Chaarcha Logo
Chaarcha logo
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
০১ নভেম্বর, ২০২৬
০১ নভেম্বর, ২০২৬
Chaarcha logo
সংক্ষেপেকানেক্টম্যাগাজিন

আমরা

আমাদের সম্পর্কেযোগাযোগবিধিনিষেধ ও শর্তাবলিগোপনীয়তার নীতি
Chaarcha logo
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
০১ নভেম্বর, ২০২৬
০১ নভেম্বর, ২০২৬
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
Chaarcha logo
সর্বশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
আমরা
  • আমাদের সম্পর্কে
  • যোগাযোগ
  • বিধিনিষেধ ও শর্তাবলি
  • গোপনীয়তার নীতি
এক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণ

সম্পাদক: সোহরাব হাসান, প্রিন্টার্স বিল্ডিং (লেভেল–১৪), ৫ রাজউক অ্যাভিনিউ, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা–১০০০, বাংলাদেশ

|

স্বত্ব © চরচা

Chaarcha Logo
> বিশ্লেষণ

সৌদি-কুয়েত-কাতারের তেলের বিকল্প কি আছে?

কেয়া সরকার

কেয়া সরকার

প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০২৬, ১৫: ৫৬
সৌদি-কুয়েত-কাতারের তেলের বিকল্প কি আছে?
হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজ। ছবি: রয়টার্স

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে একযোগে ইরানে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল। এরপরই হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় ইরান। তখন থেকে তেল পরিবহনের জন্য কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটি কার্যত বন্ধ রয়েছে। তার প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক তেলের বাজারে। হরমুজের পর বাব-আল মান্দেব প্রণালিও ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হামলার মুখে পড়েছে।

Advertisement

বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ সাধারণত হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। অন্যদিকে বাব আল-মান্দেব প্রণালিও বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোর একটি। এটি লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথ। বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের প্রায় ৩০ শতাংশ এই পথ দিয়ে হয়।

ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান বলছে, এখন লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল ঝুঁকির মুখে পড়ায় বৈশ্বিক তেলের বাজারে চাপ আরও বাড়তে পারে। মার্চে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার পর সৌদি আরব উপসাগরীয় উপকূল থেকে তেল পাঠানোর পথ বদলে দেয়। দেশটি পূর্ব উপকূলের বদলে পশ্চিম উপকূলের ইয়ানবু বন্দরের মাধ্যমে লোহিত সাগর হয়ে তেল রপ্তানি শুরু করে। বর্তমানে সৌদি আরবের মোট অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ৭০ শতাংশের বেশি এই বন্দর দিয়েই যায়।

যে ৬ শর্তে হরমুজ খুলবে ইরানstrait of hormuz

ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের তথ্যমতে, সৌদি আরবের তেল সুয়েজ খাল বা মিশরের সুমেদ পাইপলাইন দিয়েও পরিবহন করা সম্ভব। তবে সেই পথও পুরোপুরি নিরাপদ নয়। ২৯ জুলাই সুয়েজের কাছে মিশরের দামিয়েত্তা বন্দরে একটি তেলবাহী জাহাজে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে।

Advertisement
Advertisement
Advertisement

ফলে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে যেসব পথে তেল বাইরে যায়, তার কোনোটিই এখন আর ঝুঁকির বাইরে নয়। আবার গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা হলেও জুলাই মাসে নিজেরাই পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু করে। ফলে সমঝোতা ভেস্তে যায়। ইসরায়েলও ইরানের সঙ্গে সমঝোতা চাইছে না বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে জানা গেছে।

গত বুধবার আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) তাদের মাসিক তেলবাজার প্রতিবেদনে বলেছে, ইরান যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে তেল উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হওয়ায় এ বছর বিশ্বে তেলের মোট চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকবে।

হরমুজ প্রণালি। ছবি: রয়টার্স
হরমুজ প্রণালি। ছবি: রয়টার্স

হরমুজ প্রণালি দিয়ে এখনো ট্যাংকার চলাচল সীমিত রয়েছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে তেল সরবরাহের ঘাটতি ইতোমধ্যে ১০০ কোটি ব্যারেল ছাড়িয়েছে।

