূলধারার দলগুলোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করাকে তিনি গতানুগতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই হিসেবে দেখছেন। তার ভাষ্য, ধনী প্রার্থীরা পোস্টার, বেতনভুক্ত প্রচারকর্মী, যানবাহন, পৃষ্ঠপোষক ও গ্রাহকদের নেটওয়ার্ক দিয়ে নির্বাচনী এলাকা ভরিয়ে ফেলেন। প্রশাসনিক পক্ষপাত ও অনানুষ্ঠানিক রাজনৈতিক প্রভাবও মাঠের সমীকরণকে তাদের অনুকূলে ঠেলে দেয়।
বাংলাদেশের সব এলাকাতেই বামরা একই ধরনের সমস্যায় ভোগেন। নির্বাচনের জামানত দিতে, ক্যাম্পেইন অফিস ভাড়া করতে বা প্রচারের জিনিসপত্র ছাপানোর টাকা জোগাড় করতে তাদের হিমশিম খেতে হয়।
অন্যান্য দলের নেতারা যেখানে প্রান্তিক এলাকাগুলোতে লাখ লাখ টাকা খরচ করে প্রচার চালান, সেখানে বামপন্থীদের ভরসা হলো স্বেচ্ছাসেবক ও আদর্শভিত্তিক নানা প্রতিশ্রুতি।
এক কর্মী বলেন, “নির্বাচন এখন ব্যবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোটি কোটি টাকা খরচ না করলে প্রার্থী হিসেবে দৃষ্টি কাড়া যায় না।”
এ নির্বাচনে নির্বাচনী জামানতের পরিমাণ বাড়ানো প্রসঙ্গে জলি তালুকদার বলেন, “উচ্চ জামানতের কারণে আমাদের দল অনেক আসনে প্রার্থী দিতে পারেনি। নির্বাচন কমিশনের নীতিতে অসঙ্গতি রয়েছে। তারা অর্থ-সম্পর্কিত বাধা কমানোর কথা বললেও বাস্তবে ধনী ও যানবাহনের সুবিধাপ্রাপ্তদের পক্ষেই চলমান ব্যবস্থা কাজ করে। সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা সম্ভব হয় না। এতে মূলত নিশ্চিত হয় যে, জিতবে কেবল ধনীরাই।”
এর ফলে এক ধরনের বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে। বামপন্থী প্রার্থীরা প্রায়ই শ্রমজীবী ও গ্রামীণ ভোটারদের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বিষয় তুলে নির্বাচনী ইশতেহারে ধরেন, কিন্তু সেই সাড়া ভোটে রূপান্তর করার মতো সাংগঠনিক কাঠামো তাদের হাতে নেই।

বাম রাজনীতির দীর্ঘ অবক্ষয়
বাংলাদেশের বাম রাজনীতির অতীত ছিল ভিন্ন। ১৯৫০, ১৯৬০ ও ১৯৭০–এর দশকে মার্কসবাদ, মাওবাদ ও সমাজতন্ত্রের মতো বাম চিন্তাধারাই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (পিবিসিপি) ও অন্যান্য বিপ্লবী সংগঠন শ্রমিক, কৃষক ও শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করে শ্রেণিবৈষম্যহীন সমাজ ও সামাজিক ন্যায়ের দাবিতে আন্দোলন চালিয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধের সময় বামপন্থীদের বিভিন্ন অংশ তৃণমূল পর্যায়ে মানুষকে সংগঠিত করা, স্থানীয়ভাবে প্রতিরোধ সমন্বয় করা এবং স্বাধীনতার জন্য করা আন্দোলনে আদর্শিক কাঠামো গড়ে তোলায় সক্রিয় ভূমিকা রাখে। শ্রম অধিকার, ভূমি সংস্কার ও সাম্যবাদী মূল্যবোধের ওপর তাদের জোর কৃষক ও শ্রমিকদের মধ্যে গভীর সাড়া ফেলেছিল সে সময়।
১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিরোধেও বামঘেঁষা দল ও কর্মীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, যদিও তাদের অবদান পরবর্তীকালে প্রায় বিস্মৃত হয়েছে।
আওয়ামী মুসলিম লীগ, কৃষক প্রজা পার্টি, গণতন্ত্রী দল ও নিজাম-ই-ইসলাম পার্টিসহ বিভিন্ন দল নিয়ে গঠিত যুক্তফ্রন্ট আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন, ভাষার অধিকার ও সামাজিক ন্যায়ের দাবিতে নির্বাচন করে শ্রমিক, কৃষক ও প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের বড় অংশের সমর্থন পায়। কমিউনিস্ট ও অন্যান্য বাম মিত্ররা জোটের পক্ষে তৃণমূলের ভিত্তি সংগঠিত করতে সহায়তা করে। ফলে যুক্তফ্রন্ট প্রাদেশিক পরিষদে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে ভূমিধস জয় পায়।
তবে এই সাফল্য ছিল স্বল্পস্থায়ী। কয়েক মাসের মধ্যেই সরকার বরখাস্ত হয়, শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয় এবং নাগরিক অধিকার কঠোরভাবে সীমিত করা হয়। কমিউনিস্ট পার্টি ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলো নিষেধাজ্ঞা ও দমন-পীড়নের মুখে পড়ে, ফলে তাদের সংগঠনভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়।
এতে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়, পূর্ব পাকিস্তানে বামপন্থী প্রভাব বা স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন দমনে পাকিস্তানি রাষ্ট্র কতদূর যেতে প্রস্তুত ছিল।
এ ছাড়া ১৯৬০–এর দশকে অভ্যন্তরীণ আদর্শগত বিভাজন দ্রুতই বাম রাজনীতির প্রভাব নষ্ট করে দেয়। কমিউনিস্ট পার্টি মস্কোপন্থী ও বেইজিংপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী ধারায় ভেঙে যায়। একটি অংশ বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে সমর্থন করে ভারত-সোভিয়েত ঘরানার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলে, অন্য অংশ স্বাধীনতাকে আংশিক বলে প্রত্যাখ্যান করে আরও ‘র্যাডিকাল’ বিপ্লবের দাবি তোলে।
