ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য এক কঠিন বাস্তবতা তৈরি করেছে। সামরিক শক্তি বৃদ্ধি, কূটনৈতিক তৎপরতা কিংবা হরমুজ প্রণালির বিকল্প জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা—কোনো উদ্যোগই এখন পর্যন্ত তাদের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। বরং যুদ্ধের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, এককভাবে কোনো দেশের পক্ষে এই সংকট মোকাবিলা করা কঠিন। ফলে দীর্ঘদিনের পারস্পরিক বিরোধ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা পাশে সরিয়ে ছয়টি উপসাগরীয় দেশের মধ্যে ঐক্য ও সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে এসেছে।
কার্নেগি এনডাউমেন্টের প্রকাশনা এমিসারিতে প্রকাশিত স্যাম ওরবি ও অ্যান্ড্রু লেবারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও ওমানকে নিয়ে গঠিত উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ বা জিসিসি গত কয়েক মাসে সংঘাত মোকাবিলায় নানা কৌশল নিয়েছে। কিন্তু কোনো কৌশলই প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। লেখকদের মতে, এই ব্যর্থতাই এখন দেশগুলোর মধ্যে বৃহত্তর সহযোগিতার সম্ভাবনা তৈরি করছে।
গত ৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির পর জিসিসি দেশগুলো জ্বালানি ও নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রে বড় কোনো যৌথ উদ্যোগ নিতে পারেনি। হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমাতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত নিজেদের তেল পরিবহন পাইপলাইন সম্প্রসারণে মনোযোগ দিয়েছে। সৌদি আরামকো জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরের ব্যবস্থা চালু করেছে। একই ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করেছে আমিরাতের আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি। কাতারও সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস স্থানান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে। অর্থাৎ, দেশগুলো সমস্যার সমাধান খুঁজছে ঠিকই, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা হচ্ছে নিজস্ব উদ্যোগে, সম্মিলিত পরিকল্পনায় নয়।
নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। জিসিসি নেতারা যৌথ ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। সামরিক কর্মকর্তা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক এবং জুলাই মাসের যৌথ মহড়াও হয়েছে। কিন্তু ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষার নতুন প্রযুক্তি সংগ্রহের ক্ষেত্রে দেশগুলো যুক্তরাজ্য, ইউক্রেন ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে পৃথকভাবে চুক্তি করেছে। কোনো সদস্য রাষ্ট্র আক্রান্ত হলে অন্য দেশগুলোর প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সম্মিলিতভাবে ব্যবহারের কার্যকর ব্যবস্থাও গড়ে ওঠেনি। সৌদি আরব হুতিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সহায়তা চেয়েছে। পাশাপাশি ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের কাছ থেকেও প্রতিরক্ষা সহায়তা পেয়েছে।
এই বিভক্তির পেছনে দেশগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ। যেসব দেশের লোহিত সাগর বা আরব সাগরে সরাসরি প্রবেশাধিকার নেই, তাদের তেল ও গ্যাস রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বিশেষ করে কাতার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল রপ্তানি অব্যাহত থাকায় দেশটির আয় তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান আগের বছরের তুলনায় বেশি আয় করেছে। ফলে যুদ্ধের ক্ষতি সব দেশের জন্য সমান হয়নি। এই বৈষম্যও যৌথ অবস্থান তৈরির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে জিসিসির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিভাজন তৈরি করেছে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভিন্ন কৌশল। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আমিরাত ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। এর বিনিময়ে ইসরায়েলের কাছ থেকে আকাশ প্রতিরক্ষায় সহায়তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে উন্নত প্রযুক্তির মাইক্রোচিপ পাওয়ার সুযোগ পেয়েছে। অন্যদিকে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে সীমিত সমর্থন দিয়েছে এবং একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। সৌদি আরবের এই অবস্থান ইরানের হামলার ভয়াবহতা থেকে দেশটিকে কিছুটা রক্ষা করেছিল বলে লেখকেরা মনে করেন। পাশাপাশি তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে মক্কা চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে উপসাগরের বাইরেও কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করেছে রিয়াদ।