মস্তিষ্কে নতুন স্নায়ুকোষ তৈরি হওয়া এবং সেগুলোকে টিকিয়ে রাখার প্রক্রিয়া স্মৃতিশক্তি, শেখার ক্ষমতা ও চিন্তার নমনীয়তার সঙ্গে সম্পর্কিত। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে অনুসন্ধান করছেন, প্রাপ্তবয়স্ক মস্তিষ্কে নতুন স্নায়ুকোষের বিকাশে কোন কোন হরমোন ভূমিকা রাখে। পুরুষদের প্রধান যৌন হরমোন টেস্টোস্টেরন নিয়ে সাম্প্রতিক একটি গবেষণা এই অনুসন্ধানে নতুন তথ্য যোগ করেছে। গবেষণাটি বলছে, টেস্টোস্টেরন নতুন মস্তিষ্ককোষের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়াতে পারে। তবে এই উপকার পেতে শুধু হরমোনটির উপস্থিতি নয়, কত দিন ধরে এবং কোষের বিকাশের কোন পর্যায়ে এটি কাজ করছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
মেডিক্যাল এক্সপ্রেসে সঞ্জুক্তা মণ্ডলের প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুরুষ ইঁদুরের ওপর পরিচালিত এই গবেষণায় টানা ৩০ দিন টেস্টোস্টেরন প্রয়োগ করলে মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাসের ডেন্টেট গাইরাস নামের অংশে নতুন স্নায়ুকোষের টিকে থাকার হার বেড়েছে। হিপোক্যাম্পাস স্মৃতি ও শেখার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণভাবে যুক্ত। তবে গবেষণার মূল বিষয় ছিল, নতুন কোষের বেঁচে থাকার জন্য টেস্টোস্টেরন কত দিন প্রয়োজন এবং কোষের বিকাশের কোন পর্যায়ে হরমোনটি সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
গবেষকেরা পরীক্ষার ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে এমন একটি বিষয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইঁদুরগুলোর অণ্ডকোষ অপসারণ করেন, যাতে শরীরে টেস্টোস্টেরনের প্রধান প্রাকৃতিক উৎসটি বাদ পড়ে। অস্ত্রোপচারের ১১ দিন পর প্রতিটি ইঁদুরকে ব্রোমোডিঅক্সিউরিডিন নামের একটি রাসায়নিক উপাদান দেওয়া হয়। এটি বিভাজিত হতে থাকা নতুন কোষে প্রবেশ করে এবং সেগুলোকে শনাক্ত করতে সাহায্য করে। এরপর ইঁদুরগুলোকে বিভিন্ন দলে ভাগ করে প্রতিদিন টেস্টোস্টেরন অথবা নিয়ন্ত্রণ হিসেবে তিলের তেল দেওয়া হয়। এক দল ৩০ দিন ধরে, আর অন্য দুই দল প্রথম ১৫ দিন কিংবা শেষ ১৫ দিন হরমোনটি পায়।
গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, টানা ৩০ দিন টেস্টোস্টেরন পাওয়া ইঁদুরের ডেন্টেট গাইরাসে শনাক্তযোগ্য নতুন কোষের সংখ্যা বেড়েছে। তবে মাত্র ১৫ দিনের চিকিৎসা পুরো অঞ্চলজুড়ে কোষের বেঁচে থাকার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না। আরও নির্দিষ্টভাবে দেখা যায়, পরীক্ষার ১৬ থেকে ৩০তম দিনে টেস্টোস্টেরন প্রয়োগ করলে হিপোক্যাম্পাসের পেছনের অংশ বা ডরসাল ডেন্টেট গাইরাসে নতুন কোষের টিকে থাকার সংখ্যা বেড়েছে। এই পর্যায়ে হরমোন প্রয়োগের ফল টানা ৩০ দিনের প্রয়োগের মতোই কার্যকর ছিল। বিপরীতে, প্রথম ১৫ দিনে টেস্টোস্টেরন প্রয়োগের ক্ষেত্রে শেষ পর্যায়ে কোষের টিকে থাকার উল্লেখযোগ্য সুবিধা পাওয়া যায়নি।
এখানে গবেষণাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, টেস্টোস্টেরন নতুন কোষ তৈরির প্রাথমিক প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করার পরিবর্তে সেগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে। ব্রোমোডিঅক্সিউরিডিন দিয়ে চিহ্নিত কোষের প্রায় ৮৫ শতাংশ শেষ পর্যন্ত স্নায়ুকোষে পরিণত হয়েছিল। টেস্টোস্টেরন এই অনুপাত পরিবর্তন করেনি। অর্থাৎ, হরমোনটি কোষগুলোকে অন্য কোনো ধরনের কোষে পরিণত করার বদলে তাদের টিকে থাকার সম্ভাবনা বাড়িয়েছে—এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
তবে এই প্রভাব মস্তিষ্কের সব অঞ্চলে সমান ছিল না। টেস্টোস্টেরনের উল্লেখযোগ্য প্রভাব পাওয়া গেছে হিপোক্যাম্পাসের ডরসাল অংশে; ডেন্টেট গাইরাসের সামনের অংশে তেমন প্রভাব দেখা যায়নি। মস্তিষ্কের এই সামনের অংশটি মানসিক চাপ ও উদ্বেগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। ফলে ফলাফলটি ইঙ্গিত দেয়, হরমোনটির প্রভাব নির্দিষ্ট মস্তিষ্কাঞ্চল এবং কোষের বিকাশের পর্যায়ের ওপর নির্ভর করতে পারে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে পুরুষদের টেস্টোস্টেরনের মাত্রা স্বাভাবিকভাবেই কমতে পারে। মেডিক্যাল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই হ্রাস স্মৃতিশক্তির অবনতি ও ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে আগের গবেষণাগুলোতে দেখা গেছে। তবে এই সম্পর্কের অর্থ এই নয় যে টেস্টোস্টেরন কমে যাওয়াই সরাসরি স্মৃতিশক্তি হ্রাস বা ডিমেনশিয়ার কারণ। নতুন গবেষণাটিও মানুষের মধ্যে এমন কোনো কারণগত সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেনি।
গবেষণার ফলাফল ভবিষ্যতে আলঝেইমারসহ স্নায়ুর ক্ষয়জনিত রোগ মোকাবিলায় নতুন সম্ভাবনা অনুসন্ধানের পথ খুলে দিতে পারে। নতুন স্নায়ুকোষকে দীর্ঘ সময় বাঁচিয়ে রাখার প্রক্রিয়া বোঝা গেলে স্মৃতি ও শেখার সঙ্গে সম্পর্কিত মস্তিষ্কের কার্যক্রম সুরক্ষার নতুন উপায় খুঁজে পাওয়া সম্ভব হতে পারে। তবে বর্তমান গবেষণাটি পুরুষ ইঁদুরের ওপর পরিচালিত হয়েছে। মানুষের ক্ষেত্রে একই ফল পাওয়া যাবে কি না, তা এখনো অজানা। টেস্টোস্টেরন প্রয়োগের নিরাপত্তা, উপযুক্ত মাত্রা এবং সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও বিবেচনায় নিতে হবে।