সিরাজ সিকদারের পূর্ববাংলা শ্রমিক আন্দোলন ও পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টির মতো মাওবাদী প্রভাবিত সংগঠনগুলো শুরুতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়লেও পরে শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারকে যথেষ্ট বিপ্লবী নয় বলে সমালোচনা করে।
এসব দ্বন্দ্ব স্বাধীনতার শুরুর সময়কার রাজনৈতিক অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। তবে চীনে মাওবাদী প্রভাব কমে গেলে এসব গোষ্ঠী বহিরাগত আদর্শিক সমর্থন ও সম্ভাব্য সহায়তার উৎস দুটোই হারায়।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে ধর্মভিত্তিক দলগুলো নিষিদ্ধ হলে বামপন্থীরা কিছু সময়ের জন্য বিরোধী রাজনীতির অন্যতম উৎস হয়ে ওঠে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে টানাপোড়েনে তারা শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়।
এই বিভাজনকে কাজে লাগিয়ে শেখ মুজিব বহুদলীয় প্রতিযোগিতা বন্ধ করে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) গঠন করেন। একই সময়ে গণমাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ এবং ১৯৭৫ সালে পত্রিকা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে একীভূত করার মাধ্যমে ভিন্নমত ও আদর্শিক বহুত্বের পরিসর সংকুচিত হয়।
১৯৭৫ সালের পর সমাজতান্ত্রিক আদর্শ থেকে সামরিক শাসন ও বাজারমুখী অর্থনৈতিক সংস্কারের দিকে দেশ অগ্রসর হলে বামপন্থীরা আরও প্রান্তিক হয়ে পড়ে। জিয়াউর রহমান ও পরবর্তীতে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের আমলে বৃহত্তর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও বাম দলগুলো দমন-পীড়নের মুখে পড়ে।
প্রায় চার দশক পর ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে সামরিক শাসক এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে বাম দলগুলো আবারও বৃহত্তর গণতন্ত্রপন্থী জোটের অংশ হয়। ১৯৮০–এর দশকের শেষদিকে ছাত্রসংগঠন, শ্রমিক সংগঠন ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল- যার মধ্যে পাঁচদলীয় বাম জোট এবং আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন বড় জোটগুলো ছিল, তারা সবাই মিলে স্বৈরশাসনের অবসানের দাবিতে একত্রিত হয়।
১৯৯০ সালে যখন ধর্মঘট, বিক্ষোভ ও গণসমাবেশ দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, তখন শিক্ষার্থী ও শ্রমিকসহ অনেককে ব্যক্তিগত মূল্য দিতে হয়। জরুরি অবস্থা ও কঠোর দমননীতি সত্ত্বেও এই আন্দোলন মতাদর্শগত বিভাজন অতিক্রম করে শাসনব্যবস্থাকে অচল করে দেয় এবং দীর্ঘ সামরিক শাসনের অবসানে ভূমিকা রাখে।
তবে ১৯৯০–এর দশকে নির্বাচনী রাজনীতি আওয়ামী লীগ-বিএনপি কেন্দ্রিক হয়ে পড়ে, যেখানে অর্থ ও পৃষ্ঠপোষকতাই প্রধান নিয়ামক হয়ে ওঠে। এ প্রেক্ষাপটে বাম দলগুলোর টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়ে।
‘স্বপ্ন দেখায়, কিন্তু শাসনে আস্থার ঘাটতি’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও স্বতন্ত্র গবেষক আলতাফ পারভেজ বলেন, সময়ের সঙ্গে বামপন্থীরা নিজেদের জায়গা হারিয়েছে। তার মতে, আদর্শিক স্থবিরতা, সাংগঠনিক দুর্বলতা ও রাষ্ট্রীয় দমন–এই তিনের সমন্বয়েই এ পতন। বাম দলগুলো কৌশল আধুনিকীকরণ, সামাজিক ভিত্তি বিস্তৃত করা বা পরিবর্তিত অর্থনৈতিক বাস্তবতায় কার্যকর সাড়া দিতে ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
আলতাফ পারভেজ বলেন, বামপন্থীরা শহরভিত্তিক বুদ্ধিজীবী পরিসরে সীমাবদ্ধ থেকেছে, গ্রামীণ ভোটার ও উদীয়মান সামাজিক গোষ্ঠীর সঙ্গে সংযোগ হারিয়েছে।
এদিকে নির্বাচনী রাজনীতি ক্রমেই অর্থ, পৃষ্ঠপোষকতা ও কেন্দ্রীভূত নেতৃত্বনির্ভর হয়ে উঠেছে। মূলধারার দলগুলো যেখানে সংগঠন সম্প্রসারণ করেছে, আর বাম সংগঠনগুলো সেখানে সীমিত সম্পদ, অভ্যন্তরীণ বিভক্তি ও নেতৃত্বসংকটে জর্জরিত বলে মত দেন এই বিশ্লেষক।
শেখ হাসিনার শাসনবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া সত্ত্বেও বাম দলগুলোর ক্ষেত্রে একই বাস্তবতা বহাল রয়েছে। জুলাইয়ের অভ্যুত্থানে তাদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য ছিল, কিন্তু তা নির্বাচনী গতি সৃষ্টিতে প্রতিফলিত হয়নি।
আন্তর্জাতিক উদাহরণ টেনে পারভেজ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে নিউইয়র্কে বামঘেঁষা অবস্থান নিয়ে জোহরান মামদানির মতো নেতারা সমর্থন পেয়েছেন, শ্রীলঙ্কায় গণঅভ্যুত্থানের পর বামঘেঁষা শক্তির উত্থান ঘটেছে। কিন্তু তার মতে, বাংলাদেশে বাম দলগুলো এখনও প্রয়োজনীয় তাত্ত্বিক ও সাংগঠনিক সংস্কার করেনি এবং তৃণমূল সংগ্রামের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা দুর্বল।
বাংলাদেশের বাম রাজনীতির সামনে দুটি ‘বড় সংকট’ চিহ্নিত করেন আলতাফ পারভেজ। এর মধ্যে একটি হলো তাত্ত্বিক সংকট, অন্যটি সাংগঠনিক সংকট। স্থানীয় পর্যায়ে সম্পৃক্ততা কমে গেছে এবং সমাজে চলমান পরিবর্তন সম্পর্কে শক্তিশালী অনুধাবনও তাদের নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ বাম রাজনীতির সামনে আরেকটি বাধার কথা উল্লেখ করেন, সেটি হলো জনধারণা। তার মতে, দীর্ঘদিন ধরে সমাজের একটি অংশ বাম রাজনীতিকে সন্দেহের চোখে দেখে, যেখানে বামপন্থীদের ধর্মবিরোধী বা সাংস্কৃতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “তারা স্বপ্ন দেখাতে পারে, কিন্তু শাসন করার মতো বিশ্বাসযোগ্যতা বা নেতৃত্ব তারা গড়ে তুলতে পারেনি।”
