Advertisement Banner

আইসোমেট্রিক ব্যায়াম কি সবচেয়ে কার্যকর ফিটনেস পদ্ধতি?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
আইসোমেট্রিক ব্যায়াম কি সবচেয়ে কার্যকর ফিটনেস পদ্ধতি?
প্রতীকী ছবি: ফ্রিপিক

আপনি যদি নিজের স্বাস্থ্য বা শরীরের সক্রিয়তা নিয়ে চিন্তিত হয়ে থাকেন, কিন্তু ব্যস্ত সময়সূচির মধ্যে নিয়মিত ব্যায়াম অন্তর্ভুক্ত করতে হিমশিম খাচ্ছেন। তবে আপনার জন্য একটি সুসংবাদ রয়েছে।

ফিটনেস বলতে আমরা সাধারণত জিমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রেডমিলে দৌড়ানো কিংবা ভারোত্তোলনের কথাই ভাবি। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, উপকার পেতে এত বেশি পরিশ্রমের প্রয়োজন নেই। বরং প্রায় না নড়াচড়া করেও কিছু উপকার পাওয়া সম্ভব। কয়েক মিনিট একটি ভঙ্গি ধরে রাখলেই যথেষ্ট। বিশ্লেষকরা এ ধরনের ব্যায়ামের নাম দিয়েছেন ‘আইসোমেট্রিক ব্যায়াম’।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইসোমেট্রিক ব্যায়াম হৃদস্বাস্থ্য উন্নত করতে এবং পেশির শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে বলে গবেষণায় জানা গেছে।

আইসোমেট্রিক ব্যায়ামের উপকারিতা

বিবিসি বলছে, আইসোমেট্রিক ব্যায়ামের উপকারিতা নিয়ে গবেষণা কয়েক দশক ধরেই চলছে।

২০২৩ সালে প্রকাশিত একটি মেটা-অ্যানালাইসিসে ১৯৯০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণার ফলাফল বিশ্লেষণ করা হয়। এতে অন্তত দুই সপ্তাহ ধরে ব্যায়াম করা প্রায় ১৬ হাজার মানুষের তথ্য নিয়ে বিভিন্ন ধরনের ব্যায়াম পদ্ধতির রক্তচাপ কমানোর কার্যকারিতা তুলনা করা হয়েছে।

গবেষণাগুলোতে তিনটি নির্দিষ্ট ব্যায়াম বিবেচনা করা হয়েছে: হ্যান্ডগ্রিপ (কোনো ডিভাইস বা বল চেপে ধরা), ওয়াল স্কোয়াট এবং লেগ এক্সটেনশন। এসব পরীক্ষায় সাধারণত একই ধরনের প্রশিক্ষণ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়-প্রতিটি ব্যায়াম দুই মিনিট করে চারবার করা, এবং মাঝখানে এক বা দুই মিনিট বিরতি নেওয়া। এইভাবে মোট ১৪ মিনিটের একটি সেশন সপ্তাহে তিন দিন করা হয়। যা তাত্ত্বিকভাবে সবার দৈনন্দিন রুটিনে সহজেই মানিয়ে নেওয়া সম্ভব।

ফলাফল স্বাস্থ্যসচেতনদের জন্য বেশ চমকপ্রদ। এতে দেখা গেছে, আইসোমেট্রিক ব্যায়াম কার্ডিও, ওজন প্রশিক্ষণ, সম্মিলিত ব্যায়াম কিংবা উচ্চ-তীব্রতার ইন্টারভ্যাল ট্রেনিং এর তুলনায় বেশি কার্যকর।

এই ব্যায়াম পদ্ধতির সহজলভ্যতাই এটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যের কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অব হেলথ সার্ভিসেস স্টাডিজের সিনিয়র গবেষক মেলানি রিজ রবার্টস। তিনি জানান, এই ব্যায়াম উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে।

যুক্তরাজ্যের ক্যান্টারবেরি ক্রাইস্ট চার্চ ইউনিভার্সিটির ব্যায়ামবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং মেটা-অ্যানালাইসিসটির সহ-লেখক জিম ওয়াইলস বলেন, যাদের জয়েন্ট বা চলাফেরায় সমস্যা রয়েছে এবং যারা দৌড়ানো বা ভারোত্তোলনের ব্যায়াম করতে পারেন না, তাদের জন্য এটি বিশেষভাবে উপকারী হতে পারে।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

