Advertisement Banner

আবারও বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা হারাল ইতালি, বারবার কেন এই পতন?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
আবারও বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা হারাল ইতালি, বারবার কেন এই পতন?
টানা তিনবার বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা হারাল ইতালি। ছবি: রয়টার্স

বিশ্বকাপ ফুটবলে ইতালিকে নিয়ে শেষ স্মৃতি কোনটি? এই প্রশ্ন করা হলে নিঃসন্দেহে বলা যায়, সেই ২০০৬ বিশ্বকাপের ফাইনালের কথা। আরও বিশেষ করে বললে, ফ্রান্স কিংবদন্তি জিনেদিন জিদানের সেই বিখ্যাত লাল কার্ড এবং ইতালির বিশ্বকাপ জয়। কিন্তু কেন সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এই দলকে নিয়ে আলোচনা শুরু হলে ফিরে যেতে হয় ২০ বছর আগে?

টানা তিনটি বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থতা ছাড়াও এখানে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী একটি দেশের ক্রমশ বিশ্ব ফুটবলে পিছিয়ে পড়ার এক হতাশাজনক চিত্র।

গত দুই বিশ্বকাপের মতো ২০২৬ বিশ্বকাপেও খেলার যোগ্যতা অর্জনের জন্য ইতালিকে শেষ পর্যন্ত খেলতে হয়েছে প্লে-অফে। অবশ্য এবারের প্লে-অফ ম্যাচে আজ্জুরিরা প্রতিপক্ষ হিসেবে পেয়েছিল বসনিয়া-হার্জেগোভিনাকে, যারা নিজেদের ইতিহাসে এর আগে বিশ্বকাপ খেলতে পেরেছে কেবল একবার। সেই কারণেই হয়তো প্লে-অফে দলটিকে পেয়ে ইতালির খেলোয়াড়রা অগ্রিম উল্লাস করেছিলেন। তবে তারা হয়তো ভুলে গিয়েছিলেন, ইতিহাস দিয়ে ফুটবল চলে না। ফলাফলটাও তাই পেয়েছেন হাতেনাতে।

মঙ্গলবার দিবাগত রাতে টাইব্রেকারে ইতালিকে হারিয়ে বিশ্বকাপের টিকিট পেয়েছে বসনিয়া-হার্জেগোভিনা। ম্যাচের অর্ধেকের বেশি সময় ধরে ১০ জন নিয়ে খেলা ইতালি স্পট কিকে মাত্র একবার লক্ষ্যভেদ করতে সমর্থ হয়। আর এটাই বলে দেয়, চাপের মুখে আরও একবার ভেঙে পড়েছে দলটি।

ইতালির অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ড

আবারও বিশ্বকাপ মিশনে ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে বিরল এক রেকর্ড গড়েছে ইতালি। ইতিহাসের প্রথম সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দেশ হিসেবে তারা টানা তিনবার বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থ হলো।

আরও একবার ইতালির বিশ্বকাপ খেলতে ব্যর্থ হওয়াটা দেশটির ফুটবলের জন্য বড় এক ধাক্কাই। দলটির উইঙ্গার লিওনার্দো স্পিনাজোলার কণ্ঠে তাই মিশে ছিল আর্তনাদের প্রতিধ্বনি, “ইতালিকে ছাড়া আমাদের দেশের শিশুরা আরেকটি বিশ্বকাপ দেখবে, এটা বিশ্বাস করাও কঠিন।”

আবারও বিশ্বকাপে যেতে ব্যর্থ ইতালি। ছবি: রয়টার্স
আবারও বিশ্বকাপে যেতে ব্যর্থ ইতালি। ছবি: রয়টার্স

২০ বছর ধরে চলা ধারাবাহিক ব্যর্থতা

স্পিনাজোলা যা বলেছেন, সেটা কেবল তার দেশেই নয়, বরং গোটা ফুটবল বিশ্বের জন্যই এক অবিশ্বাস্য ঘটনা বৈকি। চারবার বিশ্বকাপ জেতা একটি দল যখন টানা তিনবার বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতেই হিমশিম খায়, তখন সেটা বিস্ময়েরই জন্ম দেয়। এর সঙ্গে যদি যোগ হয় ২০১০ এবং ২০১৪ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায়ের চিত্র, তাহলে ফুটে উঠবে ইতালিয়ান ফুটবলের প্রায় দুই যুগ ধরে চলা দুর্দিনের গল্প।

বিশ্বকাপ ফুটবলে পাঁচ আসর ধরে ইতালির ব্যর্থতার কারণেই তাদের ইউরো ২০২০ জয়কে অনেকেই দেখেন বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে। কারণ, এর আগে এবং পরে দেশটির ফুটবল হেঁটেছে এক অনিশ্চয়তার পথ ধরেই।