এ ছাড়া বর্তমানে প্রতিদিন ১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। আইইএ বলেছে, এটি তেল সরবরাহে চরম সংকট তৈরি করেছে।

এমন পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে আসলে কবে নাগাদ সংঘাত থামবে আর তেল পরিবহন কবে স্বাভাবিক কবে হবে সেটি নিয়ে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে– উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ছাড়া কি বিশ্বের হাতে অন্য কোনো বিকল্প আছে কি না। আর কোনো বিকল্প থাকলেও তা কতখানি কার্যকর হবে তা নিয়েও বিশ্লেষকদের মনে সন্দেহ রয়েছে।

এখন পর্যন্ত কীভাবে সংকট সামলাচ্ছে বিশ্ব?

হরমুজকে আর কত দিন ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে ইরান?hormuz

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ব্যবসায়িক ম্যাগাজিন ফোর্বসের ভারতীয় সংস্করণ ‘ফোর্বস ইন্ডিয়ার’ এক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, চলমান পরিস্থিতি সত্ত্বেও বিশ্ব বড় ধরনের জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা এড়াতে পেরেছে।

ফোর্বস ইন্ডিয়া বলছে, ২০০২ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে তেলের দাম বেড়েছিল। তখন অনেকের মধ্যে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছিল যে, তেলের দাম হয়তো সবসময়ই বেশি থাকবে। কিন্তু সেই ধারণা বেশিদিন টেকেনি। ২০১৪ সালের পর তেলের দাম অনেক বেশি ওঠানামা করতে শুরু করে।

অনলাইন মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম দ্য গুডম্যান প্রজেক্ট এক প্রতিবেদনে বলেছে, গত মার্চে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার পরপরই যুক্তরাষ্ট্রসহ ৩০টিরও বেশি দেশের সঙ্গে সমন্বয় করে তাদের কৌশলগত তেল মজুত থেকে প্রায় ৪০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার ঘোষণা দেয় আইইএ।

এশিয়ার বিভিন্ন দেশও জ্বালানি সাশ্রয়ের নানা পদক্ষেপ নেয়। এর মধ্যে ছিল বাসা থেকে কাজের ব্যবস্থা, গাড়ি চালানোর ওপর বিধিনিষেধসহ বিভিন্ন উদ্যোগ।

বিকল্প তেলের সন্ধান শুরু

হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইরানের প্রধান তেল সরবরাহ বন্ধ হওয়ার পর কয়েক মাসে বিশ্বজুড়ে বিকল্প তেলের সন্ধান শুরু হয়। অনেক দেশের কাছেই জরুরি সময়ের জন্য তেলের মজুত ছিল। মার্চে আইইএ এসব মজুত থেকে তেল ছাড়ার উদ্যোগ নেয়। এতে বাজারে ৪০ কোটির বেশি ব্যারেল তেল আসে। এই পরিমাণ তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিক সরবরাহের প্রায় ২০ দিনের চাহিদা মেটাতে পারে।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা। ছবি: রয়টার্স
ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা। ছবি: রয়টার্স

দ্য গুডম্যান প্রজেক্ট বলছে, তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন তেল উৎপাদনকারী দেশ উৎপাদন বাড়ায়। বছরের প্রথম ছয় মাসে যুক্তরাষ্ট্র, ভেনেজুয়েলা ও নরওয়ে আগের সময়ের তুলনায় বেশি তেল উৎপাদন করে। আগে ইরাক ও সৌদি আরব থেকে তেল আমদানি করত, এমন দেশগুলোতে এসব অতিরিক্ত তেল যেতে শুরু করে।

উদাহরণ হিসেবে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল আমদানি দ্বিগুণ করে।

