সামির শাকিরকে মনে আছে?
এই প্রজন্মের কাছে নামটা অচেনাই ঠেকার কথা। ইরাকের সাবেক ফুটবল তারকা। ১৯৮৭ মৌসুমে তিনি আবাহনীতে খেলতে এসেছিলেন। সেবার আবাহনীকে লিগ জেতাতে পারেননি সামির। কিন্তু বাংলাদেশের মাটিতে খেলে যাওয়া অন্যতম সেরা বিদেশি ফুটবলার হিসেবে ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। এরপর তিনি আবাহনী, মোহামেডানের কোচ হয়েছিলেন। বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলেরও কোচ হয়েছিলেন। জাতীয় দলের কোচ হিসেবে বাংলাদেশকে প্রথমবারের মতো জিতিয়েছিলেন সাফ গেমস (এখন এসএ গেমস) ফুটবলের সোনার পদক। সামির শাকিরের বড় পরিচয় তিনি ইরাকের হয়ে খেলেছিলেন ১৯৮৬ মেক্সিকো বিশ্বকাপ।
হঠাৎ করেই সামির শাকিরের কথা কেন আসছে? কাল রাতে ৪০ বছর পর বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছে ইরাক। ১৯৮৬ সালে সামির শাকিরের ইরাক খেলেছিল প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে। চার দশক পর ইরাক দ্বিতীয়বারের মতো খেলতে যাচ্ছে বিশ্বকাপে। বাংলাদেশের মানুষের সামির শাকিরের কথা তো মনে পড়বেই।
১৯৮৬ মেক্সিকো বিশ্বকাপে ইরাক দলের সঙ্গে সামির শাকির (বাম দিক থেকে চতুর্থ)। ছবি: সংগৃহীত১৯৮৭ মৌসুমে আবাহনীতে সামির শাকিরের সঙ্গে খেলতে এসেছিলেন আরেক ফুটবলার—করিম মোহাম্মদ আলভী। দুর্দান্ত গোলস্কোরার ছিলেন এই করিম মোহাম্মদ। লিগে ১৩ গোল করেছিলেন করিম মোহাম্মদ। সামির শাকিরের সঙ্গে করিম মোহাম্মদের অন্তর্ভুক্তিতে আবাহনী হয়ে উঠেছিল দুর্দান্ত শক্তি। তবে আবাহনীর দুর্ভাগ্য, লিগের শেষ ম্যাচে মোহামেডানের বিপক্ষে খেলতে নামার আগে ২ পয়েন্ট এগিয়ে থাকা সত্ত্বেও মোহামেডানের বিপক্ষে হেরে শেষ পর্যন্ত আর চ্যাম্পিয়ন হওয়া হয়নি তাদের। ইরাকিদের নিয়ে গড়া আবাহনীর বিপক্ষে মোহামেডান খেলিয়েছিল ইরানি ফুটবলারদের। ঢাকার ফুটবলে ইরাকি ও ইরানি ফুটবলারদের দ্বৈরথ সে সময় ছিল ভীষণ আলোচিত। সবচেয়ে বড় কথা, যে সময় আবাহনী ও মোহামেডানে ইরাকি ও ইরানি ফুটবলাররা খেলেছিলেন, ওই সময় ইরাক–ইরান যুদ্ধ চলছিল পুরোদমে।
১৯৮৭ সালে করিম মোহাম্মদ আলভী যখন আবাহনীতে। ছবি: সংগৃহীত
কাল আন্তঃমহাদেশীয় প্লে অফে বলিভিয়াকে ২–১ গোলে হারিয়ে ৪০ বছর পর বিশ্বকাপের চূড়ান্তপর্ব নিশ্চিত করা ইরাককে এশীয় ফুটবলের অন্যতম বড় শক্তিই বলা হয়। কিন্তু সে তুলনায় তাদের অর্জন অনেক কম, বিশেষ করে প্রতিবেশী ইরান কিংবা সৌদি আরব বা জাপান, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোর তুলনায়। ইরাকের সর্বোচ্চ সাফল্য ২০০৭ সালে এশিয়ান কাপ জেতা। আশির দশকে ইরাক যোগ্যতর দল হিসেবেই বিশ্বকাপে সুযোগ করে নিয়েছিল। তবে যুদ্ধ–বিগ্রহ সব সময়ই দেশটির ফুটবলকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ছিয়াশির বিশ্বকাপের পর ১৯৯০ সালে ইতালি বিশ্বকাপেও চূড়ান্তপর্বে কোয়ালিফাই করার খুব কাছে পৌঁছে গিয়েছিল ইরাক। তবে কাতারের বিপক্ষে হেরে সেবার বিশ্বকাপ যাওয়া হয়নি। ১৯৯০ সালে উপসাগরীয় যুদ্ধ ইরাকি ফুটবলের ওপর কালো ছায়া ফেলে দেয়। কুয়েত দখল করে উপসাগরীয় যুদ্ধ শুরুর কারণে ইরাকি জাতীয় দলকে ১৯৯০ সালে বেইজিং এশিয়ান গেমসে খেলতে দেওয়া হয়নি। আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকেও নিষিদ্ধ করা হয় তাদের।
