বয়সের সাথে সাথে প্রতিটি মানুষের মস্তিষ্ক পরিবর্তিত হয়। এর পাশাপাশি পরিবর্তন আসে মানসিক কার্যক্ষমতায়। বয়স বাড়লে মানসিক ক্ষমতা কমে যাওয়া খুব সাধারণ একটি বিষয়, যা বার্ধক্যের অন্যতম একটি ভীতিজনক দিক। তবে বুদ্ধিমত্তা বা চিন্তাশক্তি কমে যাওয়া কিন্তু একেবারেই অনিবার্য নয়। নিচে এমন কিছু উপায় দেওয়া হলো, যা মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ধরে রাখতে সাহায্য করবে:
মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখা
মানুষ ও ইঁদুরের ওপর গবেষণা চালিয়ে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে, বুদ্ধিচর্চামূলক কাজ স্নায়ুকোষগুলোর মধ্যে নতুন নতুন সংযোগ তৈরিতে সাহায্য করে। এমনকি এটি মস্তিষ্কে নতুন কোষ তৈরিতেও সহায়তা করতে পারে। ফলে মস্তিষ্কে এক ধরনের স্নায়বিক নমনীয়তা বা ‘প্লাস্টিসিটি’ গড়ে ওঠে এবং একটি কার্যকরী সঞ্চয় তৈরি হয়, যা ভবিষ্যতে মস্তিষ্কের কোষ ক্ষয়ের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়।
যেকোনো ধরনের বুদ্ধিচর্চামূলক কাজই আপনার মস্তিষ্কের গঠনে সাহায্য করে। এজন্য নিয়মিত বই পড়ুন, কোনো কোর্সে অংশ নিন। এছাড়া শব্দজট বা অঙ্কের ধাঁধার মতো মানসিক কসরত অনুশীলন করতে পারেন। পাশাপাশি হাত ও মস্তিষ্কের যৌথ ব্যবহারের প্রয়োজন হয় এমন কাজগুলো যেমন, ছবি আঁকা, পেইন্টিং বা বিভিন্ন হস্তশিল্পের চর্চা করতে পারেন।
নিয়মিত ব্যায়াম করা
গবেষণায় দেখা গেছে যে, পেশির ব্যবহার মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়াতেও দারুণ সাহায্য করে। যেসব প্রাণী নিয়মিত ব্যায়াম করে, তাদের মস্তিষ্কের চিন্তাভাবনা নিয়ন্ত্রণকারী অংশে অক্সিজেনযুক্ত রক্ত পৌঁছে দেওয়ার জন্য সূক্ষ্ম রক্তনালীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। এছাড়া, ব্যায়াম নতুন স্নায়ুকোষ তৈরি করে এবং মস্তিষ্কের কোষগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক সংযোগ বাড়িয়ে দেয়।
এর ফলে বয়স্ক প্রাণীদের মস্তিষ্ক আরও দক্ষ, মানিয়ে নেওয়ার উপযোগী ও কর্মক্ষম হয়ে ওঠে, যা তাদের সামগ্রিক পারফরম্যান্সের উন্নতি ঘটায়। পাশাপাশি ব্যায়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে, কোলেস্টেরলের মাত্রা উন্নত করে, রক্তের শর্করা বা সুগার নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং মানসিক চাপ কমায়—যা হৃদযন্ত্রের পাশাপাশি মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্যও সমান উপকারী।
খাদ্যাভ্যাসে উন্নতি আনা
পুষ্টিকর খাবার আপনার শরীরের পাশাপাশি মনের স্বাস্থ্য রক্ষায়ও সাহায্য করে। উদাহরণস্বরূপ, যারা মেডিটেরেনিয়ান বা ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের খাদ্যাভ্যাস মেনে চলেন—যেখানে ফলমূল, শাকসবজি, মাছ, বাদাম, অসম্পৃক্ত তেল (যেমন: অলিভ অয়েল) এবং উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের ওপর জোর দেওয়া হয়, তাদের ক্ষেত্রে ডিমেনশিয়া (স্মৃতিভ্রংশ) ও বুদ্ধিমত্তা হ্রাস পাওয়ার ঝুঁকি অনেক কম থাকে।
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা
মধ্যবয়সে উচ্চ রক্তচাপ থাকলে তা বয়সে পৌঁছালে মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা কমার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। তাই জীবনযাত্রায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এনে আপনার রক্তচাপ যতটা সম্ভব স্বাভাবিক ও নিয়ন্ত্রণে রাখুন। ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন, নিয়মিত ব্যায়াম করুন, মানসিক চাপ কমান এবং স্বাস্থ্যকর খাবার খান।
রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখা
ডায়াবেটিস স্মৃতিভ্রংশ বা ডিমেনশিয়ার একটি অন্যতম প্রধান ঝুঁকিপূর্ণ কারণ। সঠিক খাদ্যাভ্যাস মেনে চলা, নিয়মিত ব্যায়াম করা এবং অতিরিক্ত ওজন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আপনি ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করতে পারেন। তবে আপনার রক্তের সুগার যদি উচ্চমাত্রায় থাকে, তবে তা ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবনের প্রয়োজন হবে।
কোলেস্টেরলের মাত্রা উন্নত করা
রক্তে এলডিএল বা ‘খারাপ’ কোলেস্টেরলের উচ্চমাত্রা স্মৃতিভ্রংশের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়াম, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং ধূমপান বা তামাক এড়িয়ে চলার মাধ্যমে সহজেই কোলেস্টেরলের মাত্রা উন্নত করতে পারেন। তবে এতেও যদি কাজ না হয়, তবে ওষুধ গ্রহণের বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
ধূমপান এড়িয়ে চলা
যেকোনো ধরনের বা যেকোনো উপায়ে তামাকের ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে চলা উচিৎ।
নিজের আবেগের যত্ন নেওয়া
যারা অতিরিক্ত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, বিষণ্ণতায় আক্রান্ত, ঘুমহীনতায় ভোগেন কিংবা মানসিকভাবে পরিশ্রান্ত, তারা সাধারণত বুদ্ধিমত্তা ও মানসিক দক্ষতা বিষয়ক পরীক্ষাগুলোতে কম নম্বর পেয়ে থাকেন। এই কম নম্বর পাওয়া মানেই যে ভবিষ্যতে মানসিক ক্ষমতা কমে যাবে তা নয়, তবে স্থির মানসিক স্বাস্থ্য ও পর্যাপ্ত প্রশান্তিদায়ক ঘুম নিশ্চিত করা অবশ্যই মস্তিষ্কের সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
মাথাকে আঘাত থেকে সুরক্ষিত রাখা
মাথায় মাঝারি থেকে তীব্র ধরনের আঘাত লাগলে (এমনকি তা তাৎক্ষণিকভাবে কনকাশন হিসেবে নির্ণয় না হলেও) পরবর্তীতে মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্ষমতা হ্রাসের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
সামাজিক যোগাযোগ বৃদ্ধি করা
দৃঢ় সামাজিক সম্পর্ক বা বন্ধন ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং আয়ু বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তথ্যসূত্র: হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের ওয়েবসাইট