ইরাক ও সৌদিও প্রতিদিন ৬০ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল স্থলপথের পাইপলাইনের মাধ্যমে পাঠাতে শুরু করে। এসব পাইপলাইন আগে পুরোপুরি ব্যবহার করা হতো না। এর ফলে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল সরবরাহ করা সম্ভব হয়।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল আমদানিকারক চীনও বাজার স্থিতিশীল রাখতে ভূমিকা রাখে। যুদ্ধ শুরুর পর চীন তার কৌশলগত মজুতের জন্য তেল কেনা বন্ধ করে দেয়। একই সঙ্গে দেশের তেল শোধনাগারের জন্যও অপরিশোধিত তেল কেনা কমিয়ে দেয় এবং কয়েক মাস কিছু শোধনাগার বন্ধ রাখে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য চীন তেলের বদলে কয়লা ও সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ায়। এসব পদক্ষেপের ফলে প্রতিদিন আরও প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল বিশ্ববাজারের জন্য উন্মুক্ত হয়।

অন্যদিকে, দেশের দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিদেশি আমদানির ওপর চরম নির্ভরতা কমিয়ে আনার লক্ষ্যে ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত ‘ন্যাশনাল অফশোর এক্সপ্লোরেশন স্কিম’ বা ‘সমুদ্র মন্থন’ প্রকল্পের আওতায় ৮৪ হাজার ০৮৪ কোটি রুপির একটি বিশাল বাজেট অনুমোদন করেছে।

কম তেল ব্যবহার

দ্য গুডম্যান প্রজেক্টের তথ্য বলছে, বিশ্ব যখন মধ্যপ্রাচ্যের তেলের বিকল্প খুঁজছিল, তখন এশিয়ার তেলনির্ভর দেশগুলোও তেলের ব্যবহার কমাতে দ্রুত নানা পদক্ষেপ নেয়।

অনেক দেশ তেলজাত জ্বালানি ব্যবহার করে এমন কারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম কমিয়ে দেয়। এতে প্রতিদিন কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল তেলের চাহিদা কমে যায়।

কিছু দেশ বৈদ্যুতিক গাড়ির আমদানি বাড়ায়। আবার কেউ সৌর ও বায়ুশক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন শুরু করে। লক্ষ্য ছিল বিদেশি তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমানো।

তবে আমদানি করা তেলের বড় অংশই পরিবহন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। তাই সংকট মোকাবিলায় সাধারণ মানুষের তেল ব্যবহারের অভ্যাসেও পরিবর্তন আনতে হয়েছে।

শতাধিক দেশ জ্বালানি সাশ্রয়ের কোনো না কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে। কোথাও লিফট ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা দেওয়া হয়, আবার কোথাও মানুষ কখন গাড়ি চালাতে পারবে, সেটিও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়।

ফিলিপাইন, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা চার দিনের কর্ম সপ্তাহ চালু করে। মিয়ানমারে গাড়ির নম্বরপ্লেটের শেষ সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে এক দিন পরপর জ্বালানি চালিত গাড়ি চলার নিয়ম করা হয়।

বাংলাদেশে এয়ার কন্ডিশনারের তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে না রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম অনলাইনে স্থানান্তর করা হয়। এতে বিদ্যুতের চাহিদা কমে। অবশ্য বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানি করা তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ব্যবহার করা হয়, যার একটি বড় অংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে।

ইউরোপের কিছু ধনী দেশ আরও বড় পদক্ষেপ নিয়েছে। যেমন, নেদারল্যান্ডস নাগরিকদের পুরোনো গ্যাসচালিত গাড়ি দিয়ে বৈদ্যুতিক গাড়ি নেওয়ার সুযোগ দেয়। সুইডেন গণপরিবহনের ভাড়া অর্ধেক করেছে।

এসব জ্বালানি সাশ্রয়ের পদক্ষেপের কারণে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া ঠেকানো সম্ভব হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর ফলে আমদানিকারক দেশগুলো অন্য দেশ থেকে আরও তেল সংগ্রহ করার সময় পেয়েছে।

এগুলো এশিয়ার দেশগুলোকে দীর্ঘ সময় তেল রেশনিং করতেও বাধা দিয়েছে। ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটের সময় যুক্তরাষ্ট্রকে তেলের রেশনিং করতে হয়েছিল। সেটিই এর আগে বিশ্বের তেল সরবরাহে সবচেয়ে বড় সংকট ছিল।

