Advertisement Banner

ইরান-আমেরিকা: ৭৩ বছর ধরে চলছে সংঘাত

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ইরান-আমেরিকা: ৭৩ বছর ধরে চলছে সংঘাত
ছবি: এআই দিয়ে বানানো

ইরান-আমেরিকার গত কিছুদিনের উত্তেজনা আতঙ্ক বাড়াচ্ছে বিশ্বজুড়ে। বিশেষজ্ঞদের অনেকেই এতে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা করছেন। আর এরই মধ্যে আজ শনিবার আমেরিকার মদদে তেহরানে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। গত কয়েকদিনে ট্রাম্প ও খামেনির বিভিন্ন ভাষণে অবশ্য এর ইঙ্গিত পাওয়াই যাচ্ছিল।

মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার ক্রমবর্ধমান সামরিক তৎপরতা এবং উন্নত যুদ্ধবিমান মোতায়েন নিশ্চিতভাবেই আমেরিকার এই দুরভিসন্ধির জানান দিচ্ছিল। গতবছর জুনেও ইরানের পরমাণু স্থাপনায় হামলা চালায় আমেরিকা। তবে এটাই ইরান আমেরিকা সংঘাতের সূত্রপাত নয়। এর এক দীর্ঘ ইতিহাসও রয়েছে। এখানে সংক্ষেপে তা তুলে ধরা হলো-

১৯৫৩: মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ইরানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করতে অভ্যুত্থান ঘটায় এবং শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে পুনরায় ক্ষমতায় বসায়।

১৯৫৭: আমেরিকা ও ইরান বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তিতে স্বাক্ষর করে।

১৯৬৭: আমেরিকা ইরানকে একটি পারমাণবিক চুল্লির পাশাপাশি অস্ত্র তৈরির উপযোগী ৯৩ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জ্বালানি সরবরাহ করে।

১৯৬৮: ইরান পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ চুক্তিতে (এনপিটি) স্বাক্ষর করে। এর মাধ্যমে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার অঙ্গীকারের বিনিময়ে বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি পরিচালনার অনুমতি পায় দেশটি।

১৯৭৯: ইরানে ইসলামি বিপ্লবের ফলে মার্কিন মদদপুষ্ট শাহরা দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। নির্বাসন থেকে ফিরে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খামেনি দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা হন। কট্টরপন্থী ছাত্ররা তেহরানে মার্কিন দূতাবাস ঘেরাও করে সেখানকার কর্মকর্তাদেরকে জিম্মি করে।

১৯৮০: আমেরিকা ইরানের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে, ইরানি সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে এবং বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। জিম্মিদের উদ্ধারে প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের পাঠানো সামরিক মিশন ব্যর্থ হয়।

১৯৮১: কার্টারের মেয়াদ শেষ হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যে এবং রোনাল্ড রিগ্যান প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার পরপরই ইরান ৫২ জন মার্কিন জিম্মিকে মুক্তি দেয়।

১৯৮৪: আমেরিকা ইরানকে সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।

১৯৮৬: রিগ্যান তেহরানের সাথে একটি গোপন অস্ত্র চুক্তির কথা প্রকাশ করেন, যা মার্কিন অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার লঙ্ঘন ছিল।

১৯৮৮: উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ভিনসেনস একটি ইরানি যাত্রীবাহী বিমান ভূপাতিত করে, যাতে ২৯০ জন আরোহীর সবাই নিহত হন।

২০০২: প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরান, ইরাক ও উত্তর কোরিয়াকে শয়তানের অক্ষশক্তি (এক্সিস অব ইভিল) হিসেবে ঘোষণা করেন। মার্কিন কর্মকর্তারা তেহরানের বিরুদ্ধে গোপন পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির অভিযোগ আনেন।

ফাইল ছবি
ফাইল ছবি

২০০৯: ব্রিটেন, ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা করে যে, ইরান ফোরডোতে একটি গোপন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র তৈরি করছে।

২০১২: প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বিদেশি ব্যাংকগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞার ক্ষমতা পান। শর্ত দেওয়া হয়, যদি তারা ইরান থেকে তেল আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে না কমায়, তাহলে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হবে। ফলে ইরানের অর্থনীতিতে ধস নামে। একই বছর পারমাণবিক ইস্যুতে দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে গোপন আলোচনা শুরু হয়।

২০১৩: হাসান রুহানি বিশ্বের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন ও অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

২০১৫: ইরান ও ছয়টি পরাশক্তি একটি পারমাণবিক চুক্তিতে পৌঁছায়। চুক্তিতে নিষেধাজ্ঞার বিনিময়ে পারমাণবিক কার্যক্রম সীমিত করতে রাজি হয় তেহরান।

২০১৮: প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ান এবং ইরানের ওপর পুনরায় কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।

২০১৯: এপ্রিলে আমেরিকা ইরানের ‘ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর’কে (আইআরজিসি) সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে। পাল্টা জবাবে ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করা হয়, যদিও তেহরান তা অস্বীকার করে।

২০২০: বাগদাদে মার্কিন বিমান হামলায় কুদস ফোর্সের কমান্ডার কাসেম সোলেইমানি নিহত হন। ইরান এই হত্যাকাণ্ডের কঠোর প্রতিশোধ নেওয়ার শপথ নেয়।

২০২১: ভিয়েনায় মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের মধ্যে পরোক্ষ পারমাণবিক আলোচনা শুরু হয়। ইরানের কট্টরপন্থী প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির নির্বাচনের পর পাঁচ মাসের বিরতি দিয়ে ২৯ নভেম্বর পুনরায় আলোচনা শুরু হয়।

২০২২: সেপ্টেম্বরে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা থমকে যায়। তবে উভয় পক্ষ জিম্মিদের মুক্তি ও বিদেশে আটকে থাকা ইরানি সম্পদ ছাড় দেওয়ার ব্যাপারে একটি রূপরেখা তৈরি করে।

২০২৩: আগস্টে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র বন্দি বিনিময় এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় আটকে থাকা ইরানের ৬ বিলিয়ন ডলার অর্থ ছাড়ের বিষয়ে সম্মত হয়।

২০২৫: ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথে বৈঠকের আগে ট্রাম্প পুনরায় ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর নীতি গ্রহণের স্মারকলিপিতে স্বাক্ষর করেন। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ট্রাম্পের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। ২১ জুন ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান যে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।

২০২৬: ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে বড় ধরণের হামলা চালায়। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্য পুনরায় এক সামরিক সংঘাতের মুখে পড়ে এবং তেহরানের পারমাণবিক সংকট নিরসনে কূটনৈতিক সমাধানের আশা আরও ক্ষীণ হয়ে যায়।

সম্পর্কিত