এই শিক্ষকের ভাষ্য, অর্থনীতির পরিবর্তনের সঙ্গে এই বিশ্বাসযোগ্যতার ঘাটতি আরও বেড়েছে। দ্রুত নগরায়ণ, প্রবাসে শ্রমবাজার, তৈরি পোশাক খাতের সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল যোগাযোগ ভোটারদের অগ্রাধিকার বদলে দিয়েছে। কিন্তু বহু বাম দল এখনও পুরোনো শ্রেণিভিত্তিক স্লোগানের ওপর নির্ভর করছে, নতুন শ্রম কাঠামো বা তরুণদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খাওয়াতে পারেনি।
এদিকে ডানপন্থী ও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তিগুলো পরিচয়, নৈতিকতা ও সামাজিক রক্ষণশীলতার প্রশ্নে জনসমর্থন সংগঠিত করে প্রভাব বিস্তার করেছে। প্রগতিশীল রাজনীতির বিভাজনে তৈরি শূন্যস্থান পূরণ করেছে।
সাব্বির আহমেদ বলেন, “ডানপন্থী শক্তির উত্থানের প্রেক্ষাপটে নিজেদের ঐক্যবদ্ধ করতে এবং পরোক্ষভাবে তা মোকাবিলা করতেই হয়তো তারা এই জোট গঠন করেছে। তবে নির্বাচনের পরই বোঝা যাবে এর প্রভাব।” তার মতে, নির্বাচনে বামপন্থীরা চমক দেখাতে পারবে না, অতীতের ভোটের প্রবণতা বদলাবে বলে মনে হয় না।
জোট কৌশল: ঐক্য কি লাল রাজনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারবে?
ডেমোক্রেটিক ইউনাইটেড ফ্রন্ট দীর্ঘদিনের বিভাজন কাটিয়ে ওঠার একটি চেষ্টা। সিপিবি, বাসদ, বাংলাদেশ জাসদসহ বামঘেঁষা দলগুলোর এই জোট নিজেদের ‘কোটিপতিনির্ভর সংসদ’-এর বিকল্প হিসেবে তুলে ধরছে।
বাসদের সাধারণ সম্পাদক ও জোটের কেন্দ্রীয় নেতা বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, প্রার্থীদের আর্থিক প্রোফাইলই বৃহত্তর গণতান্ত্রিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। তিনি দ্য ডিপ্লোম্যাটকে বলেন, “বর্তমান নির্বাচনে প্রায় ২ হাজার প্রার্থী রয়েছেন, যাদের মধ্যে ৮৯১ জন কোটিপতি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২৭ জনের সম্পদ ১০০ কোটির বেশি।”
তিনি বলেন, “এই পরিস্থিতিতে আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার হলো সংসদকে ব্যবসায়ী ও ধনীদের ক্লাবে পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা করা। কারণ ধনীরা প্রাধান্য পেলে শ্রমিক, বঞ্চিত ও প্রান্তিক মানুষের স্বার্থ উপেক্ষিত হবে। আমাদের মূল লক্ষ্য জনসচেতনতা তৈরি এবং এই নির্বাচনের মাধ্যমে তা শক্তিশালী করা।”
বজলুর রশীদ ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানকে স্বাধীনতার অপূর্ণ আদর্শের ধারাবাহিক সংগ্রাম হিসেবে দেখেন। তার ভাষ্য, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল সমতা, মানবমর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়ের সংগ্রাম, যা পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়নি। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানও গণতন্ত্র পুরোপুরি প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। ফলে ২০২৪ সালে মানুষ আবারও পরিবর্তনের দাবিতে রাস্তায় নামে। এই তিনটি আন্দোলন একই ধারাবাহিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ বলে মনে করেন তিনি।
তিনি বলেন, এই আদর্শ বাস্তবায়নে শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, ব্যবস্থাগত পরিবর্তন প্রয়োজন। শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার উদাহরণ তুলে তিনি বলেন, পুঁজিবাদী কাঠামোর মধ্যেও জনমুখী সংস্কার সম্ভব। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেওয়ার কথাও তিনি বলেন।
তার মতে, বামদের অংশগ্রহণ শুধু আসন জয়ের জন্য নয়, রাজনৈতিক আলোচনার ধারা বদলে দেওয়ার জন্য। শ্রম অধিকার, সম্পদ বৈষম্য, মূল্য নিয়ন্ত্রণ, জনস্বাস্থ্য ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি নিয়ে আলোচনাকে জোরদার করা এর লক্ষ্য বলে উল্লেখ করেন বজলুর রশীদ।
বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মোস্তাক হোসেন বলেন, পুঁজিবাদ উচ্ছেদ বাস্তবসম্মত নয়, তবে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ, প্রগতিশীল করব্যবস্থা ও কল্যাণমূলক সম্প্রসারণের মাধ্যমে সংস্কার সম্ভব। তার মতে, “ন্যূনতম দাবি হলো দুর্নীতি ও অপরাধীকরণ কমানো, তা ছাড়া গণতন্ত্র কার্যকর হতে পারে না।”
জোটটি একই দিনে অনুষ্ঠিত গণভোটেরও বিরোধিতা করছে। বাম দলগুলোর আশঙ্কা, এই গণভোট মুক্তিযুদ্ধের আদর্শিক ভিত্তিকে দুর্বল করতে পারে এবং ধর্মনিরপেক্ষতা, সামাজিক ন্যায় ও ঐতিহাসিক জবাবদিহি থেকে সরে যেতে পারে।
প্রাসঙ্গিকতা না পুনরুজ্জীবন: বাংলাদেশের বাম রাজনীতির ভবিষ্যৎ
কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাম প্রার্থীরা তাদের প্রচারকে কেবল নির্বাচনী প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখছেন না। তারা এটিকে দীর্ঘ ঐতিহাসিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতা হিসেবে তুলে ধরছেন।