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে দুই দেশের কৌশলই চাপের মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধকৌশলে স্পষ্ট লক্ষ্য ও সমাপ্তির পথ না থাকায় সংযুক্ত আরব আমিরাতও ইরানের সঙ্গে নীরবে কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনরায় শুরু করেছে। অন্যদিকে সৌদি আরবের কূটনৈতিক ভারসাম্যের নীতি হুতিদের নতুন করে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার কারণে সংকটে পড়েছে। ইয়েমেনে সৌদি বিমান হামলা ইরানকে দক্ষিণ সীমান্তে নতুন সংঘাত শুরু করা থেকে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হলেও পরিস্থিতি উল্টো দিকে গেছে। হুতিদের সঙ্গে লড়াই সৌদি আরবের অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকেও বাধাগ্রস্ত করছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরার জন্য আয়োজিত গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান বাতিল বা পিছিয়ে দিতে হয়েছে।
এই পরিস্থিতি সৌদি আরব ও আমিরাতকে আবার কাছাকাছি আসার প্রয়োজনীয়তা বুঝিয়েছে। অতীতে ইয়েমেনের বিভিন্ন পক্ষকে সমর্থন করা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছিল। এখন তারা প্রকাশ্যে ভ্রাতৃপ্রতিম সম্পর্কের ওপর জোর দিচ্ছে। ইয়েমেনে হুতিদের মোকাবিলায় আমিরাতের বিনিয়োগ ও সহযোগিতা বাড়লে সৌদি-আমিরাত সম্পর্কের উন্নতি হতে পারে। বিনিময়ে দক্ষিণ ইয়েমেনের স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে সৌদি আরব নমনীয় হতে পারে, যা আমিরাতের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এই সম্ভাব্য সমঝোতা শুধু ইয়েমেনের সংঘাতেই প্রভাব ফেলবে না, বরং পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষায় একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহের ওপর উপসাগরীয় দেশগুলোর ব্যাপক নির্ভরতা রয়েছে। কিন্তু বিশ্বব্যাপী সরবরাহের সীমাবদ্ধতা এবং ইরান ও হুতিদের হুমকির কারণে শুধু অস্ত্র কেনার ওপর নির্ভর করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বরং যৌথ অর্থায়নে আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
একইভাবে জ্বালানি পরিবহনের বিকল্প পথ তৈরিতেও সম্মিলিত উদ্যোগের সুযোগ রয়েছে। সৌদি আরব ও আমিরাতের সম্প্রসারিত পাইপলাইন অন্য দেশগুলোও ব্যবহার করতে পারে। কুয়েত ইতিমধ্যে সৌদি ও আমিরাতের পাইপলাইন ব্যবহারের আগ্রহ দেখিয়েছে। প্রয়োজনে অন্য দেশগুলো এসব অবকাঠামো নির্মাণে অর্থায়ন করতে পারে অথবা সংকটের সময় ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত ফি দিতে পারে। এতে হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমবে এবং কোনো একটি দেশের ওপর চাপ তৈরি হলে অন্য দেশগুলোও বিকল্প পরিবহন সুবিধা পাবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উপসাগরীয় দেশগুলোর ঐক্য এখন শুধু অর্থনৈতিক বা সামরিক স্বার্থের প্রশ্ন নয়; ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার জন্যও এটি জরুরি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—সংঘাতের প্রধান দুই পক্ষই সামরিক শক্তি দিয়ে পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান করতে পারছে না, আবার কূটনৈতিক সমাধানেও কার্যকর অগ্রগতি নেই। এমন অবস্থায় জিসিসির ছয় সদস্যের সম্মিলিত কূটনৈতিক অবস্থান ইরানের সঙ্গে আলোচনার নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
ফলে, উপসাগরীয় দেশগুলো এত দিন নিজেদের স্বার্থে পৃথক কৌশল অনুসরণ করলেও যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তাদের সেই অবস্থানের সীমাবদ্ধতা দেখিয়ে দিয়েছে। সৌদি আরব ও আমিরাতের প্রতিদ্বন্দ্বিতা কমানো, যৌথ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তোলা এবং জ্বালানি পরিবহনে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। কারণ, এই সংঘাতের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত মূল্য ক্রমেই বাড়ছে। উপসাগরীয় দেশগুলো যদি নিজেদের বিভক্তি কাটিয়ে উঠতে না পারে, তাহলে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি তাদেরই বহন করতে হবে। আর ঐক্যবদ্ধ হতে পারলে ইরানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে তাদের সম্মিলিত প্রভাব অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে।