Advertisement Banner

কার কথায় যুদ্ধ থামাল ইরান, চীন নাকি পাকিস্তান?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
কার কথায় যুদ্ধ থামাল ইরান, চীন নাকি পাকিস্তান?
ছবি: এআই দিয়ে বানানো

নানা নাটকীয়তার পর দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। পরে ইসরায়েলও ইরানে যুদ্ধবিরতিতে সম্মতি জানায়। এই যুদ্ধবিরতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান কী অর্জন করল তা নিয়ে যখন আলোচনা তুঙ্গে, তখন সামনে এল আরেক সুবিধাভোগীর নাম। সেটি হলো-এই যুদ্ধবিরতিতে একটি বড় শক্তি হিসেবে লাভবান হতে যাচ্ছে চীন।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে ইরানকে রাজি করাতে বেইজিংয়ের নীতিনির্ধারকদের ভূমিকার কথা সামনে এসেছে। চীনের এই ভূমিকা মধ্যপ্রাচ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে চীনের অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। চীনের গণমাধ্যমগুলোতে চীনের এই ভূমিকাকে বেশ গৌরবের সঙ্গে প্রচার করা হয়েছে।

দেশটির জাতীয়তাবাদী অনলাইন মাধ্যম গুয়ানচা বুধবার এক প্রতিবেদনে নিউইয়র্ক টাইমস ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের বরাত দিয়ে দাবি করে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতিতে চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, “চীন, পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশের সক্রিয় মধ্যস্থতা ছাড়া এই যুদ্ধবিরতি সম্ভব হতো না।”

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, তার বিশ্বাস চীনই ইরানকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি করিয়েছে। ইরান ও পাকিস্থানের কর্মকর্তারাও দাবি করেছিলেন, ইসলামাবাদে শেষ মুহূর্তের আলোচনায় বেইজিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ট্রাম্পের বক্তব্যের পর সেই দাবি আরও জোড়ালো হয়।

তবে কিছু বিশ্লেষক চীনের প্রকৃত প্রভাব নিয়ে সন্দিহান। তাদের ভাষ্য, চুক্তিটি শুরু থেকেই ইরানের জন্য সুবিধাজনক ছিল। তাই এতে তেহরান রাজি করানো অনেকটা ‘খোলা দরজা ঠেলে দেওয়ার’ মতো সহজ।

আবুধাবিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ট্রেন্ডস-এর জ্যেষ্ঠ গবেষক নিকোলাস লায়াল বলেন, “ইরানকে সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে রাজি করাতে চীনের কতটা চাপ প্রয়োগ করতে হয়েছে এবং ইরান কতটা এতে প্রভাবিত হয়েছে- তা বোঝার জন্য আগে দেখতে হবে ইরান আসলে কীসে সম্মত হয়েছে।”

নিকোলাস আরও বলেন, ইরানের যে ১০ দফাকে ট্রাম্প এই যুদ্ধবিরতি আলোচনার ‘কার্যকর’ ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন, তা মূলত কয়েক সপ্তাহ আগের তেহরানের ঘোষিত অবস্থানেরই পুনরাবৃত্তি। এর অর্থ, আলোচনায় বসতে রাজি হয়ে ইরান বাস্তবে কোনো ছাড় দেয়নি এবং এটিকে তারা সহজেই একটি রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করতে পারবে।

এই বিশ্লেষকের ভাষ্য, “তাই ইরানকে আলোচনায় রাজি করাতে চীনের ভূমিকা তেমন প্রভাবশালী ছিল না বলেই মনে করা হচ্ছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানের দাবিগুলো মেনে নেওয়ার প্রবণতা ছিল।”

আনুষ্ঠানিকভাবে চীন ইসলামাবাদে আলোচনায় সক্রিয় ভূমিকার বিষয়টি নিশ্চিত বা অস্বীকার-কোনোটিই করেনি।

গত বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং বলেন, “উত্তেজনা কমাতে এবং সব ধরনের সংঘাতের অবসান ঘটাতে সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে চীন।”

তা সত্ত্বেও ইরানের সংঘাত বড় ধরনের বিস্তার থেকে ফেরাতে সহায়ক এই নাজুক যুদ্ধবিরতির কৃতিত্ব পেলে বেইজিং সন্তুষ্ট থাকবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর আগে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা নড়বড়ে হয়ে যাওয়ার সময় থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে চীনের একটি অবস্থান তৈরি হচ্ছিল। বিশেষ করে ২০২৩ সালে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে অপ্রত্যাশিত সমঝোতা স্থাপনে ভূমিকা রেখে আলোচনায় আসে চীন।

এরপর ২০২৪ সালে ফিলিস্তিনের বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর নেতারা চীনে আলোচনার পর ‘বেইজিং ডিক্লারেশনে’ সই করেন, যেখানে ভবিষ্যতে একটি জাতীয় ঐক্য সরকার গঠনের বিষয়ে তারা সম্মত হন।

সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের সংঘাতে আরও গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উঠে এসেছে চীন ও পাকিস্তান। তারা একটি পাঁচ দফা পরিকল্পনা প্রকাশ করে, যার লক্ষ্য ছিল যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া।

বিশ্লেষক নিকোলাস লায়ালের মতে, “বাস্তবে সংঘাত সমাধানের চেয়ে চীনের দায়িত্বশীল ও সংযত বৈশ্বিক ভাবমূর্তি গড়ে তোলাই এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।”

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক উইলিয়াম ইয়াং বলেন, “আগেও এমন উদাহরণ আছে যেখানে সহজ পরিস্থিতিতে চীন নিজেদের কৃতিত্ব দাবি করেছে। তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন, কারণ দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা চীনের মূল স্বার্থে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।”

উইলিয়াম আরও বলেন, “চীন যদি তার প্রভাব ব্যবহার করে ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগ করে যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে সেটি তাদের স্বার্থেই হবে। তবে কী ধরনের চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে, তা প্রকাশে বেইজিং সতর্ক থাকবে।”

তবে বিশ্লেষকের ধারণা, মধ্যপ্রাচ্যে চীনের কূটনৈতিক প্রভাব এখনো সীমিত, যদিও তা বাড়ছে। ইরানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা হওয়ায় অর্থনৈতিকভাবে তেহরানের জন্য চীন গুরুত্বপূর্ণ, তবে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক খুব গভীর নয়।

চীনের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সং বো বলেন, বেইজিংয়ের কাছে গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর তালিকায় ইরান ‘শীর্ষ ১০-এর মধ্যে নেই।

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে কোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তির মধ্যস্থতাকারী হিসেবে চীনের ভূমিকা নেওয়ার সম্ভাবনাও কম।

বুধবার বেইজিংয়ে ইরানের দূত আবদোলরেজা রাহমানি ফাজলি আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘চীন ও রাশিয়ার মতো বড় দেশগুলো’ আঞ্চলিক শান্তি নিশ্চিতে কাজ করবে। যুদ্ধবিরতির আগে হরমুজ প্রণালি খোলা নিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি প্রস্তাবে ভেটো দেয় চীন ও রাশিয়া। তবে সরাসরি সংঘাতে সম্পদ বিনিয়োগ করা অনেক বড় সিদ্ধান্ত।

সং বো বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের কোনো পক্ষের সঙ্গে চীনের সরাসরি স্বার্থ জড়িত নয়। যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতাকারী হওয়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল কূটনৈতিক পদক্ষেপ, এবং সহজে চীন এতে যুক্ত হবে না। আর এটি বাস্তবসম্মত নয়। মধ্যস্থতাকারী হলেও সংঘাতে জড়িত পক্ষগুলোকে নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাবিত করার মতো কূটনৈতিক বা সামরিক সক্ষমতা চীনের নেই।”

নিকোলাস লায়াল বলেন, যুদ্ধবিরতির শর্ত মানা হচ্ছে কি না তা যাচাই করার সক্ষমতাও চীনের সীমিত, এবং কেউ শর্ত ভাঙলে কার্যকর শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতাও তাদের নেই।

বিশ্লেষকরা বলেন, এই চুক্তি শুধু চীনের জন্য ভাবমূর্তির জন্য সাফল্য নয়। দেশটির কাছে পর্যাপ্ত তেলের মজুত থাকলেও বৈশ্বিক মন্দা ও জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তাদের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য হুমকি।

সং বো বলেন, “যদি এই সংঘাত নিয়ন্ত্রণে এনে তেলের দাম কিছুটা কমানো যায়, তাহলে তা চীনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”

সম্পর্কিত