প্রার্থীরা বলছেন, তাদের লক্ষ্য ক্রমবর্ধমান মেরুকরণ, অভিজাত আধিপত্য এবং ডান ও অতি-ডান রাজনীতির উত্থানের মধ্যে একটি রাজনৈতিক বিকল্প টিকিয়ে রাখা।
জলি তালুকদার মনে করেন, সীমিত সাফল্যও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি বলেন, “আমরা বেশি আসন না জিতলেও দুর্নীতি, কৃষক ও সাধারণ মানুষের প্রশ্নে আলোচনার ধারা বদলাতে পারি।”
জুয়েলের মতে, এই প্রচার নৈতিক প্রতিরোধের অংশ। তিনি বলেন, “রাজনীতি যদি শুধু ধনীদের হয়, তবে গণতন্ত্র অর্থহীন হয়ে পড়ে।”
ড. আহমেদের মতে, ১৯৭১ সাল থেকেই বাম দলগুলোর জনপ্রিয়তার ঘাটতি রয়েছে এবং নির্বাচনী রাজনীতিতে তাদের গ্রহণযোগ্যতা খুবই সীমিত। নির্বাচন পরিচালনায় শক্তিশালী গণভিত্তি প্রয়োজন, যা বাম সংগঠনগুলোর নেই। ধর্মবিরোধী শক্তি হিসেবে তাদের প্রতি যে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে, তা এখনও পুরোপুরি বদলায়নি।
সবশেষে তিনি বলেন, “কোটিপতিশূন্য সংসদের কথা বলা একটি স্বপ্নের মতো শোনায়। বামপন্থী ও কমিউনিস্টরা স্বপ্ন দেখাতে পারে, কিন্তু তা বাস্তবায়নের স্পষ্ট পথ তাদের নেই।”
লেখক: বাংলাদেশি সাংবাদিক ও আলোকচিত্রী। তিনি ঢাকা থেকে 'দ্য ডিপ্লোম্যাট'-এর জন্য রাজনীতি ও সমাজ বিষয়ক সংবাদ সংগ্রহ করেন।

ঢাকা থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূরে জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ী উপজেলার আওনা ইউনিয়ন। এখানেই শীতের বিকেলে দেখা যায় এক ঘর থেকে আরেক ঘরে, বাজার থেকে বাজারে সহকর্মীদের নিয়ে নিয়ে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন মো. মাহবুব জামান জুয়েল। কাস্তে প্রতীকের লাল পতাকা নিয়ে কৃষক, দোকানদার ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করে ভোট চাইছেন তিনি ও তার সহকর্মীরা।
এই যে পরিবেশে তিনি ভোট চেয়ে বেড়াচ্ছেন, তার চারপাশে তাকালে চোখে পড়ে এক অতিপরিচিত বাস্তবতা। যেখানে কৃষকদের লাভের পরিমাণ দিন দিন কমছে, সারের দাম বাড়ছে, আর ফসল ফলানো মানুষের চেয়ে মধ্যস্বত্বভোগীরাই বেশি লাভ কুড়াচ্ছে। এমন সময় মাইকে ভেসে আসে ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও!’
নিজ নির্বাচনী এলাকায় জুয়েল নতুন মুখ নন, তবে তিনি এমন এক রাজনৈতিক ধারার প্রতিনিধিত্ব করছেন, যা বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতির কেন্দ্রে বহুদিন ধরেই ম্লান। তা হলো দেশের বাম রাজনীতি।
আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে তিনি জামালপুর-৪ আসনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। জুয়েল তার প্রচারকে ক্ষমতার প্রচলিত প্রতিযোগিতা হিসেবে নয়, বরং বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এক নৈতিক হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদ সাময়িকী দ্য ডিপ্লোম্যাটকে জুয়েল বলেন, “পুঁজিবাদ গরিবদের রক্ষা করতে পারে না। কৃষক ফসল ফলায়, কিন্তু লাভ যায় ব্যবসায়ী, সিন্ডিকেট আর রাজনৈতিক অভিজাতদের পকেটে।”
জুয়েলের গল্পে অতীতের এক রাজনৈতিক যুগের প্রতিধ্বনি শোনা যায়। তিনি একজন সাবেক শ্রমিক ইউনিয়ন নেতার সন্তান। ছোটবেলা থেকেই জুয়েল মিছিল, সমাবেশ, বক্তৃতা আর তৃণমূল সংগঠনের চর্চা দেখে বড় হয়েছেন। ওই সময়ে অর্থ ও পেশিশক্তি নির্বাচনী রাজনীতিকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেনি। বিদেশে এক দশকের বেশি সময় মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করার পর তিনি স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে এসেছেন। ‘রাজনৈতিক বিনিয়োগকারী নয়, রাজনৈতিক কর্মী’ হিসেবে প্রচার চালাতে চান বলে জানান জুয়েল।
জুয়েলের প্রচারের মূল বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে ন্যায্য ফসলমূল্য, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য রেশন কর্মসূচি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কারিগরি প্রশিক্ষণ। তবে তার সামনে রয়েছে বিশাল চ্যালেঞ্জ।
জুয়েল বলেন, “আজকের বাংলাদেশে নির্বাচন ব্যয়বহুল, পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক নেটওয়ার্ক, আর রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা আদর্শের চেয়ে আর্থিক সক্ষমতার ওপর বেশি নির্ভরশীল। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো ভোটাররা যেন নিরাপদে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেন–তা নিশ্চিত করা। ভোটকেন্দ্রগুলো নিরাপদ থাকলে নির্বাচনের ফল একেবারেই ভিন্ন হতে পারে।”
জুয়েলের এই প্রচার সারা দেশে চলমান এক বৃহত্তর রাজনৈতিক পরীক্ষার প্রতিচ্ছবি। হাসিনা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের বামপন্থীদের একাংশ ডেমোক্রেটিক ইউনাইটেড ফ্রন্ট নামে একটি জোট গঠন করে সমন্বিতভাবে নির্বাচনী অঙ্গনে ফেরার চেষ্টা করছে।