কাঠামোগত সংকট

সমৃদ্ধ এক ফুটবল ইতিহাসের দেশ ইতালির ফুটবল কাঠামো বরাবরই ছিল বেশ শক্তিশালী। নব্বই দশকে ইতালির অনূর্ধ্ব-২১ দল তিনবার ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন হয়। আর সেটাই গড়ে দিয়েছিল ২০০৬ বিশ্বকাপের সাফল্যের ভিত্তি। তবে নব্বই দশকের শেষের দিক থেকে ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের বদলে যাওয়া চিত্র প্রভাব ফেলতে শুরু করে ইতালির ফুটবলে। একসময় বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা লিগ সেরি আ-তে ক্রমেই বাড়তে থাকে বিদেশি খেলোয়াড়ের সংখ্যা। ফলে কমে আসতে থাকে স্থানীয় তরুণদের সুযোগ। সময়ের পরিক্রমায় এই বিষয়টি ডেকে এনেছে সংকট, যেখান থেকে উত্তরণ খুব একটা সহজ হবে না।

ক্লাব ফুটবলের পড়তি মান

গত কয়েক বছরে ইতালিয়ান ক্লাবগুলো চ্যাম্পিয়ন্স লিগসহ ইউরোপীয় টুর্নামেন্টগুলোতে বেশ ভালো করেছে। তবে সামগ্রিকভাবে দেশটির ঘরোয়া ফুটবল সেভাবে উন্নতির ছাপ রাখতে পারছে না। সময়ের সেরা তারকা খেলোয়ারদের কেউই এখন সেরি আ-এর ক্লাবগুলোতে খেলতে রাজি হন না। হাতেগোনা যে কজন ছিলেন, তারাও গত কয়েক বছরে ঠিকানা বদল করেছেন। অন্যদিকে ইতালির স্থানীয় প্রতিভাবান খেলোয়াড় যারা আছেন, তারা সুযোগ পেলেই যোগ দিচ্ছেন ইংল্যান্ড, স্পেন, ফ্রান্স বা জার্মানির ক্লাবগুলোতে। ফলে পাওলো মালদিনি, আলেসান্দ্রো দেল পিয়েরো, ফ্রান্সেসকো টট্টি, ফাবিও কানাভ্যারা, জেন্নারো গাত্তুসো, জিয়ানলুইজি বুফনের মতো ফুটবলার উঠে আসছে না ইতালি থেকে।

হারের পর ইতালির খেলোয়াড়দের মধ্যে ব্যর্থতার ছাপ। ছবি: রয়টার্স
হারের পর ইতালির খেলোয়াড়দের মধ্যে ব্যর্থতার ছাপ। ছবি: রয়টার্স

বিশ্বমানের ডিফেন্ডার সংকট

যুগ যুগ ধরে ইতালিয়ান ফুটবলের সুখ্যাতি ছিল তাদের ডিফেন্সের জন্য। দেশটি থেকে উঠে এসেছেন কিংবদন্তি সব ডিফেন্ডার। আর এটাই ছিল তাদের শক্তির মূল জায়গা। এমনকি ২০০৬ বিশ্বকাপ জয়েও বড় অবদান ছিল তাদের রক্ষণভাগের। তবে গত বিশ বছরে ধস নেমেছে এই শিল্পে। অন্যদিকে আক্রমণভাগেও নেই বলার মতো তারকা ফুটবলার। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে।

আর্থিক সমস্যা ও অবকাঠামোগত দুর্বলতা

জনপ্রিয়তার মানদন্ডে পিছিয়ে পড়া ইতালির সেরা ক্লাবগুলো আয়ের দিক থেকে বর্তমানে শীর্ষ দশের মধ্যেও নেই। এর সঙ্গে রয়েছে আধুনিক সুযোগ-সুবিধার স্টেডিয়ামের অভাব এবং বাণিজ্যিক সীমাবদ্ধতা, যা তাদের বেশ পিছিয়ে দিয়েছে। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ বা স্পেনের ক্লাবগুলো, যেখানে বিপুল টিভি চুক্তি ও বিনিয়োগ পাচ্ছে। সেখানে একই সময়ে ইতালিয়ান ক্লাবগুলো রীতিমত আর্থিক সংকটে ভুগছে।

সব মিলিয়ে তাই বলা যায়, বসনিয়া-হার্জেগোভিনার কাছে ইতালির এই হার দেশটির ফুটবলের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যা, পরিকল্পনার ঘাটতি এবং আর্থিক সমস্যার প্রতিফলন। ফলে একসময়ের বিশ্বসেরা দলটি এখন নিজেদের পরিচয় নিয়ে পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এই কঠিন পরিস্থিতি থেকে ইতালির ফুটবলকে আবার শীর্ষে ফিরতে হলে এখনই বাস্তবিক সমাধানের দিকে হাঁটতে হবে। নাহলে তাদের এই এই পতন আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

সম্পর্কিত