ইরান যুদ্ধ আমেরিকার সামরিক শক্তি দুর্বল করছে: ইকোনমিস্ট
চরচা ডেস্ক
ইরান যুদ্ধ আমেরিকার সামরিক শক্তি দুর্বল করছে: ইকোনমিস্ট
চরচা ডেস্ক
প্রকাশ : ২০ মার্চ ২০২৬, ২১: ৩৩
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানির মূল্যের অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছে। ছবি: রয়টার্স
লেখার শিরোনামটি চরচার নিজস্ব নয়, এটি বিখ্যাত ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট তাদের একটি বিশ্লেষণমূলক নিবন্ধের শিরোনাম। ২০২৪ সালে মিউনিখ সিকিউরিটি কনফারেন্সে তৎকালীন সিনেটর জে ডি ভ্যান্স ঘোষণা করেছিলেন, “আমরা একটি অভাবের বিশ্বে বাস করি। পূর্ব ইউরোপে একটি যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে একটি যুদ্ধ এবং পূর্ব এশিয়ায় একটি সম্ভাব্য সংঘাত–এই সবগুলো সমর্থন করার মতো পর্যাপ্ত অস্ত্রশস্ত্র আমরা তৈরি করি না।”
মি. ভ্যান্স, এখন ভাইস প্রেসিডেন্ট। তিনি সে দিন ঠিকই বলেছিলেন। তার বস ডোনাল্ড ট্রাম্প যে ইরানে যুদ্ধ শুরু করেছেন, তা ইতোমধ্যেই অতিরিক্ত চাপে থাকা আমেরিকান সশস্ত্র বাহিনীর ওপর আরও চাপ বাড়াবে। ফলে তারা এশিয়ায় সম্ভাব্য সংঘাতের জন্য কম প্রস্তুত থাকবে। অপারেশন ‘এপিক ফিউরি’-এর প্রভাব বহু বছর স্থায়ী হতে পারে। আর এটাই ইরানের দুই মিত্র চীন ও রাশিয়ার চাওয়া। আমেরিকা সামরিক দিক দিয়ে দুর্বল হলে তার অর্থনীতি কতদিন শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে পারবে বলা কঠিন।
কলোরাডোর পেইন ইনস্টিটিউট অব পাবলিক পলিসির জাহারা মাতিসেক, মরগান বাজিলিয়ান ও ম্যাকডোনাল্ড আমোয়ারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম চার দিনে যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত বিভিন্ন ধরনের ৫ হাজারের কিছু বেশি অস্ত্র ব্যবহার করেছে এবং প্রথম ১৬ দিনে প্রায় ১১ হাজার অস্ত্র ব্যবহার করেছে। তাদের মতে, এতে ‘এপিক ফিউরি’ আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে তীব্র প্রাথমিক বিমান হামলা অভিযানে পরিণত হয়েছে, যা ২০১১ সালে লিবিয়ায় ন্যাটোর প্রথম তিন দিনের বোমা হামলাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
আমেরিকান ও ইসরায়েলি বিমানগুলো যখন ইরানের আকাশ নিয়ন্ত্রণে নেয়, দেশটির বিমান প্রতিরক্ষা ধ্বংস করে–তখন তারা লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি গিয়ে স্বল্প-পাল্লার বোমা ব্যবহার করতে পারে, যা সস্তা এবং প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়, আমেরিকার কাছে কয়েক হাজারের বেশি জেড্যাম রয়েছে, যা সাধারণত বোমায় লাগানো একটি নির্দেশনাযন্ত্র।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী পিট হেগসেথ গর্ব করে বলেন, “আমাদের প্রায় সীমাহীন মজুত আছে।” এর সত্যতা নিয়ে বড় প্রশ্ন আছে। সংঘাতের দুই সপ্তাহ পর পেন্টাগনের অনুমান, ইরানে ব্যবহৃত ৯৯% অস্ত্রই এই ধরনের। সমস্যাটি মূলত এর আগেই ব্যবহৃত অস্ত্রগুলোর ক্ষেত্রে।
যুদ্ধের প্রথম ছয় দিনে, যখন আমেরিকান বিমানগুলোকে দূরত্ব বজায় রাখতে হচ্ছিল, তখন ওয়াশিংটনের থিংক-ট্যাঙ্ক সিএসআইএস-এর মতে, এক হাজারের বেশি দুষ্প্রাপ্য ও ব্যয়বহুল ‘স্ট্যান্ড-অফ’ অস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। এ ছাড়া শত শত মাঝারি-পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং অ্যান্টি-রেডিয়েশন মিসাইল–যেগুলো বিমান প্রতিরক্ষার রাডারকে লক্ষ্য করে ব্যবহার করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এসবের মজুদ অনেক কম, যদিও সঠিক সংখ্যা গোপন রাখা হয়েছে।