এই জোটে রয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (বাংলাদেশ জাসদ), বাংলাদেশ রেভ্যুলুশনারি কমিউনিস্ট লীগ, ডেমোক্রেটিক রেভল্যুশনারি পার্টি, সোনার বাংলা পার্টি, ঐক্য ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি এবং অন্যান্য বামঘেঁষা দল। জোট নেতাদের ভাষ্য, তারা বাংলাদেশের সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে প্রায় ১৫০টিতে প্রার্থী দিচ্ছেন।
তাদের যৌথ ইশতেহারে ১৮ দফা অঙ্গীকার তুলে ধরা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে-রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন, আইনের শাসন জোরদার, নির্বাচনব্যবস্থার সংস্কার, স্থানীয় সরকারকে ক্ষমতায়ন, বৈষম্য হ্রাস এবং মানবাধিকার, নারী অধিকার ও শ্রমিক অধিকারের সুরক্ষা।
জোটটি অর্থনৈতিক কাঠামো পুনর্বিন্যাস, জনস্বাস্থ্য ও শিক্ষা সংস্কার, পরিবেশ সংরক্ষণ, তরুণদের ক্ষমতায়ন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সংস্কৃতি ও বিজ্ঞানচর্চার প্রসারে গুরুত্ব দিচ্ছে। তাদের লক্ষ্য সংসদকে সম্পদ, অপরাধ ও সাম্প্রদায়িক প্রভাবের কেন্দ্র থেকে বের করে জনগণকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ১৯৯০ ও ২০২৪ সালের গণআন্দোলনের আদর্শ সমুন্নত রাখা।
একসময় দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে যে রাজনৈতিক ধারা সক্রিয় ছিল, সেটিকে পুনরুজ্জীবিত করাই তাদের উদ্দেশ্য বলেও জানান জুয়েল। অবশ্য এই উদ্দেশ্য বর্তমানে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য ডানপন্থী শক্তির প্রাধান্যে আড়ালে পড়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে জুয়েলের মতো প্রার্থীরা যখন গ্রামীণ জনপদে প্রচার চালাচ্ছেন, তখন একটি প্রশ্ন সামনে আসছে, বাংলাদেশের বামপন্থীরা কি আসলেই ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, নাকি ডান ও অতি-ডান রাজনীতির উত্থানের মধ্যে নিজেদের প্রান্তিক হয়ে পড়ার বিষয়টি লক্ষ্য করছেন?
প্রান্তিক এলাকায় প্রচার: অর্থ, ভৌগোলিক বাধা ও রাজনৈতিক প্রভাবের লড়াই
নেত্রকোনার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে, যেখানে জল, বিচ্ছিন্নতা ও মৌসুমি ঝুঁকি মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে, সিপিবি প্রেসিডিয়াম সদস্য ও প্রার্থী জলি তালুকদার সেখানে প্রচার চালাচ্ছেন। এখানকার মানুষ বছরের অর্ধেক সময় জীবিকা নির্ভর করে মাছ ধরে ও কৃষিকাজ করে, বাকি অর্ধেক সময় বেকারত্ব, বন্যা ও ঋণের চাপ দৈনন্দিন বাস্তবতা হয়ে ওঠে।
জলি দ্য ডিপ্লোম্যাটকে বলেন, “এখানকার মানুষ ছয় মাস কাজ আর ছয় মাস অনিশ্চয়তার মধ্যে বেঁচে থাকে।”
তার প্রচারের মূল বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে বন্যা প্রতিরোধ, মৎস্য আহরণের ন্যায্য অধিকার, কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা এবং ভূমি নিরাপত্তা, যা ওই অঞ্চলের নাজুক অর্থনীতিকে সরাসরি প্রভাবিত করে।
তবে হাওরাঞ্চলে সংগঠিত প্রচার চালাতে লজিস্টিক ও রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে নৌযান, পরিবহন ও নিয়মিত উপস্থিতি প্রয়োজন, যা বামপন্থী দলগুলোর সীমিত সম্পদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
জলি তালুকদারের অভিযোগ, “ক্ষমতাবানরাই ঠিক করে কে মাছ ধরবে, কে চাষ করবে, আর কে সহায়তা পাবে। সাধারণ মানুষ নির্ভরশীলই থেকে যায়।”
স্থানীয়দের সহানুভূতি থাকলেও মূলধারার দলগুলোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করাকে তিনি গতানুগতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই হিসেবে দেখছেন। তার ভাষ্য, ধনী প্রার্থীরা পোস্টার, বেতনভুক্ত প্রচারকর্মী, যানবাহন, পৃষ্ঠপোষক ও গ্রাহকদের নেটওয়ার্ক দিয়ে নির্বাচনী এলাকা ভরিয়ে ফেলেন। প্রশাসনিক পক্ষপাত ও অনানুষ্ঠানিক রাজনৈতিক প্রভাবও মাঠের সমীকরণকে তাদের অনুকূলে ঠেলে দেয়।
বাংলাদেশের সব এলাকাতেই বামরা একই ধরনের সমস্যায় ভোগেন। নির্বাচনের জামানত দিতে, ক্যাম্পেইন অফিস ভাড়া করতে বা প্রচারের জিনিসপত্র ছাপানোর টাকা জোগাড় করতে তাদের হিমশিম খেতে হয়।
অন্যান্য দলের নেতারা যেখানে প্রান্তিক এলাকাগুলোতে লাখ লাখ টাকা খরচ করে প্রচার চালান, সেখানে বামপন্থীদের ভরসা হলো স্বেচ্ছাসেবক ও আদর্শভিত্তিক নানা প্রতিশ্রুতি।
এক কর্মী বলেন, “নির্বাচন এখন ব্যবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোটি কোটি টাকা খরচ না করলে প্রার্থী হিসেবে দৃষ্টি কাড়া যায় না।”
এ নির্বাচনে নির্বাচনী জামানতের পরিমাণ বাড়ানো প্রসঙ্গে জলি তালুকদার বলেন, “উচ্চ জামানতের কারণে আমাদের দল অনেক আসনে প্রার্থী দিতে পারেনি। নির্বাচন কমিশনের নীতিতে অসঙ্গতি রয়েছে। তারা অর্থ-সম্পর্কিত বাধা কমানোর কথা বললেও বাস্তবে ধনী ও যানবাহনের সুবিধাপ্রাপ্তদের পক্ষেই চলমান ব্যবস্থা কাজ করে। সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা সম্ভব হয় না। এতে মূলত নিশ্চিত হয় যে, জিতবে কেবল ধনীরাই।”
