তরুণ চক্রবর্তী

সন্তান ধারণ নিয়েও জমে উঠেছে ভারতের ধর্মপ্রচারক, রাজনৈতিক কারবারী ও আঞ্চলিকতাবাদীদের মতপার্থক্য। নিজেদের স্বার্থে নিজ নিজ দৃষ্টিতে তারা এখন জন্মনিয়ন্ত্রণ নীতিকে কাজে লাগাতে সচেষ্ট। কেউ চাইছেন আরও সন্তান। আবার কারও স্লোগান ‘হাম দো, হামারা দো’। শিক্ষিতদের একটা অংশ আরও সন্তান ধারণ তো দূরঅস্ত, বিয়েতেই তেমন একটা উৎসাহী নয়। শহরে বাড়ছে ‘লিভ টুগেদার’ বা ‘লিভ ইন’।
ভারত মানেই ‘বিবিধের মাঝে মিলন মহান!’ তাই কোথাও দুইয়ের বেশি সন্তান জন্মালে নেমে আসছে রাষ্ট্রীয় শাস্তির খাঁড়া, আবার কোথাও আর্থিক পুরস্কার। সত্যি সেলুকস, কী বিচিত্র এই দেশ!
ওয়ার্ল্ডোমিটার (Worldometer)-এর হিসাব অনুযায়ী এ বছর মার্চের শুরুতেই ভারতের জনসংখ্যা ১৪৭ কোটি ছাড়িয়ে গিয়েছে। কিন্তু ভারতের এই ‘জনবিস্ফোরণ’ গোটা দেশে একহারে হয়নি। তাই সমস্যা। কোথাও জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার খুব বেশি, আবার কোথাও খুব কম। ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক ভারসাম্য ঘেঁটে গেছে! ২০১১ সালের পর জনগণনা হয়নি এদেশে। তবু জনবিন্যাস যে বদলে গেছে, সেটা বুঝতে কারও অসুবিধা হচ্ছে না। শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে এখন রাজ্যে রাজ্যে শুরু হয়েছে নতুন নতুন স্লোগান।
যেমন আসামে বিজেপির সরকার জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে মরিয়া। দুইয়ের বেশি সন্তান হলেই সেখানে সরকারি সুবিধা কর্তন হচ্ছে। এমনকি, স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচনে দাঁড়ানোর অধিকারও খোয়াতে হচ্ছে দুটির বেশি সন্তানের বাবা-মাকে। পাশের রাজ্য মিজোরামে আবার দুটির বেশি সন্তান জন্মালেই মিলছে আর্থিক পুরস্কার! খ্রিষ্টান অধ্যুষিত রাজ্যটির চার্চে চার্চে দম্পতিদের বেশি সন্তান ধারণের জন্য উৎসাহ দিতে চলছে প্রচার। দুই বা তার বেশি সন্তান হলেই দম্পতিকে ২৫ হাজার রুপি করে দেবে বলে ঘোষণা করেছে হিন্দু অধ্যুষিত অন্ধ্রপ্রদেশের বিজেপি সমর্থিত রাজ্য সরকার। অথচ কিছুদিন আগেও অন্ধ্রে দুইয়ের বেশি সন্তান থাকলে স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া নিষিদ্ধ ছিল। সেই আইন বাতিল করে তারাই এখন বলছে, বড় পরিবার ‘সমাজের জন্য সেবা’।
ভারতে নিজেদের আধিপত্য টিকিয়ে রাখতেই এখন ধর্মীয়গুরু, জননেতা বা আঞ্চলিক নেতারা জন্মনিয়ন্ত্রণকে উপেক্ষা করতে পারছেন না। ১৯৭৬ সালে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী শুরু করেছিলেন জন্মনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি। কংগ্রেস স্লোগান তুলেছিল ‘হাম দো, হামারা দো’। সেই স্লোগানে ব্যাপক সাড়া পড়ে দক্ষিণ ভারতে। সেখানকার শিক্ষিত সমাজ জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে মনোযোগী হলেও ভারতে গোবলয় বলে পরিচিত হিন্দিভাষী রাজ্যগুলোতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারে লাগাম পড়েনি। উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, বিহার, রাজস্থান, ঝাড়খন্ড প্রভৃতি রাজ্য জনসংখ্যার হাত ধরে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। অন্যদিকে, গুরুত্ব কমার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে দক্ষিণের রাজ্যগুলোর।