এর চেয়েও বড় সমস্যা হলো বিমান প্রতিরক্ষা। ইরানের প্রাথমিক ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোন হামলা আমেরিকা ও তার মিত্রদের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্র বা ইনসেপ্টর ব্যবহার করতে বাধ্য করেছে। যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহে, ধারণা করা হয় আমেরিকা প্রায় ১৪০টি প্যাট্রিয়ট এবং ১৫০টির বেশি থাড ইনসেপ্টর ব্যবহার করেছে।
মজুত আগেই কম ছিল। গত বছর ইসরায়েলকে রক্ষার সময় আমেরিকা তার থাড-এর এক-চতুর্থাংশ ব্যবহার করেছিল বলে জানা যায়। সিএসআইএস-এর মার্ক ক্যানসিয়ান ইকোনমিস্টকে বলেন, “আমাদের কাছে চালিয়ে যাওয়ার মতো প্যাট্রিয়ট আছে। কিন্তু প্রতিটি ব্যবহারের মানে হলো ইউক্রেন বা পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের জন্য একটি কমে যাওয়া।” এসব পুনরায় পূরণ করতে বছর লেগে যাবে।
মাতিসেক, বাজিলিয়ান ও আমোয়ার মতে, শুধু প্রথম চার দিনের ব্যবহৃত অস্ত্র প্রতিস্থাপনে ২০ থেকে ২৬ বিলিয়ন ডলার লাগবে। তবে সমস্যা খরচ নয়, বরং অভাব। ধারণা করা হয়, যুদ্ধের শুরুতে আমেরিকা ৩০০টির বেশি টমাহক ক্রুজ মিসাইল ব্যবহার করেছে, কিন্তু বর্তমান অর্থবছরে পেন্টাগন মাত্র ৫৭টি নতুন কেনার পরিকল্পনা করেছিল।
২০২৩ সালের পর থেকে কোনো থাড ইনসেপ্টর সরবরাহ হয়নি এবং এ বছর নতুন অর্ডারও দেওয়া হয়নি। ২০২৭ সালে মাত্র ৩৯টি সরবরাহের পরিকল্পনা আছে, অর্ডার দেওয়ার ছয় বছর পর। পেন্টাগনের বড় পরিকল্পনা রয়েছে দীর্ঘ মেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর। তারা টমাহক উৎপাদন বছরে ৬০ থেকে এক হাজারে এবং পিএসি-৩ এমএসই ৬০০ থেকে দুই হাজারে উন্নীত করতে চায়। কিন্তু কংগ্রেস এখনো এর অর্থায়নে সম্মত হয়নি।
এ ছাড়া অস্ত্র সরবরাহ শৃঙ্খল জটিল ও ধীর। ক্ষেপণাস্ত্রের ইঞ্জিন এর উদাহরণ। কিছু উপাদান: যেমন প্রপেল্যান্ট মাত্র এক বা দুটি কোম্পানি সরবরাহ করে, তাও দীর্ঘ অপেক্ষার পর। অন্যান্য উপাদানে চীনের নিয়ন্ত্রিত গুরুত্বপূর্ণ খনিজ প্রয়োজন। মাতিসেক, বাজিলিয়ান ও আমোয়া বলেন, “কংগ্রেস রাতারাতি ২৬ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দিতে পারে। কিন্তু গ্যালিয়াম, নিওডিমিয়াম বা অ্যামোনিয়াম পারক্লোরেট তৈরি করতে পারে না।”
ইরানের যুদ্ধে খুব কম ড্রোন, জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান বা ফাইটার জেট হারিয়েছে; বরং ক্ষয়ক্ষতিই বড় উদ্বেগ। এটি সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে মার্কিন নৌবাহিনীতে। আমেরিকার ১১টি বড় বিমানবাহী রণতরী আছে, কিন্তু একসঙ্গে অল্প কয়েকটি সক্রিয় থাকে। ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ও ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড এখন এপিক ফিউরিতে যুক্ত এবং ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ আসছে বলে ধারণা করা হয়। ফোর্ড প্রায় ২৭০ দিন সমুদ্রে রয়েছে।
এপ্রিলের মাঝামাঝি ফোর্ড ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর সবচেয়ে দীর্ঘ মোতায়েনের রেকর্ড ভাঙবে। দুই মাস পর, যদি তখনো মোতায়েন থাকে, তবে এটি ১৯৭৩ সালের ইউএসএস মিডওয়ের রেকর্ডও ছাড়াবে।
ক্ষয়ের সঙ্গে লড়াই