এর ফলে এক ধরনের বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে। বামপন্থী প্রার্থীরা প্রায়ই শ্রমজীবী ও গ্রামীণ ভোটারদের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বিষয় তুলে নির্বাচনী ইশতেহারে ধরেন, কিন্তু সেই সাড়া ভোটে রূপান্তর করার মতো সাংগঠনিক কাঠামো তাদের হাতে নেই।

বাম রাজনীতির দীর্ঘ অবক্ষয়
বাংলাদেশের বাম রাজনীতির অতীত ছিল ভিন্ন। ১৯৫০, ১৯৬০ ও ১৯৭০–এর দশকে মার্কসবাদ, মাওবাদ ও সমাজতন্ত্রের মতো বাম চিন্তাধারাই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (পিবিসিপি) ও অন্যান্য বিপ্লবী সংগঠন শ্রমিক, কৃষক ও শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করে শ্রেণিবৈষম্যহীন সমাজ ও সামাজিক ন্যায়ের দাবিতে আন্দোলন চালিয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধের সময় বামপন্থীদের বিভিন্ন অংশ তৃণমূল পর্যায়ে মানুষকে সংগঠিত করা, স্থানীয়ভাবে প্রতিরোধ সমন্বয় করা এবং স্বাধীনতার জন্য করা আন্দোলনে আদর্শিক কাঠামো গড়ে তোলায় সক্রিয় ভূমিকা রাখে। শ্রম অধিকার, ভূমি সংস্কার ও সাম্যবাদী মূল্যবোধের ওপর তাদের জোর কৃষক ও শ্রমিকদের মধ্যে গভীর সাড়া ফেলেছিল সে সময়।
১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিরোধেও বামঘেঁষা দল ও কর্মীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, যদিও তাদের অবদান পরবর্তীকালে প্রায় বিস্মৃত হয়েছে।
আওয়ামী মুসলিম লীগ, কৃষক প্রজা পার্টি, গণতন্ত্রী দল ও নিজাম-ই-ইসলাম পার্টিসহ বিভিন্ন দল নিয়ে গঠিত যুক্তফ্রন্ট আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন, ভাষার অধিকার ও সামাজিক ন্যায়ের দাবিতে নির্বাচন করে শ্রমিক, কৃষক ও প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের বড় অংশের সমর্থন পায়। কমিউনিস্ট ও অন্যান্য বাম মিত্ররা জোটের পক্ষে তৃণমূলের ভিত্তি সংগঠিত করতে সহায়তা করে। ফলে যুক্তফ্রন্ট প্রাদেশিক পরিষদে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে ভূমিধস জয় পায়।
তবে এই সাফল্য ছিল স্বল্পস্থায়ী। কয়েক মাসের মধ্যেই সরকার বরখাস্ত হয়, শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয় এবং নাগরিক অধিকার কঠোরভাবে সীমিত করা হয়। কমিউনিস্ট পার্টি ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলো নিষেধাজ্ঞা ও দমন-পীড়নের মুখে পড়ে, ফলে তাদের সংগঠনভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়।
এতে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়, পূর্ব পাকিস্তানে বামপন্থী প্রভাব বা স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন দমনে পাকিস্তানি রাষ্ট্র কতদূর যেতে প্রস্তুত ছিল।
এ ছাড়া ১৯৬০–এর দশকে অভ্যন্তরীণ আদর্শগত বিভাজন দ্রুতই বাম রাজনীতির প্রভাব নষ্ট করে দেয়। কমিউনিস্ট পার্টি মস্কোপন্থী ও বেইজিংপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী ধারায় ভেঙে যায়। একটি অংশ বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে সমর্থন করে ভারত-সোভিয়েত ঘরানার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলে, অন্য অংশ স্বাধীনতাকে আংশিক বলে প্রত্যাখ্যান করে আরও ‘র্যাডিকাল’ বিপ্লবের দাবি তোলে।
সিরাজ সিকদারের পূর্ববাংলা শ্রমিক আন্দোলন ও পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টির মতো মাওবাদী প্রভাবিত সংগঠনগুলো শুরুতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়লেও পরে শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারকে যথেষ্ট বিপ্লবী নয় বলে সমালোচনা করে।
এসব দ্বন্দ্ব স্বাধীনতার শুরুর সময়কার রাজনৈতিক অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। তবে চীনে মাওবাদী প্রভাব কমে গেলে এসব গোষ্ঠী বহিরাগত আদর্শিক সমর্থন ও সম্ভাব্য সহায়তার উৎস দুটোই হারায়।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে ধর্মভিত্তিক দলগুলো নিষিদ্ধ হলে বামপন্থীরা কিছু সময়ের জন্য বিরোধী রাজনীতির অন্যতম উৎস হয়ে ওঠে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে টানাপোড়েনে তারা শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়।
এই বিভাজনকে কাজে লাগিয়ে শেখ মুজিব বহুদলীয় প্রতিযোগিতা বন্ধ করে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) গঠন করেন। একই সময়ে গণমাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ এবং ১৯৭৫ সালে পত্রিকা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে একীভূত করার মাধ্যমে ভিন্নমত ও আদর্শিক বহুত্বের পরিসর সংকুচিত হয়।
১৯৭৫ সালের পর সমাজতান্ত্রিক আদর্শ থেকে সামরিক শাসন ও বাজারমুখী অর্থনৈতিক সংস্কারের দিকে দেশ অগ্রসর হলে বামপন্থীরা আরও প্রান্তিক হয়ে পড়ে। জিয়াউর রহমান ও পরবর্তীতে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের আমলে বৃহত্তর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও বাম দলগুলো দমন-পীড়নের মুখে পড়ে।