অস্ট্রেলিয়ার তেল ও গ্যাসবিষয়ক বিশ্লেষক কেভিন মরিসন বলেন, ‘‘সরকারগুলো তেলের সরবরাহ ও চাহিদা–দুই দিকেই বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে বড় তেল আমদানিকারক দেশগুলোতে চাহিদা কমানোর দিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।’’ তিনি বলেন, ‘‘ভবিষ্যতে তেলের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় এ ধরনের পদক্ষেপ আরও বাড়তে পারে।’’

ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, স্বল্পমেয়াদে সহজ কোনো সমাধান না থাকায় এশিয়ার দেশগুলো এখন অন্য অঞ্চল থেকে তেল কেনার চেষ্টা করছে। চলতি বছরের শুরুতে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর প্রথমবারের মতো রাশিয়ার তেল কিনেছে বলে খবর প্রকাশিত হয়। রয়টার্সের তথ্যমতে, সর্বশেষ সংকট মোকাবিলায় চীনের তেল শোধনাগারগুলোও নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা রুশ তেল কেনা বাড়িয়েছে।

এসব কৌশল আর কতদিন চলবে?

শুরুতে যে ভয়াবহ পরিস্থিতির আশঙ্কা করা হয়েছিল, তা এখনো পুরোপুরি দেখা দেয়নি। তবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার কারণে পরিস্থিতি মোটেও সহজ নয়। সংকটের শুরুর দিকে, বিকল্প জ্বালানি সংগ্রহের আগেই এশিয়ার বিভিন্ন দেশে তেলের দাম বেড়ে যায় এবং সরবরাহে সমস্যা দেখা দেয়। এতে লাখ লাখ মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব পড়ে।

মিয়ানমারে জ্বালানির অভাবে ট্যাক্সিচালকেরা কাজ হারান। এমনকি জ্বালানি না থাকায় কিছু শ্মশানে দাহ কার্যক্রমও বন্ধ রাখতে হয়।

এশিয়ায় ধান রোপণের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সারের সংকট দেখা দেওয়ায় চলতি বছরের শেষ দিকে ফসল উৎপাদন কমে যেতে পারে। এর ফলে খাদ্যের দামও বাড়তে পারে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশে ইউরিয়া সারের দাম বেড়ে গেছে। এতে দেশে বড় ধরনের সার সংকটের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)। বাংলাদেশে যে ইউরিয়া সার ব্যবহার করা হয়, তার প্রায় ৮০ শতাংশই সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আমদানি করা হয়।

এমন পরিস্থিতিতে ডব্লিউএফপির আশঙ্কা, এই সংকট চলতে থাকলে দেশে প্রায় ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটের মুখে পড়তে পারে।

শুধু অপরিশোধিত তেল নয়, যুদ্ধের কারণে হিলিয়াম ও সালফারের মতো আরও কিছু রাসায়নিক দ্রব্যের সংকট দেখা দিয়েছে। এসবও হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। এর ফলে নিকেল থেকে শুরু করে সেমিকন্ডাক্টর পর্যন্ত বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, গত কয়েক মাসে তেলের বাজারে যে পরিবর্তন এসেছে, তার প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশেও পড়েছে, যদিও দেশটির কাছে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল তেল সরবরাহ রয়েছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তেল শোধনাগারগুলো বিমান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে বেশি জেট ফুয়েল উৎপাদন করেছে। ফলে গাড়িতে ব্যবহারের জন্য পেট্রল উৎপাদন কমেছে।

যুক্তরাষ্ট্র এখন গ্রীষ্মের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়ে প্রবেশ করছে। এ সময় দেশটির পেট্রলের মজুত গত ১০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম পর্যায়ে রয়েছে। শরতে এই মজুত আরও কমে যেতে পারে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে বেশি চাপের মধ্যে চলা তেল শোধনাগারগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের কাজ তখন করতে হবে।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি সামনে আরও খারাপ হতে পারে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে কিছুটা কমেছে ঠিকই, কিন্তু তেলের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে এখনো বড় ব্যবধান রয়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে চলতি বছরের শেষ দিকে বিশ্ব অর্থনীতিতে আবারও বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে।