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ স্পষ্ট। নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, এই মাসে ফোর্ডে ৩০ ঘণ্টার অগ্নিকাণ্ড ঘটে, ফলে ৬০০-এর বেশি নাবিকের থাকার জায়গা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এত দীর্ঘ মোতায়েনের প্রভাব যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও থাকবে।
সাবেক পেন্টাগন কর্মকর্তা জো কস্তা বলেন, “এটা যেন তেল পরিবর্তন ছাড়া কয়েক মাস ধরে ঘণ্টায় ২০০ মাইল গতিতে গাড়ি চালানোর মতো।” এতে রক্ষণাবেক্ষণের ‘বিশাল জট’ তৈরি হয়।
সিন্যাস-এর স্টেসি পেটিজন বলেন, বর্তমান কার্যক্রমের গতি আগামী দুই থেকে তিন বছর কিছু অঞ্চলে ‘ক্যারিয়ার ঘাটতি’ তৈরি করতে পারে। তখন আমেরিকা সেখানে রণতরী মোতায়েন করতে পারবে না। কর্মীরাও ক্লান্ত। দীর্ঘ মোতায়েন পরিবারে চাপ সৃষ্টি করে, যা আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়ায়। তবে যুদ্ধ পুরোপুরি খারাপ নয়।
সাবেক পেন্টাগন কর্মকর্তা মাইক হোরোভিটজ তিনটি ইতিবাচক দিক তুলে ধরেন। প্রথমত, নতুন সস্তা অস্ত্র–যেমন লুকাস ড্রোন, যা দ্রুত উৎপাদন করা যায়। দ্বিতীয়ত, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা, “যা যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বড় পার্থক্য তৈরি করে।” তৃতীয়ত, লক্ষ্য নির্ধারণ ও কমান্ডে আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের বিস্তৃত প্রয়োগ।
তবে হোরোভিটজ নিশ্চিত নন এই সুবিধাগুলো দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির চেয়ে বেশি কি না। বরং নতুন অস্ত্র পরীক্ষা ও অভিজ্ঞতা অর্জনও ঝুঁকি তৈরি করে।
জো কস্তা বলেন, “আমরা আমাদের কৌশল চীনের সামনে প্রকাশ করছি। চীনারা শিখবে আমরা কীভাবে মাইন অপসারণ করি। তারা সময় ও কৌশল বুঝে নেবে এবং প্রয়োজনে তাইওয়ানে তা ব্যবহার করবে।”
ভ্যান্স ও ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠরা বলেছিলেন, ২০০১ সালের পর মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে আমেরিকা অনেক ক্ষতি করেছে এবং ভবিষ্যৎ চীনের সঙ্গে সংঘাতের জন্য সম্পদ সংরক্ষণ করা উচিত। কিন্তু ইরান যুদ্ধ এশিয়ার বাহিনীকে দুর্বল করছে। জাপান থেকে মেরিন ইউনিট সরানো হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া থেকে থাড সরানো হয়েছে এবং ভবিষ্যতের প্রস্তুতিও কমিয়ে দিচ্ছে।
সিএসআইএস-এর টম কারাকো বলেন, “এই পরিস্থিতিকে লুকানোর কোনো উপায় নেই। সাম্প্রতিক অস্ত্রব্যয়ের পরিমাণ এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষার দুর্বলতা এই দশকের বাকি সময়ে প্রশান্ত মহাসাগরে প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে।”
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানির মূল্যের অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছে। ছবি: রয়টার্স
লেখার শিরোনামটি চরচার নিজস্ব নয়, এটি বিখ্যাত ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট তাদের একটি বিশ্লেষণমূলক নিবন্ধের শিরোনাম। ২০২৪ সালে মিউনিখ সিকিউরিটি কনফারেন্সে তৎকালীন সিনেটর জে ডি ভ্যান্স ঘোষণা করেছিলেন, “আমরা একটি অভাবের বিশ্বে বাস করি। পূর্ব ইউরোপে একটি যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে একটি যুদ্ধ এবং পূর্ব এশিয়ায় একটি সম্ভাব্য সংঘাত–এই সবগুলো সমর্থন করার মতো পর্যাপ্ত অস্ত্রশস্ত্র আমরা তৈরি করি না।”