প্রায় চার দশক পর ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে সামরিক শাসক এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে বাম দলগুলো আবারও বৃহত্তর গণতন্ত্রপন্থী জোটের অংশ হয়। ১৯৮০–এর দশকের শেষদিকে ছাত্রসংগঠন, শ্রমিক সংগঠন ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল- যার মধ্যে পাঁচদলীয় বাম জোট এবং আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন বড় জোটগুলো ছিল, তারা সবাই মিলে স্বৈরশাসনের অবসানের দাবিতে একত্রিত হয়।
১৯৯০ সালে যখন ধর্মঘট, বিক্ষোভ ও গণসমাবেশ দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, তখন শিক্ষার্থী ও শ্রমিকসহ অনেককে ব্যক্তিগত মূল্য দিতে হয়। জরুরি অবস্থা ও কঠোর দমননীতি সত্ত্বেও এই আন্দোলন মতাদর্শগত বিভাজন অতিক্রম করে শাসনব্যবস্থাকে অচল করে দেয় এবং দীর্ঘ সামরিক শাসনের অবসানে ভূমিকা রাখে।
তবে ১৯৯০–এর দশকে নির্বাচনী রাজনীতি আওয়ামী লীগ-বিএনপি কেন্দ্রিক হয়ে পড়ে, যেখানে অর্থ ও পৃষ্ঠপোষকতাই প্রধান নিয়ামক হয়ে ওঠে। এ প্রেক্ষাপটে বাম দলগুলোর টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়ে।
‘স্বপ্ন দেখায়, কিন্তু শাসনে আস্থার ঘাটতি’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও স্বতন্ত্র গবেষক আলতাফ পারভেজ বলেন, সময়ের সঙ্গে বামপন্থীরা নিজেদের জায়গা হারিয়েছে। তার মতে, আদর্শিক স্থবিরতা, সাংগঠনিক দুর্বলতা ও রাষ্ট্রীয় দমন–এই তিনের সমন্বয়েই এ পতন। বাম দলগুলো কৌশল আধুনিকীকরণ, সামাজিক ভিত্তি বিস্তৃত করা বা পরিবর্তিত অর্থনৈতিক বাস্তবতায় কার্যকর সাড়া দিতে ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
আলতাফ পারভেজ বলেন, বামপন্থীরা শহরভিত্তিক বুদ্ধিজীবী পরিসরে সীমাবদ্ধ থেকেছে, গ্রামীণ ভোটার ও উদীয়মান সামাজিক গোষ্ঠীর সঙ্গে সংযোগ হারিয়েছে।
এদিকে নির্বাচনী রাজনীতি ক্রমেই অর্থ, পৃষ্ঠপোষকতা ও কেন্দ্রীভূত নেতৃত্বনির্ভর হয়ে উঠেছে। মূলধারার দলগুলো যেখানে সংগঠন সম্প্রসারণ করেছে, আর বাম সংগঠনগুলো সেখানে সীমিত সম্পদ, অভ্যন্তরীণ বিভক্তি ও নেতৃত্বসংকটে জর্জরিত বলে মত দেন এই বিশ্লেষক।
শেখ হাসিনার শাসনবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া সত্ত্বেও বাম দলগুলোর ক্ষেত্রে একই বাস্তবতা বহাল রয়েছে। জুলাইয়ের অভ্যুত্থানে তাদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য ছিল, কিন্তু তা নির্বাচনী গতি সৃষ্টিতে প্রতিফলিত হয়নি।
আন্তর্জাতিক উদাহরণ টেনে পারভেজ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে নিউইয়র্কে বামঘেঁষা অবস্থান নিয়ে জোহরান মামদানির মতো নেতারা সমর্থন পেয়েছেন, শ্রীলঙ্কায় গণঅভ্যুত্থানের পর বামঘেঁষা শক্তির উত্থান ঘটেছে। কিন্তু তার মতে, বাংলাদেশে বাম দলগুলো এখনও প্রয়োজনীয় তাত্ত্বিক ও সাংগঠনিক সংস্কার করেনি এবং তৃণমূল সংগ্রামের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা দুর্বল।
বাংলাদেশের বাম রাজনীতির সামনে দুটি ‘বড় সংকট’ চিহ্নিত করেন আলতাফ পারভেজ। এর মধ্যে একটি হলো তাত্ত্বিক সংকট, অন্যটি সাংগঠনিক সংকট। স্থানীয় পর্যায়ে সম্পৃক্ততা কমে গেছে এবং সমাজে চলমান পরিবর্তন সম্পর্কে শক্তিশালী অনুধাবনও তাদের নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ বাম রাজনীতির সামনে আরেকটি বাধার কথা উল্লেখ করেন, সেটি হলো জনধারণা। তার মতে, দীর্ঘদিন ধরে সমাজের একটি অংশ বাম রাজনীতিকে সন্দেহের চোখে দেখে, যেখানে বামপন্থীদের ধর্মবিরোধী বা সাংস্কৃতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “তারা স্বপ্ন দেখাতে পারে, কিন্তু শাসন করার মতো বিশ্বাসযোগ্যতা বা নেতৃত্ব তারা গড়ে তুলতে পারেনি।”
এই শিক্ষকের ভাষ্য, অর্থনীতির পরিবর্তনের সঙ্গে এই বিশ্বাসযোগ্যতার ঘাটতি আরও বেড়েছে। দ্রুত নগরায়ণ, প্রবাসে শ্রমবাজার, তৈরি পোশাক খাতের সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল যোগাযোগ ভোটারদের অগ্রাধিকার বদলে দিয়েছে। কিন্তু বহু বাম দল এখনও পুরোনো শ্রেণিভিত্তিক স্লোগানের ওপর নির্ভর করছে, নতুন শ্রম কাঠামো বা তরুণদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খাওয়াতে পারেনি।
এদিকে ডানপন্থী ও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তিগুলো পরিচয়, নৈতিকতা ও সামাজিক রক্ষণশীলতার প্রশ্নে জনসমর্থন সংগঠিত করে প্রভাব বিস্তার করেছে। প্রগতিশীল রাজনীতির বিভাজনে তৈরি শূন্যস্থান পূরণ করেছে।
সাব্বির আহমেদ বলেন, “ডানপন্থী শক্তির উত্থানের প্রেক্ষাপটে নিজেদের ঐক্যবদ্ধ করতে এবং পরোক্ষভাবে তা মোকাবিলা করতেই হয়তো তারা এই জোট গঠন করেছে। তবে নির্বাচনের পরই বোঝা যাবে এর প্রভাব।” তার মতে, নির্বাচনে বামপন্থীরা চমক দেখাতে পারবে না, অতীতের ভোটের প্রবণতা বদলাবে বলে মনে হয় না।
জোট কৌশল: ঐক্য কি লাল রাজনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারবে?
