Advertisement Banner

ভেনেজুয়েলায় আক্রমণ আমেরিকার, রাশিয়া কী করবে?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ভেনেজুয়েলায় আক্রমণ আমেরিকার, রাশিয়া কী করবে?
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ভেনেজুয়েলায় আক্রমণ করেছে আমেরিকা। তুলে নিয়ে গেছে দেশটির প্রেসিডেন্টকে। এই অবস্থায় আসছে রাশিয়ার প্রসঙ্গ। প্রশ্ন উঠছে, রাশিয়া কি ভেনেজুয়েলায় হস্তক্ষেপ করবে?

রুশ সংবাদমাধ্যম আরটি ইন্টারন্যাশনাল এক প্রতিবেদনে বলেছে, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় দীর্ঘসময় চাপের মুখে থাকা রাশিয়া ও ভেনেজুয়েলা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জ্বালানি, প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদার করেছে। রাশিয়া ও ভেনেজুয়েলার সম্পর্ক যেমন গভীর, তেমনি তাতে নানা চ্যালেঞ্জও রয়েছে।

ইউক্রেন সংঘাতকে কেন্দ্র করে মস্কোর অন্যতম সমর্থকে পরিণত হয় কারাকাস। একই সঙ্গে আমেরিকা ও তার মিত্রদের আরোপিত নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ করে দেশটি। সম্প্রতি লাতিন আমেরিকার দেশটির ওপর নতুন করে আমেরিকার চাপ বাড়ার প্রেক্ষাপটে ভেনেজুয়েলার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্তও করেছিল ক্রেমলিন।

জ্বালানি খাতে সম্পর্ক

রুশ সংবাদমাধ্যম আরটি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, বিশ্বের বড় তেল রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে রাশিয়া ও ভেনেজুয়েলা বৈশ্বিক জ্বালানি ইস্যুতে ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় করে থাকে। ওপেক প্লাসসহ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন যৌথ উদ্যোগ ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে এই সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হয়েছে।

গত বছর ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ ও রাশিয়ার রোসজারুবেজনেফত–এর মধ্যে তেল প্রকল্পের মেয়াদ ১৫ বছর বাড়ানোর অনুমোদন দেয় কারাকাস। এর ফলে বোকেরন ও পেরিজা তেলক্ষেত্রের কার্যক্রম ২০৪১ সাল পর্যন্ত চলবে বলে স্থির হয়।

২০২৫ সালের মে মাসে সই করা একটি কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তির মাধ্যমে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে সহযোগিতা, বিদ্যমান ক্ষেত্রগুলোতে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং অপরিশোধিত তেল বাণিজ্য সম্প্রসারণে অঙ্গীকারাবদ্ধ এই দুই দেশ।

ভেনেজুয়েলার কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার গাজপ্রমের সঙ্গে নতুন প্রকল্প নিয়েও কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে ভবিষ্যতে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলা ও জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল রাখতে উভয় দেশের অভিন্ন প্রচেষ্টারই প্রতিফলন এসব উদ্যোগ।

প্রতিরক্ষা ও সামরিক সম্পর্ক

রুশ সংবাদমাধ্যম আরটি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, ভেনেজুয়েলার প্রধান প্রতিরক্ষা অংশীদারদের মধ্যে রাশিয়া অন্যতম। দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর ভাণ্ডারে রয়েছে রুশ সু-৩০এমকে২ যুদ্ধবিমান, এমআই-১৭, এমআই-৩৫ ও এমআই-২৬ হেলিকপ্টার, টি-৭২ ট্যাংকসহ বিভিন্ন সাঁজোয়া যান। ভেনেজুয়েলাকে মাঝারি ও দীর্ঘ পাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও সরবরাহ করেছিল রাশিয়া।

অস্ত্র সরবরাহের বাইরে রুশ সামরিক সরঞ্জামের রক্ষণাবেক্ষণ ও সার্ভিসিং সুবিধা এবং প্রতিরক্ষা শিল্পভিত্তিক প্রকল্পেও সহযোগিতা চলছে। এর মধ্যে ভেনেজুয়েলায় একে-১০৩ অ্যাসল্ট রাইফেলসহ কালাশনিকভ রাইফেল ও নানা গোলাবারুদ স্থানীয়ভাবে সংযোজনের পরিকল্পনাও ছিল কারাকাসের।

আছে বাণিজ্য স্বার্থ

রাশিয়া ও ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক সম্পর্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। নিষেধাজ্ঞা ও আর্থিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ২০২৪ সালে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২০ কোটি ডলার, যা ২০১৮ সালের তুলনায় প্রায় ৫৪ শতাংশ বেশি ছিল। মস্কোর লক্ষ্য, ২০৩০ সালের মধ্যে এই বাণিজ্যের পরিমাণ ৪০ কোটি ডলারে উন্নীত করা।

এ ছাড়া রাশিয়ায় ভেনেজুয়েলার রপ্তানিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালে কোকো, কফি ও সামুদ্রিক খাদ্যপণ্যের রপ্তানি তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে, ভেনেজুয়েলায় সার, গম, ভোজ্যতেল, ওষুধসহ বিভিন্ন শিল্প ও ভোগ্যপণ্য সরবরাহ করছে রাশিয়া।

রুশ সংবাদমাধ্যম আরটি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, কারাকাসের সঙ্গে মস্কোর অর্থনৈতিক সম্পর্কও প্রসারিত হয়েছে। ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে ধীরে ধীরে রাশিয়ার ‘মির পেমেন্ট সিস্টেম’ ব্যবহার করছে ভেনেজুয়েলা। পাশাপাশি নিজ নিজ জাতীয় মুদ্রায় বাণিজ্য নিষ্পত্তির সুযোগও তৈরি করা হয়েছে।

শিক্ষা ও সংস্কৃতি

শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সংসদীয় বিনিময়েও সহযোগিতা বাড়ছে রাশিয়া ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে। ভিসামুক্ত ভ্রমণ ও একাডেমিক কর্মসূচির আওতায় রুশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাষ্ট্রীয় বৃত্তিতে পড়াশোনা করছে ভেনেজুয়েলার শিক্ষার্থীরা। এই সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছেই। যৌথ উৎসব, চলচ্চিত্র সপ্তাহ, ব্যালে ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীত পরিবেশনাসহ নানা সাংস্কৃতিক আয়োজনও সম্পর্ককে আরও গভীর করেছে।

সব মিলিয়ে এটুকু বলাই যায় যে, আমেরিকার বিরোধী হিসেবে রাশিয়া ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে সম্পর্ক বেশ গভীর। ২০২৫ সালে নিরাপত্তাজনিত কারণে দুই দেশের মধ্যে পর্যটন ও বিমান চলাচলে স্বল্পমেয়াদি ব্যাঘাত দেখা দিলেও, সেটি ছিল সাময়িক। এখন ভেনেজুয়েলায় আক্রমণ করে আমেরিকা সেই সম্পর্ক ভেঙে দেওয়ার চেষ্টাই করবে। তবে প্রত্যুত্তরে ক্রেমলিন কী করে, তাই এখন দেখার।

সম্পর্কিত