মি. ভ্যান্স, এখন ভাইস প্রেসিডেন্ট। তিনি সে দিন ঠিকই বলেছিলেন। তার বস ডোনাল্ড ট্রাম্প যে ইরানে যুদ্ধ শুরু করেছেন, তা ইতোমধ্যেই অতিরিক্ত চাপে থাকা আমেরিকান সশস্ত্র বাহিনীর ওপর আরও চাপ বাড়াবে। ফলে তারা এশিয়ায় সম্ভাব্য সংঘাতের জন্য কম প্রস্তুত থাকবে। অপারেশন ‘এপিক ফিউরি’-এর প্রভাব বহু বছর স্থায়ী হতে পারে। আর এটাই ইরানের দুই মিত্র চীন ও রাশিয়ার চাওয়া। আমেরিকা সামরিক দিক দিয়ে দুর্বল হলে তার অর্থনীতি কতদিন শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে পারবে বলা কঠিন।
কলোরাডোর পেইন ইনস্টিটিউট অব পাবলিক পলিসির জাহারা মাতিসেক, মরগান বাজিলিয়ান ও ম্যাকডোনাল্ড আমোয়ারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম চার দিনে যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত বিভিন্ন ধরনের ৫ হাজারের কিছু বেশি অস্ত্র ব্যবহার করেছে এবং প্রথম ১৬ দিনে প্রায় ১১ হাজার অস্ত্র ব্যবহার করেছে। তাদের মতে, এতে ‘এপিক ফিউরি’ আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে তীব্র প্রাথমিক বিমান হামলা অভিযানে পরিণত হয়েছে, যা ২০১১ সালে লিবিয়ায় ন্যাটোর প্রথম তিন দিনের বোমা হামলাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
আমেরিকান ও ইসরায়েলি বিমানগুলো যখন ইরানের আকাশ নিয়ন্ত্রণে নেয়, দেশটির বিমান প্রতিরক্ষা ধ্বংস করে–তখন তারা লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি গিয়ে স্বল্প-পাল্লার বোমা ব্যবহার করতে পারে, যা সস্তা এবং প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়, আমেরিকার কাছে কয়েক হাজারের বেশি জেড্যাম রয়েছে, যা সাধারণত বোমায় লাগানো একটি নির্দেশনাযন্ত্র।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী পিট হেগসেথ গর্ব করে বলেন, “আমাদের প্রায় সীমাহীন মজুত আছে।” এর সত্যতা নিয়ে বড় প্রশ্ন আছে। সংঘাতের দুই সপ্তাহ পর পেন্টাগনের অনুমান, ইরানে ব্যবহৃত ৯৯% অস্ত্রই এই ধরনের। সমস্যাটি মূলত এর আগেই ব্যবহৃত অস্ত্রগুলোর ক্ষেত্রে।
যুদ্ধের প্রথম ছয় দিনে, যখন আমেরিকান বিমানগুলোকে দূরত্ব বজায় রাখতে হচ্ছিল, তখন ওয়াশিংটনের থিংক-ট্যাঙ্ক সিএসআইএস-এর মতে, এক হাজারের বেশি দুষ্প্রাপ্য ও ব্যয়বহুল ‘স্ট্যান্ড-অফ’ অস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। এ ছাড়া শত শত মাঝারি-পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং অ্যান্টি-রেডিয়েশন মিসাইল–যেগুলো বিমান প্রতিরক্ষার রাডারকে লক্ষ্য করে ব্যবহার করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এসবের মজুদ অনেক কম, যদিও সঠিক সংখ্যা গোপন রাখা হয়েছে।
এর চেয়েও বড় সমস্যা হলো বিমান প্রতিরক্ষা। ইরানের প্রাথমিক ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোন হামলা আমেরিকা ও তার মিত্রদের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্র বা ইনসেপ্টর ব্যবহার করতে বাধ্য করেছে। যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহে, ধারণা করা হয় আমেরিকা প্রায় ১৪০টি প্যাট্রিয়ট এবং ১৫০টির বেশি থাড ইনসেপ্টর ব্যবহার করেছে।
মজুত আগেই কম ছিল। গত বছর ইসরায়েলকে রক্ষার সময় আমেরিকা তার থাড-এর এক-চতুর্থাংশ ব্যবহার করেছিল বলে জানা যায়। সিএসআইএস-এর মার্ক ক্যানসিয়ান ইকোনমিস্টকে বলেন, “আমাদের কাছে চালিয়ে যাওয়ার মতো প্যাট্রিয়ট আছে। কিন্তু প্রতিটি ব্যবহারের মানে হলো ইউক্রেন বা পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের জন্য একটি কমে যাওয়া।” এসব পুনরায় পূরণ করতে বছর লেগে যাবে।