র‍্যাপিডান এনার্জি গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা বব ম্যাকন্যালি বলেন, ‘‘প্রথম দফার সংকটের সময় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চুক্তি হবে–এমন আশায় তেলের বাজার পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক ধরে নিয়েছিল। কিন্তু এখন দ্বিতীয় দফার সংকট শুরু হয়েছে। প্রথম দফায় যেসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর বেশিরভাগের কার্যকারিতা এখন কমে গেছে অথবা সেগুলো আর নতুন কোনো সমাধান নয়।’’

বিশ্লেষকরা জানান, আগের কৌশলগুলো এখন প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। বেশিরভাগ দেশের জরুরি তেল মজুত প্রায় শেষের দিকে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেল মজুতও এত কমে গেছে যে, পুরোনো মজুত ব্যবস্থা নিয়ে চাপ তৈরি হচ্ছে।

অন্যদিকে, চীনও তেল কেনা প্রায় বন্ধ রাখার যে নীতি নিয়েছিল, তা শেষ করেছে। দেশটি আবার তেল শোধনাগারগুলোর জন্য তেল কেনা শুরু করেছে। ফলে সংকটের প্রথম দফায় বিশ্ব যে অতিরিক্ত তেলের মজুতকে নিরাপত্তা হিসেবে ব্যবহার করতে পেরেছিল, এবার সেই সুযোগ খুব কম।

আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। ছবি: রয়টার্স
আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। ছবি: রয়টার্স

আগস্ট মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, বিশ্ব তেল ও গ্যাস পরিবহনের ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা অনেকটাই কমিয়ে ফেলবে।

তার ভাষ্য, এখন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বুঝতে পারছে যে ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে রাজি নয় এবং দেশটি তাদের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। তাই বিশ্ববাজারে তেল-গ্যাসসহ জ্বালানি পণ্য কীভাবে ও কোন পথে পৌঁছাবে, সে ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।

অর্থনৈতিক গবেষক আহমেদ আবু কামার আল জাজিরাকে বলেন, ‘‘রুবিওর বক্তব্য এখনই বাস্তবায়ন করা সম্ভব– এমন কোনো অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নয়। বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি একটি কৌশলগত চিন্তা।’’

আবু কামার বলেন, ‘‘জ্বালানি বাজার মূলত চাহিদা ও সরবরাহের ওপর নির্ভর করে। তাই বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা আংশিক কমাতেও কয়েক দশক সময় এবং শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ লাগবে।’’

আবু কামারের মতে, সবচেয়ে বড় সমস্যা হবে প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্ষেত্রে। কারণ এলএনজি রপ্তানির পুরো ব্যবস্থাই হরমুজ প্রণালির ওপর অনেকটা নির্ভরশীল। এর মধ্যে রয়েছে গ্যাস তরল করার কারখানা, বিশেষ ধরনের গ্যাসবাহী জাহাজ এবং গ্যাস গ্রহণের বন্দর।

এই বিশ্লেষক সতর্ক করে বলেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলোকে বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস সংগ্রহের জন্য তীব্র প্রতিযোগিতায় নামতে হবে। এতে গ্যাসের দাম অনেক বেড়ে যেতে পারে। এর প্রভাব পড়বে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতিতে এবং বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোও বড় ধরনের সমস্যায় পড়বে।

যুদ্ধ গড়াল ছয় মাসে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আদৌ থামবে?Iran america war

আবার সমুদ্রপথ এড়িয়ে স্থলপথে তেল ও গ্যাস পরিবহনেরও বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে। আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে স্বাধীন জ্বালানি বিশ্লেষক জর্জ ভোলোশিন বলেন, তেল ও গ্যাসের পাইপলাইন এবং পাম্পিং স্টেশনগুলো নির্দিষ্ট জায়গায় স্থায়ীভাবে স্থাপন করা থাকে। তাই এগুলো ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সহজ লক্ষ্য হতে পারে। অতীতেও এমন হামলার কারণে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সমস্যা হয়েছে। সমুদ্রপথের ঝুঁকি এড়ালেও ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হবে না। বরং সেই ঝুঁকি স্থলভাগে চলে যাবে।

