মো. ফজলুল করিম

আমাদের সমাজ বদলেছে। রাষ্ট্র হয়েছে আরও আধুনিক। শিক্ষা, প্রযুক্তি ও জীবনযাপনের নানা ক্ষেত্রে সুযোগ-সুবিধা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু এই অগ্রগতির আড়ালেই নীরবে বাড়ছে এক গভীর সংকট—তরুণদের হতাশা।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার খবর আমাদের নাড়িয়ে দেয়। গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়—এমনকি দেশের শীর্ষ চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করা এক তরুণ, যিনি উচ্চশিক্ষার জন্য ইংল্যান্ডে অবস্থান করছিলেন, ছুটিতে দেশে এসে আত্মহত্যা করেছেন—এমন ঘটনাও আমাদের সামনে এসেছে। এসব ঘটনা কেবল বিচ্ছিন্ন নয়; বরং একটি বৃহত্তর মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের ইঙ্গিত বহন করে।
প্রশ্ন জাগে—কেন এমন হচ্ছে? কেন এত সম্ভাবনাময় তরুণরা জীবনের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলছে?
অনেকে মনে করেন, বর্তমান প্রজন্ম দ্রুত সাফল্য অর্জনের এক তীব্র চাপের মধ্যে বাস করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের সাফল্য, জীবনযাত্রার চাকচিক্য এবং ক্রমাগত তুলনার সংস্কৃতি তাদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে। নিজেদের জীবনকে তারা অন্যের মানদণ্ডে মাপতে গিয়ে সহজেই হতাশ হয়ে পড়ে। অল্পতেই ব্যর্থতার অনুভূতি গ্রাস করে, আর সেই ব্যর্থতাকে তারা অনেক সময় চূড়ান্ত বলে ধরে নেয়।
এ ছাড়া এক ধরনের অদৃশ্য অতৃপ্তি তাদের মধ্যে কাজ করে। যা আছে, তা নিয়ে সন্তুষ্ট হওয়ার প্রবণতা কমে গেছে; বরং যা নেই, সেটিই তাদের চিন্তার কেন্দ্রে চলে আসে। বাস্তবতার সঙ্গে ফ্যান্টাসির এই দ্বন্দ্ব তাদের আরও বিচ্ছিন্ন ও হতাশ করে তোলে।
তবে এই প্রজন্মকে কেবল ‘স্বার্থপর’ বা ‘দুর্বল’ বলে দায়ী করাও একপেশে হবে। বাস্তবতা হলো–তারা এক ভিন্ন ধরনের চাপে বড় হচ্ছে—প্রতিযোগিতা, অনিশ্চয়তা, একাকিত্ব এবং সামাজিক প্রত্যাশার বহুমাত্রিক চাপ তাদের মানসিক স্থিতি নষ্ট করে দিচ্ছে। পরিবার ও সমাজের সঙ্গে আবেগগত সংযোগও অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়েছে।

আমাদের নিজেদের বেড়ে ওঠার সময়ের সঙ্গে বর্তমান প্রজন্মের বাস্তবতার পার্থক্যও এখানে বিবেচ্য। একসময় সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও ছোট ছোট অর্জনে আনন্দ ছিল, পরিবারকে কেন্দ্র করে এক ধরনের সংহতি ছিল। নতুন পোশাকের জন্য ঈদের অপেক্ষা, সীমিত চাহিদার মধ্যে জীবনযাপন—এসব অভিজ্ঞতা আমাদের ধৈর্য, সহনশীলতা এবং বাস্তবতা মেনে নেওয়ার শিক্ষা দিয়েছে।
অন্যদিকে, বর্তমান প্রজন্ম ভোগের সহজলভ্যতা ও প্রত্যাশার উচ্চতায় এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে, যেখানে অপূর্ণতা সহ্য করার ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কমে গেছে। ফলে সামান্য ব্যর্থতাও তাদের কাছে অসহনীয় মনে হয়।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। রাষ্ট্রকে অবশ্যই তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পেশাদার মনোবিশারদ নিয়োগ, শিক্ষাক্রমে মানসিক সুস্থতা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা এবং হতাশা মোকাবিলার বাস্তবধর্মী কৌশল শেখানো এখন সময়ের দাবি।
পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজ—সবারই দায়িত্ব রয়েছে তরুণদের সঙ্গে খোলামেলা যোগাযোগ গড়ে তোলা, তাদের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং ব্যর্থতাকে জীবনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে শেখানোর ক্ষেত্রে।
তরুণরা এই দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। তাদের হতাশা কেবল ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি জাতীয় ক্ষতি। তাই এখনই সময়—উন্নয়নের পাশাপাশি মানসিক সুস্থতার বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখার।
লেখক: অধ্যাপক, বিজিই বিভাগ, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