আইন অনুযায়ী, চলতি বছরেই ভারতের জাতীয় সংসদের আসন বৃদ্ধির কথা। কিন্তু হচ্ছে না। কারণ, কোভিডের জন্য ২০২১ সালে জনগণনা হয়নি। ২০২৭ সালের মধ্যে জনগণনা শেষ হওয়ার কথা। তারপরই হতে পারে আসন পুনর্বিন্যাস বা ডিলিমিটেশন। যখনই হোক দক্ষিণ ভারতের গুরুত্ব কমার আশঙ্কা প্রবল।
ভারতের লোকসভায় বর্তমান সদস্য সংখ্যা ৫৪৩। ১৯৭১ সালে এই সংখ্যা নির্ধারিত হয়। প্রতি ২৫ বছর অন্তর জনসংখ্যা অনুপাতে সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি ও আসন পুনর্বিন্যাস করার কথা সংবিধানে বলা হয়েছে। কিন্তু ১৯৯৬ ও ২০২১ সালে ২৫ বছরের জন্য সেই বিধান স্থগিত রাখা হয়। ভারতের জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় ২৫০ এবং নিম্নকক্ষ লোকসভায় ৫৪৩ জন সদস্য থাকলেও নতুন সংসদ ভবনে লোকসভায় ৮৮৮ এবং রাজ্যসভায় ৩৮৪ জনের বসার বন্দোবস্ত করা হয়েছে। তবে অ-বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোর দাবি, ৩০ বছরের জন্য ডিলিমিটেশন স্থগিত রাখতে হবে।
স্রোতের বিপরীতে শুরু হয়েছে জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রচার। বিজেপির মেন্টর বলে পরিচিত রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের প্রধান মোহন ভাগবতও প্রতি পরিবারে তিন সন্তানের পক্ষে সওয়াল করেছেন। তার যুক্তি, রিপ্লেসমেন্ট লেভেল বার্থ রেট নারীপ্রতি ২:১ হওয়া উচিত। অন্ধ্রের ২৫ হাজার রুপির বিপরীতে মিজোরাম সরকারের তরফে ১ লাখ রুপি প্রাণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুসারে মিজোরামের জনসংখ্যা ১০ লাখ ৯১ হাজার ১৪। রাজ্যটির মোট আয়তন ২১ হাজার ৮৭ বর্গ কিলোমিটার। প্রতি বর্গ কিলোমিটারে মাত্র ৫২ জন লোক বাস করে। ভারতে জনঘনত্বের দিক থেকে মিজোরাম রয়েছে তালিকায় শেষের দিক থেকে দ্বিতীয় নম্বরে। একেবারে শেষে রয়েছে অরুণাচল প্রদেশ। এই রাজ্যে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে মাত্র ১৭ জন বাস করে। মিজোরাম রাজ্য সরকারের হিসাব বলছে, গত দশকে রাজ্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ২৯ দশমিক ১৮ শতাংশ। কিন্তু চলতি দশকে এখন পর্যন্ত তা কমে ২৩ দশমিক ৪৮ শতাংশ হয়েছে। গির্জায় গির্জায় ইতিমধ্যেই জন্মনিয়ন্ত্রণ নীতিকে ‘ঈশ্বরবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে প্রচার শুরু হয়েছে। দক্ষিণ মিজোরামের ব্যাপটিস্ট গির্জা চতুর্থ সন্তানের জন্ম হলে চার হাজার ও পঞ্চম সন্তান জন্মালে বাবা-মাকে পাঁচ হাজার রুপি নগদ পুরস্কারেরও ঘোষণা করেছে।
ভারতীয় নাগরিকদের মধ্যে গ্রামীণ ও আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া শ্রেণির মধ্যেই জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি। অনেকে এর মধ্যে ধর্মীয় মেরুকরণেরও চেষ্টা করছেন। বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী পশ্চিমবঙ্গ বা আসামের গ্রামীণ এলাকায় মুসলিমদের মধ্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কিছুটা বেশি। আবার হিন্দিভাষী এলাকার আর্থিকভাবে অনুন্নত জনজাতিদের মধ্যেও একই চিত্র দেখা যায়। ধর্ম নয়, আর্থিক প্রতিকূলতাই মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রতিবন্ধক এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা ডেকে এনেছে। কেরলমে (সাবেক কেরালা) মুসলিমদের মধ্যেও তাই জন্মনিয়ন্ত্রণের হার চোখে পড়ার মতো। তবু প্রচারে ধর্মীয় মেরুকরণ চলছে। আসামে তো প্রকাশ্যেই মুসলিমদের দোষারোপ করে কঠোর আইনই করা হয়েছে জন্মনিয়ন্ত্রণে।