এদিকে, গত সপ্তাহের শেষে রাশিয়ার জ্বালানি খাতের আয় কমাতে কঠোর নিষেধাজ্ঞার একটি প্যাকেজ পাস করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট।

শুক্রবার পাস হওয়া ওই বিলের নাম ‘লিন্ডসে ও. গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অব ২০২৬’। এতে রাশিয়ার তেল ও গ্যাস আমদানি করা বড় দেশগুলোর পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।

বিলটি কার্যকর হলে রাশিয়ার জ্বালানি আমদানিকারক অন্তত পাঁচটি বড় দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এসব দেশের মধ্যে চীন ও ভারতও রয়েছে। এসব নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়াও উপসাগরীয় তেলের বিকল্প হয়ে উঠতে পারবে না বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

সব মিলিয়ে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তেলের জন্য উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমানোর চেষ্টা করছে। তবে ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে বিশ্ব জ্বালানি বাজারের এ বিকল্প পুরোপুরি তৈরি করা এখনো কঠিন বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

বিষয়: যুক্তরাষ্ট্রমধ্যপ্রাচ্যজ্বালানিহামলাইরান
Advertisement
সর্বশেষ
  • ১

    তাহসিফ ও দীপকে ‘ধাওয়া’ দিয়েছিল কারা?

  • ২

    সাংবাদিক নিধি রাজদানের সঙ্গে বিয়ে সারলেন কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর

  • ৩

    মিরপুরে ৩ মেট্রোস্টেশন বন্ধ, পুলিশের গাড়িতে আগুন

  • ৪

    ‘মাদরাসার সভাপতি-সেক্রেটারিও জানে না সেখানে কী পড়ানো হয়’

  • ৫

    ‘শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি পূরণে কোনো সরকারই দায়িত্ব পালন করেনি’

সম্পর্কিত
  • ইরান যুদ্ধ: বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছে উপসাগরীয় দেশগুলো

    ইরান যুদ্ধ: বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছে উপসাগরীয় দেশগুলো

    ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য এক কঠিন বাস্তবতা তৈরি করেছে। সামরিক শক্তি বৃদ্ধি, কূটনৈতিক তৎপরতা কিংবা হরমুজ প্রণালির বিকল্প জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা—কোনো উদ্যোগই এখন পর্যন্ত তাদের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি

  • এইচএসসির ফলাফলে বিপর্যয়, দায় কি শুধু শিক্ষার্থীর, নাকি রাষ্ট্রেরও?

    এইচএসসির ফলাফলে বিপর্যয়, দায় কি শুধু শিক্ষার্থীর, নাকি রাষ্ট্রেরও?

    গত ২২ বছরের মধ্যে চলতি বছর এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের জন্য প্রচলিত মূল্যায়ন ব্যবস্থা, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের অভাবকে দায়ী করছেন শিক্ষাবিদরা। তারা বলছেন, শিক্ষাদানের দুর্বলতার পাশাপাশি উত্তরপত্র মূল্যায়নের প্রথাগত পদ্ধতিও এই ফলাফলের জন্য দায়ী।

  • রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে পশ্চিম ইউরোপ

    রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে পশ্চিম ইউরোপ

    পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলো দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফ্রান্স, স্পেন ও পর্তুগালের মতো দেশে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ, তরুণ প্রজন্মের অসন্তোষ, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রচলিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আস্থাহীনতা ইউরোপের বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ

  • ইরান ও ইউক্রেন: যুদ্ধই গিলে খাবে ট্রাম্পকে!

    ইরান ও ইউক্রেন: যুদ্ধই গিলে খাবে ট্রাম্পকে!

    ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন ট্রাম্পের জন্য শুধু কংগ্রেসের আসনসংখ্যা নির্ধারণের লড়াই নয়; এটি তার পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর মার্কিন জনগণের মূল্যায়নেরও পরীক্ষা। ইউক্রেনের প্রতি অবস্থান পরিবর্তন, ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপ এবং শুল্কনীতির কারণে সৃষ্ট অসন্তোষ রিপাবলিকান ভোটব্যাংকেও প্রভ