মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত প্রশমনের লক্ষ্যে সোমবার ইরানের রাজধানী তেহরানে দেশটির কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের শীর্ষ কর্মকর্তারা। একই সময়ে ইয়েমেনের হুতিরা সৌদি আরবে নতুন করে হামলা চালিয়েছে এবং উপসাগরীয় দেশটির প্রতিরক্ষায় সহায়তা দেওয়ার অনুমোদন দিয়েছে মিশর।
গত আগস্টে মক্কায় পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করা তিন দেশের সঙ্গে এটি ছিল ইরানের প্রথম উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া যুদ্ধ পরে সৌদি আরব ও ইয়েমেনেও ছড়িয়ে পড়ে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
বৈঠকে সৌদি আরব জানিয়েছে, সামরিক উত্তেজনা যেন আবার ফিরে না আসে, সে লক্ষ্যে আলোচনার পথ উন্মুক্ত করাই এই সফরের উদ্দেশ্য।
সৌদি ও ইরানি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের প্রতিনিধিদলে ছিলেন যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ছোট ভাই প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান। পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করেন দেশটির সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং তুরস্কের প্রতিনিধিত্ব করেন গোয়েন্দাপ্রধান ইব্রাহিম কালিন।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজাইকে বৈঠকে অংশ নিতে দেখা গেছে। বৈঠক শেষে চার দেশ শান্তি ও নিরাপত্তায় সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যে আলোচনা অব্যাহত রাখতে সম্মত হয়েছে বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতাকারীর নেতৃত্বে ছিল পাকিস্তান ও কাতার।
ইরানের তেহরানে দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠককালে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান, পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং তুরস্কের গোয়েন্দাপ্রধান ইব্রাহিম কালিন। ২৬ অক্টোবর ২০২৬। ছবি: রয়টার্স
এর আগে তাদের প্রচেষ্টায় জুনে একটি অন্তর্বর্তী শান্তিচুক্তি হয়েছিল। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আবার লড়াই শুরু হয়। এরপর ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হুতিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র সৌদি আরবের সংঘাত নতুন করে তীব্র হয়ে ওঠে, যা যুদ্ধের আরেকটি ফ্রন্ট খুলে দেয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের নতুন হামলার হুমকি
বিস্তৃত এই সংঘাতের কারণে জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে। বেড়েছে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম। উপসাগরীয় দেশগুলো ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়েছে। পাশাপাশি ইয়েমেনে নতুন করে মানবিক সংকট দেখা দিয়েছে।
সম্প্রতি ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। গত শুক্রবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আবারও ইরানে হামলা চালাতে পারে।
অন্যদিকে, ইরানের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আবার হামলা চালালে উপসাগরীয় অঞ্চলের সমুদ্রতলের যোগাযোগ কেবলগুলোতে আঘাত হানার বিস্তারিত পরিকল্পনা তৈরি করেছে তেহরান।
বছরের শুরুর দিকে এই যুদ্ধের জেরে ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর মধ্যেও লড়াই নতুন করে শুরু হয়েছিল। যুদ্ধের প্রভাব ট্রাম্পের জনসমর্থন কমিয়েছে। এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণী মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে আসছে।
ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান রেজাই বলেছেন, তিন দেশের এই সফর প্রমাণ করেছে, “বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির প্রভাব খুবই সামান্য।” তিনি অঞ্চলটিতে “নতুন ও ইতিবাচক পরিবেশ” তৈরির কথাও বলেন।
এর আগে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছিলেন, গত সপ্তাহে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান মুনিরের তেহরান সফরের সময় প্রস্তাব করা এই বৈঠক আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে।
পাকিস্তানের একজন জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেছেন, আঞ্চলিক পর্যায়ে একটি অনাক্রমণ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার ওপর বৈঠকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আলোচ্যসূচিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনা, সৌদি আরবে হুতিদের হামলা, হরমুজ প্রণালি এবং ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের বিষয়ও ছিল।
পাকিস্তানের আরেক কর্মকর্তা জানান, কূটনৈতিক উদ্যোগ চালানোর বিষয়ে ট্রাম্পের সম্মতি পাওয়ার পর আসিম মুনির ইরানের কাছে সংঘাত নিরসনের একটি প্রস্তাব তুলে ধরেছেন। প্রস্তাবটির বিস্তারিত প্রকাশ না করলেও তিনি বলেন, এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—উভয় পক্ষের জন্যই কিছু সুবিধা থাকবে।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, প্রস্তাবটি গৃহীত হলে মক্কা চুক্তিভুক্ত দেশগুলো এবং কাতার এর নিশ্চয়তাদাতা হিসেবে কাজ করতে পারে।
এর আগে ইরানের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, সোমবারের বৈঠকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হবে না। যুদ্ধ বন্ধে তেহরানের দাবিগুলো পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়টি আলোচনায় আসবে না। ম
ইরানের শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে দেশটির বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহার এবং ইরানি তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, যুদ্ধ বন্ধ করতে হলে ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা কমাতে হবে।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর গণমাধ্যম শাখা এবং তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
সৌদি আরবকে প্রতিরক্ষা সহায়তায় মিশরের পার্লামেন্টের অনুমোদন
গত মাসে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের কৌশলগত এলাকাগুলো দখল করার পর থেকে হুতিদের বিরুদ্ধে হামলা জোরদার করেছে সৌদি আরব। ওই এলাকাগুলো দখলের মাধ্যমে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে অগ্রসর হয়েছে হুতিরা। জবাবে তারা সৌদি আরবের বিমানবন্দর, বন্দর ও তেল স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।
সোমবার হুতিরা জানায়, সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনের পাম্পিং স্টেশনগুলো এবং রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে তারা। এর এক দিন আগে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, দুটি টার্মিনালে কার্যক্রম আবার শুরু হয়েছে। তবে হুতিদের হামলার বিষয়ে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
ইরানের তেহরানে দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠককালে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান, পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং তুরস্কের গোয়েন্দাপ্রধান ইব্রাহিম কালিন। ছবি: রয়টার্স
এদিকে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে বলে জানানো মিশরের পার্লামেন্ট সোমবার সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় দেশটির সামরিক বাহিনীকে সহায়তা দেওয়ার অনুমোদন দিয়েছে। সৌদি আরব কায়রোর গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ও রাজনৈতিক অংশীদার।
রয়টার্সের দেখা চুক্তির নথি অনুযায়ী, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো একে অপরের আঞ্চলিক অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব বা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমান্তের জন্য হুমকি দূর করতে “সব প্রয়োজনীয় উপায়” ব্যবহারে সম্মত হয়েছে।
চুক্তির সদস্যদেশগুলো চলতি মাসে রিয়াদে জরুরি বৈঠক করেছে। সেখানে সৌদি আরবে সামরিক বাহিনী ও সামরিক সক্ষমতা “দ্রুত মোতায়েন” নিশ্চিত করার বিষয়ে তারা একমত হয়।
চুক্তিটি অনুমোদনের জন্য তুরস্কের পার্লামেন্টে গত সপ্তাহে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যা এখনো চলমান। অন্যদিকে, পাকিস্তান গত সপ্তাহে চুক্তিটি অনুমোদন করেছে।