রাজনৈতিক সমস্যা দেখা দিয়েছে দক্ষিণ ভারতে। কেরলম ছাড়াও, কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাডু ও তেলেঙ্গনায় ব্যাপক সাফল্য পায় ‘হাম দো, হামারা দো’ সরকারি কর্মসূচি। কিন্তু সেই সাফল্য তাদের পুরস্কারের বদলে শাস্তির মুখে দাঁড় করিয়েছে। এলাকা পুনর্নির্ধারণ হলে ভারতীয় রাজনীতিতে দক্ষিণ ভারতের গুরুত্ব কমবে। গো-বলয়ের সাফল্যই সরকার গড়তে পারবে যেকোনো রাজনৈতিক দল। তাই ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে ডিলিমিটেশন বিরোধী প্রস্তুতি।
তামিলনাডুর মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিনের নেতৃত্বে ৩০ বছরের জন্য ডিলিমিটেশন স্থগিত রাখার জন্য দাবি তুলতে শুরু করেছেন অ-বিজেপি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা। সেই সঙ্গে চলছে জন্মহার বাড়ানোর সরকারি প্রচারও। অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী এন চন্দ্রবাবু নাইডু দিল্লিতে নরেন্দ্র মোদির সরকারের জোটসঙ্গী হলেও জনসংখ্যা বাড়াতে তিনিও নিজের রাজ্যে বিবাহিত দম্পতিদের সন্তান ধারণে উৎসাহিত করতে শুরু করেছেন। দক্ষিণ ভারতে দম্পতিপিছু সন্তান জন্ম দেওয়ার হার গড়ে ১.৩ থেকে ১.৬। এর বিপরীতে উত্তর ভারতের হিন্দিভাষী রাজ্যগুলোর সন্তান জন্মদানের গড় হার ২.৩ শতাংশ থেকে ৩.০। সমস্যা এখানেই।
শুধু দক্ষিণ ভারতই নয়, গোটা ভারতেই জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ সমস্যা হয়ে দেখা দিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত এখনই বৃদ্ধদের দেশ হয়ে উঠেছে। কারণ, জন্মহারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমছে মৃত্যু হারও। ১৯৭০ সালে ভারতীয় নারীরা গড়ে ৫ সন্তানের জন্ম দিলেও এখন সেই হার কমে এসেছে ১.৯-এ। ‘ছোট পরিবার সুখী পরিবার’ স্লোগান দিতে গিয়ে ১৪ বছরের কম বয়সীদের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। সমস্যা আরও বাড়ছে ৩০ বা ৪০-এর গন্ডি পার করে নারীদের বিয়ে করার প্রবণতাতেও। ভারতে প্রতি এক হাজার জনসংখ্যায় বছরে জন্ম নেওয়া শিশুর সংখ্যা ২০২২ সালে ১৯.১ থেকে কমে ২০২৩ সালে ১৮.৪-এ দাঁড়িয়েছে।
মৃত্যুহারও কমছে। ১৯৭১ সালে সার্বিক মৃত্যুহার ছিল ১৪.৯। তা কমে ২০২৩ সালে ৬.৪-এ এসে দাঁড়িয়েছে। শুধু ২০২২ আর ২০২৩-এর মধ্যে তুলনায় দেখা যাচ্ছে, গ্রামে মৃত্যুহার ৭.২ থেকে কমে ৬.৮ হয়েছে। আর ৬ থেকে কমে ৫.৭ হয়েছে শহরে। মৃত্যুহার সবচেয়ে কম চণ্ডীগড়ে (৪) এবং শীর্ষে ছত্তীসগড় (৮.৩)। অনেকে বলেন, জন্ম ও মৃত্যু সৃষ্টিকর্তার হাতে! কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির পাশাপাশি ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক রাজনীতির হাত ধরে ভারতে সৃষ্টিকর্তার আধিপত্যের লাগামও বোধহয় কিছুটা হ্রাস পাচ্ছে!
শান্তিতে নোবেল বিজয়ী মাদার তেরেসা বলেছিলেন, কৃত্রিম জন্মনিয়ন্ত্রণ ‘স্বার্থপর কাজ’ এবং গর্ভপাত ‘জীবনের প্রতি অসম্মানের প্রতীক’। তার এই বক্তব্যের বিরোধী ছিল শিক্ষিত খ্রিষ্টান সমাজও। কিন্তু ভারতে এখন ডিলিমিটেশনের চক্করে পড়ে জাতিধর্ম নির্বিশেষে অনেকেই মাদার তেরেসার সেই বাণীকেই কোথাও কোথাও নিজেদের স্বার্থে নতুন করে প্রচার করতে চাইছে। কিন্তু শিক্ষিত তরুণ সমাজ তাতে সাড়া দেবে কিনা, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকছেই। তবু অনেকে মনে করেন, স্রোতের বিপরীতে হাঁটার চেষ্টা চালাতে তো দোষ নেই!
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলকাতা (ভারত)

সন্তান ধারণ নিয়েও জমে উঠেছে ভারতের ধর্মপ্রচারক, রাজনৈতিক কারবারী ও আঞ্চলিকতাবাদীদের মতপার্থক্য। নিজেদের স্বার্থে নিজ নিজ দৃষ্টিতে তারা এখন জন্মনিয়ন্ত্রণ নীতিকে কাজে লাগাতে সচেষ্ট। কেউ চাইছেন আরও সন্তান। আবার কারও স্লোগান ‘হাম দো, হামারা দো’। শিক্ষিতদের একটা অংশ আরও সন্তান ধারণ তো দূরঅস্ত, বিয়েতেই তেমন একটা উৎসাহী নয়। শহরে বাড়ছে ‘লিভ টুগেদার’ বা ‘লিভ ইন’।
ভারত মানেই ‘বিবিধের মাঝে মিলন মহান!’ তাই কোথাও দুইয়ের বেশি সন্তান জন্মালে নেমে আসছে রাষ্ট্রীয় শাস্তির খাঁড়া, আবার কোথাও আর্থিক পুরস্কার। সত্যি সেলুকস, কী বিচিত্র এই দেশ!
ওয়ার্ল্ডোমিটার (Worldometer)-এর হিসাব অনুযায়ী এ বছর মার্চের শুরুতেই ভারতের জনসংখ্যা ১৪৭ কোটি ছাড়িয়ে গিয়েছে। কিন্তু ভারতের এই ‘জনবিস্ফোরণ’ গোটা দেশে একহারে হয়নি। তাই সমস্যা। কোথাও জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার খুব বেশি, আবার কোথাও খুব কম। ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক ভারসাম্য ঘেঁটে গেছে! ২০১১ সালের পর জনগণনা হয়নি এদেশে। তবু জনবিন্যাস যে বদলে গেছে, সেটা বুঝতে কারও অসুবিধা হচ্ছে না। শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে এখন রাজ্যে রাজ্যে শুরু হয়েছে নতুন নতুন স্লোগান।
যেমন আসামে বিজেপির সরকার জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে মরিয়া। দুইয়ের বেশি সন্তান হলেই সেখানে সরকারি সুবিধা কর্তন হচ্ছে। এমনকি, স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচনে দাঁড়ানোর অধিকারও খোয়াতে হচ্ছে দুটির বেশি সন্তানের বাবা-মাকে। পাশের রাজ্য মিজোরামে আবার দুটির বেশি সন্তান জন্মালেই মিলছে আর্থিক পুরস্কার! খ্রিষ্টান অধ্যুষিত রাজ্যটির চার্চে চার্চে দম্পতিদের বেশি সন্তান ধারণের জন্য উৎসাহ দিতে চলছে প্রচার। দুই বা তার বেশি সন্তান হলেই দম্পতিকে ২৫ হাজার রুপি করে দেবে বলে ঘোষণা করেছে হিন্দু অধ্যুষিত অন্ধ্রপ্রদেশের বিজেপি সমর্থিত রাজ্য সরকার। অথচ কিছুদিন আগেও অন্ধ্রে দুইয়ের বেশি সন্তান থাকলে স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া নিষিদ্ধ ছিল। সেই আইন বাতিল করে তারাই এখন বলছে, বড় পরিবার ‘সমাজের জন্য সেবা’।
ভারতে নিজেদের আধিপত্য টিকিয়ে রাখতেই এখন ধর্মীয়গুরু, জননেতা বা আঞ্চলিক নেতারা জন্মনিয়ন্ত্রণকে উপেক্ষা করতে পারছেন না। ১৯৭৬ সালে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী শুরু করেছিলেন জন্মনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি। কংগ্রেস স্লোগান তুলেছিল ‘হাম দো, হামারা দো’। সেই স্লোগানে ব্যাপক সাড়া পড়ে দক্ষিণ ভারতে। সেখানকার শিক্ষিত সমাজ জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে মনোযোগী হলেও ভারতে গোবলয় বলে পরিচিত হিন্দিভাষী রাজ্যগুলোতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারে লাগাম পড়েনি। উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, বিহার, রাজস্থান, ঝাড়খন্ড প্রভৃতি রাজ্য জনসংখ্যার হাত ধরে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। অন্যদিকে, গুরুত্ব কমার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে দক্ষিণের রাজ্যগুলোর।
আইন অনুযায়ী, চলতি বছরেই ভারতের জাতীয় সংসদের আসন বৃদ্ধির কথা। কিন্তু হচ্ছে না। কারণ, কোভিডের জন্য ২০২১ সালে জনগণনা হয়নি। ২০২৭ সালের মধ্যে জনগণনা শেষ হওয়ার কথা। তারপরই হতে পারে আসন পুনর্বিন্যাস বা ডিলিমিটেশন। যখনই হোক দক্ষিণ ভারতের গুরুত্ব কমার আশঙ্কা প্রবল।
ভারতের লোকসভায় বর্তমান সদস্য সংখ্যা ৫৪৩। ১৯৭১ সালে এই সংখ্যা নির্ধারিত হয়। প্রতি ২৫ বছর অন্তর জনসংখ্যা অনুপাতে সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি ও আসন পুনর্বিন্যাস করার কথা সংবিধানে বলা হয়েছে। কিন্তু ১৯৯৬ ও ২০২১ সালে ২৫ বছরের জন্য সেই বিধান স্থগিত রাখা হয়। ভারতের জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় ২৫০ এবং নিম্নকক্ষ লোকসভায় ৫৪৩ জন সদস্য থাকলেও নতুন সংসদ ভবনে লোকসভায় ৮৮৮ এবং রাজ্যসভায় ৩৮৪ জনের বসার বন্দোবস্ত করা হয়েছে। তবে অ-বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোর দাবি, ৩০ বছরের জন্য ডিলিমিটেশন স্থগিত রাখতে হবে।
স্রোতের বিপরীতে শুরু হয়েছে জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রচার। বিজেপির মেন্টর বলে পরিচিত রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের প্রধান মোহন ভাগবতও প্রতি পরিবারে তিন সন্তানের পক্ষে সওয়াল করেছেন। তার যুক্তি, রিপ্লেসমেন্ট লেভেল বার্থ রেট নারীপ্রতি ২:১ হওয়া উচিত। অন্ধ্রের ২৫ হাজার রুপির বিপরীতে মিজোরাম সরকারের তরফে ১ লাখ রুপি প্রাণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুসারে মিজোরামের জনসংখ্যা ১০ লাখ ৯১ হাজার ১৪। রাজ্যটির মোট আয়তন ২১ হাজার ৮৭ বর্গ কিলোমিটার। প্রতি বর্গ কিলোমিটারে মাত্র ৫২ জন লোক বাস করে। ভারতে জনঘনত্বের দিক থেকে মিজোরাম রয়েছে তালিকায় শেষের দিক থেকে দ্বিতীয় নম্বরে। একেবারে শেষে রয়েছে অরুণাচল প্রদেশ। এই রাজ্যে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে মাত্র ১৭ জন বাস করে। মিজোরাম রাজ্য সরকারের হিসাব বলছে, গত দশকে রাজ্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ২৯ দশমিক ১৮ শতাংশ। কিন্তু চলতি দশকে এখন পর্যন্ত তা কমে ২৩ দশমিক ৪৮ শতাংশ হয়েছে। গির্জায় গির্জায় ইতিমধ্যেই জন্মনিয়ন্ত্রণ নীতিকে ‘ঈশ্বরবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে প্রচার শুরু হয়েছে। দক্ষিণ মিজোরামের ব্যাপটিস্ট গির্জা চতুর্থ সন্তানের জন্ম হলে চার হাজার ও পঞ্চম সন্তান জন্মালে বাবা-মাকে পাঁচ হাজার রুপি নগদ পুরস্কারেরও ঘোষণা করেছে।
ভারতীয় নাগরিকদের মধ্যে গ্রামীণ ও আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া শ্রেণির মধ্যেই জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি। অনেকে এর মধ্যে ধর্মীয় মেরুকরণেরও চেষ্টা করছেন। বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী পশ্চিমবঙ্গ বা আসামের গ্রামীণ এলাকায় মুসলিমদের মধ্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কিছুটা বেশি। আবার হিন্দিভাষী এলাকার আর্থিকভাবে অনুন্নত জনজাতিদের মধ্যেও একই চিত্র দেখা যায়। ধর্ম নয়, আর্থিক প্রতিকূলতাই মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রতিবন্ধক এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা ডেকে এনেছে। কেরলমে (সাবেক কেরালা) মুসলিমদের মধ্যেও তাই জন্মনিয়ন্ত্রণের হার চোখে পড়ার মতো। তবু প্রচারে ধর্মীয় মেরুকরণ চলছে। আসামে তো প্রকাশ্যেই মুসলিমদের দোষারোপ করে কঠোর আইনই করা হয়েছে জন্মনিয়ন্ত্রণে।
রাজনৈতিক সমস্যা দেখা দিয়েছে দক্ষিণ ভারতে। কেরলম ছাড়াও, কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাডু ও তেলেঙ্গনায় ব্যাপক সাফল্য পায় ‘হাম দো, হামারা দো’ সরকারি কর্মসূচি। কিন্তু সেই সাফল্য তাদের পুরস্কারের বদলে শাস্তির মুখে দাঁড় করিয়েছে। এলাকা পুনর্নির্ধারণ হলে ভারতীয় রাজনীতিতে দক্ষিণ ভারতের গুরুত্ব কমবে। গো-বলয়ের সাফল্যই সরকার গড়তে পারবে যেকোনো রাজনৈতিক দল। তাই ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে ডিলিমিটেশন বিরোধী প্রস্তুতি।