আমাদের সমাজ বদলেছে। রাষ্ট্র হয়েছে আরও আধুনিক। শিক্ষা, প্রযুক্তি ও জীবনযাপনের নানা ক্ষেত্রে সুযোগ-সুবিধা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু এই অগ্রগতির আড়ালেই নীরবে বাড়ছে এক গভীর সংকট—তরুণদের হতাশা।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার খবর আমাদের নাড়িয়ে দেয়। গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়—এমনকি দেশের শীর্ষ চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করা এক তরুণ, যিনি উচ্চশিক্ষার জন্য ইংল্যান্ডে অবস্থান করছিলেন, ছুটিতে দেশে এসে আত্মহত্যা করেছেন—এমন ঘটনাও আমাদের সামনে এসেছে। এসব ঘটনা কেবল বিচ্ছিন্ন নয়; বরং একটি বৃহত্তর মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের ইঙ্গিত বহন করে।
প্রশ্ন জাগে—কেন এমন হচ্ছে? কেন এত সম্ভাবনাময় তরুণরা জীবনের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলছে?
অনেকে মনে করেন, বর্তমান প্রজন্ম দ্রুত সাফল্য অর্জনের এক তীব্র চাপের মধ্যে বাস করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের সাফল্য, জীবনযাত্রার চাকচিক্য এবং ক্রমাগত তুলনার সংস্কৃতি তাদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে। নিজেদের জীবনকে তারা অন্যের মানদণ্ডে মাপতে গিয়ে সহজেই হতাশ হয়ে পড়ে। অল্পতেই ব্যর্থতার অনুভূতি গ্রাস করে, আর সেই ব্যর্থতাকে তারা অনেক সময় চূড়ান্ত বলে ধরে নেয়।
এ ছাড়া এক ধরনের অদৃশ্য অতৃপ্তি তাদের মধ্যে কাজ করে। যা আছে, তা নিয়ে সন্তুষ্ট হওয়ার প্রবণতা কমে গেছে; বরং যা নেই, সেটিই তাদের চিন্তার কেন্দ্রে চলে আসে। বাস্তবতার সঙ্গে ফ্যান্টাসির এই দ্বন্দ্ব তাদের আরও বিচ্ছিন্ন ও হতাশ করে তোলে।
তবে এই প্রজন্মকে কেবল ‘স্বার্থপর’ বা ‘দুর্বল’ বলে দায়ী করাও একপেশে হবে। বাস্তবতা হলো–তারা এক ভিন্ন ধরনের চাপে বড় হচ্ছে—প্রতিযোগিতা, অনিশ্চয়তা, একাকিত্ব এবং সামাজিক প্রত্যাশার বহুমাত্রিক চাপ তাদের মানসিক স্থিতি নষ্ট করে দিচ্ছে। পরিবার ও সমাজের সঙ্গে আবেগগত সংযোগও অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়েছে।

আমাদের নিজেদের বেড়ে ওঠার সময়ের সঙ্গে বর্তমান প্রজন্মের বাস্তবতার পার্থক্যও এখানে বিবেচ্য। একসময় সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও ছোট ছোট অর্জনে আনন্দ ছিল, পরিবারকে কেন্দ্র করে এক ধরনের সংহতি ছিল। নতুন পোশাকের জন্য ঈদের অপেক্ষা, সীমিত চাহিদার মধ্যে জীবনযাপন—এসব অভিজ্ঞতা আমাদের ধৈর্য, সহনশীলতা এবং বাস্তবতা মেনে নেওয়ার শিক্ষা দিয়েছে।
অন্যদিকে, বর্তমান প্রজন্ম ভোগের সহজলভ্যতা ও প্রত্যাশার উচ্চতায় এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে, যেখানে অপূর্ণতা সহ্য করার ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কমে গেছে। ফলে সামান্য ব্যর্থতাও তাদের কাছে অসহনীয় মনে হয়।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। রাষ্ট্রকে অবশ্যই তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পেশাদার মনোবিশারদ নিয়োগ, শিক্ষাক্রমে মানসিক সুস্থতা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা এবং হতাশা মোকাবিলার বাস্তবধর্মী কৌশল শেখানো এখন সময়ের দাবি।
পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজ—সবারই দায়িত্ব রয়েছে তরুণদের সঙ্গে খোলামেলা যোগাযোগ গড়ে তোলা, তাদের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং ব্যর্থতাকে জীবনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে শেখানোর ক্ষেত্রে।
তরুণরা এই দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। তাদের হতাশা কেবল ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি জাতীয় ক্ষতি। তাই এখনই সময়—উন্নয়নের পাশাপাশি মানসিক সুস্থতার বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখার।
লেখক: অধ্যাপক, বিজিই বিভাগ, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

অনিরাপদ বিশ্ব নিরাপদ হবে না যতদিন একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারীর ক্ষমতা খর্ব না হয়। সেটি সম্ভব-যদি Balance of Terror প্রতিষ্ঠিত হতো। ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ভারতের পারমাণবিক শক্তি অর্জনের সমর্থনে বলেছিলেন, ‘Strength respects strength’। জানি না কতদিনে বিশ্বের এই একতরফা ক্ষমতার অবাসন হবে?