ডেমোক্রেটিক ইউনাইটেড ফ্রন্ট দীর্ঘদিনের বিভাজন কাটিয়ে ওঠার একটি চেষ্টা। সিপিবি, বাসদ, বাংলাদেশ জাসদসহ বামঘেঁষা দলগুলোর এই জোট নিজেদের ‘কোটিপতিনির্ভর সংসদ’-এর বিকল্প হিসেবে তুলে ধরছে।
বাসদের সাধারণ সম্পাদক ও জোটের কেন্দ্রীয় নেতা বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, প্রার্থীদের আর্থিক প্রোফাইলই বৃহত্তর গণতান্ত্রিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। তিনি দ্য ডিপ্লোম্যাটকে বলেন, “বর্তমান নির্বাচনে প্রায় ২ হাজার প্রার্থী রয়েছেন, যাদের মধ্যে ৮৯১ জন কোটিপতি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২৭ জনের সম্পদ ১০০ কোটির বেশি।”
তিনি বলেন, “এই পরিস্থিতিতে আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার হলো সংসদকে ব্যবসায়ী ও ধনীদের ক্লাবে পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা করা। কারণ ধনীরা প্রাধান্য পেলে শ্রমিক, বঞ্চিত ও প্রান্তিক মানুষের স্বার্থ উপেক্ষিত হবে। আমাদের মূল লক্ষ্য জনসচেতনতা তৈরি এবং এই নির্বাচনের মাধ্যমে তা শক্তিশালী করা।”
বজলুর রশীদ ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানকে স্বাধীনতার অপূর্ণ আদর্শের ধারাবাহিক সংগ্রাম হিসেবে দেখেন। তার ভাষ্য, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল সমতা, মানবমর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়ের সংগ্রাম, যা পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়নি। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানও গণতন্ত্র পুরোপুরি প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। ফলে ২০২৪ সালে মানুষ আবারও পরিবর্তনের দাবিতে রাস্তায় নামে। এই তিনটি আন্দোলন একই ধারাবাহিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ বলে মনে করেন তিনি।
তিনি বলেন, এই আদর্শ বাস্তবায়নে শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, ব্যবস্থাগত পরিবর্তন প্রয়োজন। শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার উদাহরণ তুলে তিনি বলেন, পুঁজিবাদী কাঠামোর মধ্যেও জনমুখী সংস্কার সম্ভব। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেওয়ার কথাও তিনি বলেন।
তার মতে, বামদের অংশগ্রহণ শুধু আসন জয়ের জন্য নয়, রাজনৈতিক আলোচনার ধারা বদলে দেওয়ার জন্য। শ্রম অধিকার, সম্পদ বৈষম্য, মূল্য নিয়ন্ত্রণ, জনস্বাস্থ্য ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি নিয়ে আলোচনাকে জোরদার করা এর লক্ষ্য বলে উল্লেখ করেন বজলুর রশীদ।
বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মোস্তাক হোসেন বলেন, পুঁজিবাদ উচ্ছেদ বাস্তবসম্মত নয়, তবে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ, প্রগতিশীল করব্যবস্থা ও কল্যাণমূলক সম্প্রসারণের মাধ্যমে সংস্কার সম্ভব। তার মতে, “ন্যূনতম দাবি হলো দুর্নীতি ও অপরাধীকরণ কমানো, তা ছাড়া গণতন্ত্র কার্যকর হতে পারে না।”
জোটটি একই দিনে অনুষ্ঠিত গণভোটেরও বিরোধিতা করছে। বাম দলগুলোর আশঙ্কা, এই গণভোট মুক্তিযুদ্ধের আদর্শিক ভিত্তিকে দুর্বল করতে পারে এবং ধর্মনিরপেক্ষতা, সামাজিক ন্যায় ও ঐতিহাসিক জবাবদিহি থেকে সরে যেতে পারে।
প্রাসঙ্গিকতা না পুনরুজ্জীবন: বাংলাদেশের বাম রাজনীতির ভবিষ্যৎ
কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাম প্রার্থীরা তাদের প্রচারকে কেবল নির্বাচনী প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখছেন না। তারা এটিকে দীর্ঘ ঐতিহাসিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতা হিসেবে তুলে ধরছেন।
প্রার্থীরা বলছেন, তাদের লক্ষ্য ক্রমবর্ধমান মেরুকরণ, অভিজাত আধিপত্য এবং ডান ও অতি-ডান রাজনীতির উত্থানের মধ্যে একটি রাজনৈতিক বিকল্প টিকিয়ে রাখা।
জলি তালুকদার মনে করেন, সীমিত সাফল্যও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি বলেন, “আমরা বেশি আসন না জিতলেও দুর্নীতি, কৃষক ও সাধারণ মানুষের প্রশ্নে আলোচনার ধারা বদলাতে পারি।”
জুয়েলের মতে, এই প্রচার নৈতিক প্রতিরোধের অংশ। তিনি বলেন, “রাজনীতি যদি শুধু ধনীদের হয়, তবে গণতন্ত্র অর্থহীন হয়ে পড়ে।”
ড. আহমেদের মতে, ১৯৭১ সাল থেকেই বাম দলগুলোর জনপ্রিয়তার ঘাটতি রয়েছে এবং নির্বাচনী রাজনীতিতে তাদের গ্রহণযোগ্যতা খুবই সীমিত। নির্বাচন পরিচালনায় শক্তিশালী গণভিত্তি প্রয়োজন, যা বাম সংগঠনগুলোর নেই। ধর্মবিরোধী শক্তি হিসেবে তাদের প্রতি যে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে, তা এখনও পুরোপুরি বদলায়নি।
সবশেষে তিনি বলেন, “কোটিপতিশূন্য সংসদের কথা বলা একটি স্বপ্নের মতো শোনায়। বামপন্থী ও কমিউনিস্টরা স্বপ্ন দেখাতে পারে, কিন্তু তা বাস্তবায়নের স্পষ্ট পথ তাদের নেই।”
লেখক: বাংলাদেশি সাংবাদিক ও আলোকচিত্রী। তিনি ঢাকা থেকে 'দ্য ডিপ্লোম্যাট'-এর জন্য রাজনীতি ও সমাজ বিষয়ক সংবাদ সংগ্রহ করেন।

অনিরাপদ বিশ্ব নিরাপদ হবে না যতদিন একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারীর ক্ষমতা খর্ব না হয়। সেটি সম্ভব-যদি Balance of Terror প্রতিষ্ঠিত হতো। ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ভারতের পারমাণবিক শক্তি অর্জনের সমর্থনে বলেছিলেন, ‘Strength respects strength’। জানি না কতদিনে বিশ্বের এই একতরফা ক্ষমতার অবাসন হবে?