Advertisement Banner

রেমিট্যান্স কি টেকসই উন্নয়নের সেতু, নাকি নতুন নির্ভরতার ফাঁদ?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
রেমিট্যান্স কি টেকসই উন্নয়নের সেতু, নাকি নতুন নির্ভরতার ফাঁদ?
বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকেরা। ছবি: রয়টার্স

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স আজ আর কেবল বৈদেশিক মুদ্রার উৎস নয় এটি অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয়, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। কোভিড-১৯ মহামারি থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা সব সংকটকালেই রেমিট্যান্স প্রবাহ অর্থনীতির জন্য একটি কার্যকর সুরক্ষা বলয় হিসেবে কাজ করেছে। তবে এই সাফল্যের আড়ালেই লুকিয়ে রয়েছে কিছু গভীর কাঠামোগত দুর্বলতা, যা উপেক্ষা করলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

১৯৯৬-৯৭ অর্থবছরে যেখানে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স ছিল মাত্র ১.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, সেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা ৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম চার মাসেই প্রবাসী আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯.৯৩ বিলিয়ন ডলারে। বর্তমানে রেমিট্যান্স বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৬.৫৭ শতাংশ, আমদানি ব্যয়ের প্রায় ৪৭ শতাংশ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অন্যতম প্রধান উৎস।

সংকটকালেও রেমিট্যান্স প্রবাহ থেমে থাকেনি। কোভিড-১৯ মহামারির সময় অনানুষ্ঠানিক চ্যানেল দুর্বল হয়ে পড়ায় এবং প্রবাসীরা আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ঝুঁকে পড়ায় রেমিট্যান্স প্রবাহ প্রায় ১৯ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। একই প্রবণতা দেখা যায় ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে একপর্যায়ে রেমিট্যান্স ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন ১.৯ বিলিয়ন ডলারে নেমে এলেও কয়েক মাসের মধ্যেই তা আবার ২.২ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়ে ওঠে।

এই পুনরুদ্ধারের পেছনে ছিল লক্ষ্যভিত্তিক নীতিগত পদক্ষেপ। টাকার অবমূল্যায়ন, প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর প্রতিযোগিতামূলক দর নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা এবং হুন্ডি নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক বাজারের ব্যবধান কমিয়েছে। ফলে প্রবাসীদের কাছে ব্যাংকিং চ্যানেল তুলনামূলকভাবে বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।

রেমিট্যান্স নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের বহু পরিবারের জন্য নিরাপত্তা বলয়। ছবি: রয়টার্স
রেমিট্যান্স নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের বহু পরিবারের জন্য নিরাপত্তা বলয়। ছবি: রয়টার্স

রেমিট্যান্স নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের বহু পরিবারের জন্য নিরাপত্তা বলয়। এটি ভোগব্যয় টিকিয়ে রাখে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় নিশ্চিত করে, গ্রামীণ দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমাতে সহায়তা করে এবং ক্ষুদ্র উদ্যোগে মূলধন জোগায়। একই সঙ্গে এটি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করেছে এবং রাজনৈতিক ও বৈশ্বিক সংকটের সময়ে অর্থনীতিকে সচল রাখতে বড় ভূমিকা রেখেছে।

তবে সমস্যাটি শুরু হয় তখনই, যখন এই প্রবাসী আয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের অভ্যন্তরীণ শিল্প ও উৎপাদন খাতের দুর্বলতাকে আড়াল করে ফেলে। রেমিট্যান্সের বড় অংশ এখনো উৎপাদনশীল বিনিয়োগের বদলে ভোগব্যয়েই ব্যয় হচ্ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের অভিবাসন শ্রমবাজারে এখনো স্বল্প ও অদক্ষ শ্রমিকদের আধিপত্য, যা আয়ের সম্ভাবনা সীমিত করে এবং বৈশ্বিক শ্রমবাজারের ধাক্কায় দেশকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে অনানুষ্ঠানিক হুন্ডি চ্যানেল পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। দ্রুত অর্থ পাঠানো এবং তুলনামূলক সুবিধাজনক বিনিময় হারের কারণে এই ব্যবস্থা এখনো টিকে আছে। যদিও ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার অবৈধ আর্থিক প্রবাহ দমনে কঠোর আইন প্রয়োগ ও দেশি-বিদেশি শ্রমবাজারে অভিযান জোরদার করেছে, তবু প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

নেপালের অভিজ্ঞতা এখানে একটি সতর্কবার্তা। দেশটির জিডিপির ২৮ শতাংশেরও বেশি আসে রেমিট্যান্স থেকে, যা অর্থনীতিকে একটি ‘রেমিট্যান্স ট্র্যাপ’-এ আটকে ফেলেছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে বড় ও বৈচিত্র্যময় বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের শক্ত ভিত্তির কারণে। তবে কাঠামোগত সংস্কার না হলে এই সুবিধাও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষয়ে যেতে পারে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, স্পষ্ট নিষ্ক্রিয় ভোগব্যয় থেকে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে এবং প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরতা থেকে অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যের দিকে যাত্রা বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ। এর জন্য প্রয়োজন তিনটি মূল স্তম্ভে দাঁড়ানো হবে একটি দূরদর্শী কৌশল।

প্রথমত, দক্ষতা উন্নয়ন। পেশাগত ও ডিজিটাল প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক মানের সনদের মাধ্যমে উচ্চ মজুরির শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশের একটি টাকার দোকান। ছবি: রয়টার্স
বাংলাদেশের একটি টাকার দোকান। ছবি: রয়টার্স

দ্বিতীয়ত, রেমিট্যান্স-সম্পৃক্ত বিনিয়োগ ও আর্থিক পণ্য সম্প্রসারণ যেমন: ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা ঋণ, সঞ্চয়পণ্য, বীমা, প্রবাসী বন্ড ও যৌথ বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্ম চালু করা।

তৃতীয়ত, আনুষ্ঠানিক রেমিট্যান্স চ্যানেল আরও শক্তিশালী করা স্বচ্ছ বিনিময় হার, জিরো হিডেন ফি, ডিজিটাল সেবা এবং কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে হুন্ডি নির্ভরতা কমানো।

রেমিট্যান্স বাংলাদেশের জন্য টেকসই উন্নয়নের সেতু হতে পারে, স্থায়ী ভরসা নয়। পরিকল্পিত নীতির মাধ্যমে প্রবাসী আয়ের এই শক্তিকে শিল্পায়ন, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও যৌথ সমৃদ্ধির পথে কাজে লাগানো না গেলে আজকের সাফল্যই আগামী দিনের দুর্বলতায় রূপ নিতে পারে।

তথ্যসূত্র: ইস্ট এশিয়া ফোরাম

সম্পর্কিত