আশির দশক ছিল ইরাকি ফুটবলের ‘সোনালি সময়’। বিশ্বকাপে খেলা ছাড়াও এই সময় ৯টি শিরোপা জেতে তারা। এর মধ্যে ছিল ১৯৮৮ সালে অ্যারাবিয়ান গলফ কাপ ও আরব কাপের শিরোপা। ১৯৯৪ বিশ্বকাপেরও খুব কাছাকাছি গিয়েছিল ইরাক। বাছাইপর্বের দ্বিতীয় রাউন্ডে দুর্দান্ত খেলেও উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে ৩–২ গোলে হারটাই শেষ পর্যন্ত ইরাককে বিশ্বকাপে যেতে দেয়নি। মাত্র ২ পয়েন্টের ব্যবধানে বিশ্বকাপের চূড়ান্তপর্বে পৌছাঁতে পারেনি ইরাক। অথচ, উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটিতে ২–০ গোলে এগিয়ে গিয়েছিল ইরাকিরা।
১৯৮৭ লিগে মোহামেডান–আবাহনী ম্যাচে করিম মোহাম্মদ। তাকে বাধা দিচ্ছেন মোহামেডানের আহসানউল্লাহ মন্টু। ছবি: সংগৃহীত
কেমন ছিল ইরাকের ১৯৮৬ বিশ্বকাপ
গ্রুপ ‘বি’তে ইরাকের গ্রুপে ছিল স্বাগতিক মেক্সিকো, বেলজিয়াম ও প্যারাগুয়ে। খুব একটা খারাপ ছিল না ইরাকের পারফরম্যান্স। প্যারাগুয়ে ও মেক্সিকোর বিপক্ষে ১–০ গোলে হারে তারা। বেলজিয়ামের মতো দলেরও ইরাককে হারাতে কষ্ট করতে হয়েছিল। স্কোরলাইন ছিল ২–১। ইরাকের পক্ষে বিশ্বকাপে একমাত্র গোলটি তাদের কিংবদন্তি ফুটবলার আহমেদ রাদির।
নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপে একটি ঘটনা ইরাক ভুলেই যেতে চাইবে। বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যাচে রেফারির গায়ে থুতু দিয়ে লালকার্ড দেখেছিলেন বাংলাদেশের সাবেক কোচ সামির শাকির। তাঁকে সে সময় এক বছরের জন্য নিষিদ্ধ করে ফিফা। সামির শাকিরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার সেখানেই শেষ হয়ে গিয়েছিল।
যেভাবে আবাহনীতে এসেছিলেন ইরাকের দুই বিশ্বকাপ তারকা
১৯৮৭ সালে ঢাকায় এশিয়ান ক্লাব কাপ ফুটবলের বাছাইপর্ব অনুষ্ঠিত হয়েছিল। মহাদেশীয় ক্লাব প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের প্রতিনিধি ছিল মোহামেডান। তাদের গ্রুপ সঙ্গী ছিল ভারতের মোহনবাগান, পাকিস্তানের বিমান বাহিনী দল, নেপালের মানাং মার্সিয়ান্দী ও ইরাকের আল–রশীদ ক্লাব। আল–রশীদ ক্লাবে ছিল ইরাকের জাতীয় ফুটবল দলের বেশ কয়েকজন তারকা, যারা ছিয়াশির বিশ্বকাপে খেলেছিলেন। সামির শাকির ছিলেন আল–রশীদ ক্লাবের অধিনায়ক। শক্তিধর সেই দলটি মোহামেডানকে হারিয়েছিল ৫–১ গোলে। এর পরই লিগের জন্য সামির শাকির ও করিম মোহাম্মদ আলভীকে দলভুক্ত করে আবাহনী। সে সময় সামির শাকির আর করিম মোহাম্মদের দলভুক্তি হইচই ফেলে দিয়েছিল দেশের ফুটবলে। যদিও সে মৌসুমেই মোহামেডানে একই সঙ্গে কোচ ও খেলোয়াড় হিসেবে খেলেছিলেন ইরানের হয়ে ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে খেলা গোলরক্ষক নাসের হেজাজি।
চল্লিশ বছর বাদে ইরাকের বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করার এই সময়ে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের একটা প্রজন্মের খুব করেই মনে পড়বে ঢাকার মাঠে খেলে যাওয়া দুই ইরাকি বিশ্বকাপ তারকার কথা।