তার মতে, “আইসোমেট্রিক ওয়াল স্কোয়াট যদি সঠিকভাবে করা হয়, তবে হৃদ্‌যন্ত্র ও পেশি-সংক্রান্ত দৃষ্টিকোণ থেকে অন্যান্য অনেক ব্যায়ামের তুলনায় বেশি নিরাপদ।”

কেন এটি কার্যকর

বিশ্লেষকরা বলেন, আইসোমেট্রিক ব্যায়াম করার সময় একটি বা একাধিক পেশি সংকুচিত করে নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে ধরে রাখা হয়। ফলে অন্যান্য চলমান ব্যায়ামের মতো পেশির দৈর্ঘ্য পরিবর্তিত হয় না। এ ধরনের স্থির অবস্থান রক্তনালীগুলোকে চাপ দেয়, যার ফলে সক্রিয় পেশিতে অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হয় এবং বর্জ্য পদার্থ জমতে থাকে। এতে মস্তিষ্ক ওই স্থানে বেশি অক্সিজেন পাঠানোর চেষ্টা করে, যা প্রতিরোধ বৃদ্ধির সঙ্গে মিলিত হয়ে রক্তচাপ বাড়ায়।

পেশির সংকোচন বন্ধ হলে রক্তনালীগুলো আবার প্রসারিত হয়, ফলে সেখানে রক্তপ্রবাহ বেড়ে যায় এবং সাময়িকভাবে রক্তচাপ কমে। ধারণা করা হয়, এই প্রক্রিয়াটি বারবার ঘটলে দীর্ঘমেয়াদে রক্তচাপ কমতে পারে।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ব্যায়ামের উপকারিতা শুধু রক্তচাপেই সীমাবদ্ধ নয়। রক্তনালীগুলোকে উদ্দীপিত করার মাধ্যমে আইসোমেট্রিক ব্যায়াম ধমনীর শক্ত হয়ে যাওয়া কমাতে সাহায্য করে এবং সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এটি হৃদযন্ত্রের সামগ্রিক কার্যকারিতাও উন্নত করতে পারে।

এছাড়া, পেশির শক্তি বাড়াতেও এটি কার্যকর, কারণ এটি মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডের নিউরনগুলোকে সক্রিয় করে ‘মোটর ইউনিট’ (পেশিতে যুক্ত স্নায়ুর সমষ্টি) চালু করে, যা পেশিকে সংকুচিত করে।

যুক্তরাজ্যের অ্যাংলিয়া রাসকিন ইউনিভার্সিটির ব্যায়াম শারীরবিদ্যার অধ্যাপক ড্যান গর্ডন বলেন, “যখন আপনি পেশিকে স্থিরভাবে ধরে রাখেন, তখন এটি মূলত মোটর ইউনিটগুলোকে সক্রিয় করে।” তিনি আরও জানান, এতে সামগ্রিক ক্রীড়া দক্ষতাও উন্নত হতে পারে।

কীভাবে শুরু করবেন

যারা এখনো নিয়মিত শরীরচর্চা করেন না, তাদের জন্য আইসোমেট্রিক ব্যায়াম হতে পারে শুরু করার সহজ উপায়। তবে যারা ইতোমধ্যে সক্রিয়, তাদের জন্য বর্তমান ব্যায়াম পুরোপুরি বাদ দেওয়া ঠিক হবে না বলে সতর্ক করেছেন জিম ওয়েলস। কারণ অন্যান্য ব্যায়ামেরও নিজস্ব উপকারিতা রয়েছে।

বিবিসি বলছে, মেটা-অ্যানালাইসিসে কেবল তিন ধরনের ব্যায়াম নিয়ে গবেষণা করা হয়েছে। তাই প্ল্যাঙ্কের মতো অন্যান্য ব্যায়াম একইভাবে কাজ করবে কিনা, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

যদিও অনেকে কম সময় দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে সময় বাড়ানোর কথা ভাবতে পারেন। কিন্তু ওয়াইলসের পরামর্শ, সময় কমানোর বদলে কম তীব্রতা দিয়ে শুরু করা ভালো। অধিকাংশ মানুষই ৯০ ডিগ্রি কোণে দুই মিনিট ওয়াল স্কোয়াট ধরে রাখতে পারেন না, তাই ১১০-১৩০ ডিগ্রির মতো বেশি সোজা অবস্থান থেকে শুরু করা উচিত।

আইসোমেট্রিক ব্যায়ামের দীর্ঘমেয়াদি (মাস বা বছরজুড়ে) উপকারিতা এবং উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন রয়ে গেছে।

এই ব্যায়াম নিয়ে গবেষণা চলমান, ভবিষ্যতে হয়তো আরও অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে।

সম্পর্কিত