তামিলনাডুর মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিনের নেতৃত্বে ৩০ বছরের জন্য ডিলিমিটেশন স্থগিত রাখার জন্য দাবি তুলতে শুরু করেছেন অ-বিজেপি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা। সেই সঙ্গে চলছে জন্মহার বাড়ানোর সরকারি প্রচারও। অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী এন চন্দ্রবাবু নাইডু দিল্লিতে নরেন্দ্র মোদির সরকারের জোটসঙ্গী হলেও জনসংখ্যা বাড়াতে তিনিও নিজের রাজ্যে বিবাহিত দম্পতিদের সন্তান ধারণে উৎসাহিত করতে শুরু করেছেন। দক্ষিণ ভারতে দম্পতিপিছু সন্তান জন্ম দেওয়ার হার গড়ে ১.৩ থেকে ১.৬। এর বিপরীতে উত্তর ভারতের হিন্দিভাষী রাজ্যগুলোর সন্তান জন্মদানের গড় হার ২.৩ শতাংশ থেকে ৩.০। সমস্যা এখানেই।
শুধু দক্ষিণ ভারতই নয়, গোটা ভারতেই জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ সমস্যা হয়ে দেখা দিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত এখনই বৃদ্ধদের দেশ হয়ে উঠেছে। কারণ, জন্মহারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমছে মৃত্যু হারও। ১৯৭০ সালে ভারতীয় নারীরা গড়ে ৫ সন্তানের জন্ম দিলেও এখন সেই হার কমে এসেছে ১.৯-এ। ‘ছোট পরিবার সুখী পরিবার’ স্লোগান দিতে গিয়ে ১৪ বছরের কম বয়সীদের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। সমস্যা আরও বাড়ছে ৩০ বা ৪০-এর গন্ডি পার করে নারীদের বিয়ে করার প্রবণতাতেও। ভারতে প্রতি এক হাজার জনসংখ্যায় বছরে জন্ম নেওয়া শিশুর সংখ্যা ২০২২ সালে ১৯.১ থেকে কমে ২০২৩ সালে ১৮.৪-এ দাঁড়িয়েছে।
মৃত্যুহারও কমছে। ১৯৭১ সালে সার্বিক মৃত্যুহার ছিল ১৪.৯। তা কমে ২০২৩ সালে ৬.৪-এ এসে দাঁড়িয়েছে। শুধু ২০২২ আর ২০২৩-এর মধ্যে তুলনায় দেখা যাচ্ছে, গ্রামে মৃত্যুহার ৭.২ থেকে কমে ৬.৮ হয়েছে। আর ৬ থেকে কমে ৫.৭ হয়েছে শহরে। মৃত্যুহার সবচেয়ে কম চণ্ডীগড়ে (৪) এবং শীর্ষে ছত্তীসগড় (৮.৩)। অনেকে বলেন, জন্ম ও মৃত্যু সৃষ্টিকর্তার হাতে! কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির পাশাপাশি ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক রাজনীতির হাত ধরে ভারতে সৃষ্টিকর্তার আধিপত্যের লাগামও বোধহয় কিছুটা হ্রাস পাচ্ছে!
শান্তিতে নোবেল বিজয়ী মাদার তেরেসা বলেছিলেন, কৃত্রিম জন্মনিয়ন্ত্রণ ‘স্বার্থপর কাজ’ এবং গর্ভপাত ‘জীবনের প্রতি অসম্মানের প্রতীক’। তার এই বক্তব্যের বিরোধী ছিল শিক্ষিত খ্রিষ্টান সমাজও। কিন্তু ভারতে এখন ডিলিমিটেশনের চক্করে পড়ে জাতিধর্ম নির্বিশেষে অনেকেই মাদার তেরেসার সেই বাণীকেই কোথাও কোথাও নিজেদের স্বার্থে নতুন করে প্রচার করতে চাইছে। কিন্তু শিক্ষিত তরুণ সমাজ তাতে সাড়া দেবে কিনা, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকছেই। তবু অনেকে মনে করেন, স্রোতের বিপরীতে হাঁটার চেষ্টা চালাতে তো দোষ নেই!
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলকাতা (ভারত)

অনিরাপদ বিশ্ব নিরাপদ হবে না যতদিন একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারীর ক্ষমতা খর্ব না হয়। সেটি সম্ভব-যদি Balance of Terror প্রতিষ্ঠিত হতো। ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ভারতের পারমাণবিক শক্তি অর্জনের সমর্থনে বলেছিলেন, ‘Strength respects strength’। জানি না কতদিনে বিশ্বের এই একতরফা ক্ষমতার অবাসন হবে?