মাতিসেক, বাজিলিয়ান ও আমোয়ার মতে, শুধু প্রথম চার দিনের ব্যবহৃত অস্ত্র প্রতিস্থাপনে ২০ থেকে ২৬ বিলিয়ন ডলার লাগবে। তবে সমস্যা খরচ নয়, বরং অভাব। ধারণা করা হয়, যুদ্ধের শুরুতে আমেরিকা ৩০০টির বেশি টমাহক ক্রুজ মিসাইল ব্যবহার করেছে, কিন্তু বর্তমান অর্থবছরে পেন্টাগন মাত্র ৫৭টি নতুন কেনার পরিকল্পনা করেছিল।
২০২৩ সালের পর থেকে কোনো থাড ইনসেপ্টর সরবরাহ হয়নি এবং এ বছর নতুন অর্ডারও দেওয়া হয়নি। ২০২৭ সালে মাত্র ৩৯টি সরবরাহের পরিকল্পনা আছে, অর্ডার দেওয়ার ছয় বছর পর। পেন্টাগনের বড় পরিকল্পনা রয়েছে দীর্ঘ মেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর। তারা টমাহক উৎপাদন বছরে ৬০ থেকে এক হাজারে এবং পিএসি-৩ এমএসই ৬০০ থেকে দুই হাজারে উন্নীত করতে চায়। কিন্তু কংগ্রেস এখনো এর অর্থায়নে সম্মত হয়নি।
এ ছাড়া অস্ত্র সরবরাহ শৃঙ্খল জটিল ও ধীর। ক্ষেপণাস্ত্রের ইঞ্জিন এর উদাহরণ। কিছু উপাদান: যেমন প্রপেল্যান্ট মাত্র এক বা দুটি কোম্পানি সরবরাহ করে, তাও দীর্ঘ অপেক্ষার পর। অন্যান্য উপাদানে চীনের নিয়ন্ত্রিত গুরুত্বপূর্ণ খনিজ প্রয়োজন। মাতিসেক, বাজিলিয়ান ও আমোয়া বলেন, “কংগ্রেস রাতারাতি ২৬ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দিতে পারে। কিন্তু গ্যালিয়াম, নিওডিমিয়াম বা অ্যামোনিয়াম পারক্লোরেট তৈরি করতে পারে না।”
ইরানের যুদ্ধে খুব কম ড্রোন, জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান বা ফাইটার জেট হারিয়েছে; বরং ক্ষয়ক্ষতিই বড় উদ্বেগ। এটি সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে মার্কিন নৌবাহিনীতে। আমেরিকার ১১টি বড় বিমানবাহী রণতরী আছে, কিন্তু একসঙ্গে অল্প কয়েকটি সক্রিয় থাকে। ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ও ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড এখন এপিক ফিউরিতে যুক্ত এবং ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ আসছে বলে ধারণা করা হয়। ফোর্ড প্রায় ২৭০ দিন সমুদ্রে রয়েছে।
এপ্রিলের মাঝামাঝি ফোর্ড ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর সবচেয়ে দীর্ঘ মোতায়েনের রেকর্ড ভাঙবে। দুই মাস পর, যদি তখনো মোতায়েন থাকে, তবে এটি ১৯৭৩ সালের ইউএসএস মিডওয়ের রেকর্ডও ছাড়াবে।
ক্ষয়ের সঙ্গে লড়াই
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ স্পষ্ট। নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, এই মাসে ফোর্ডে ৩০ ঘণ্টার অগ্নিকাণ্ড ঘটে, ফলে ৬০০-এর বেশি নাবিকের থাকার জায়গা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এত দীর্ঘ মোতায়েনের প্রভাব যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও থাকবে।
সাবেক পেন্টাগন কর্মকর্তা জো কস্তা বলেন, “এটা যেন তেল পরিবর্তন ছাড়া কয়েক মাস ধরে ঘণ্টায় ২০০ মাইল গতিতে গাড়ি চালানোর মতো।” এতে রক্ষণাবেক্ষণের ‘বিশাল জট’ তৈরি হয়।
সিন্যাস-এর স্টেসি পেটিজন বলেন, বর্তমান কার্যক্রমের গতি আগামী দুই থেকে তিন বছর কিছু অঞ্চলে ‘ক্যারিয়ার ঘাটতি’ তৈরি করতে পারে। তখন আমেরিকা সেখানে রণতরী মোতায়েন করতে পারবে না। কর্মীরাও ক্লান্ত। দীর্ঘ মোতায়েন পরিবারে চাপ সৃষ্টি করে, যা আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়ায়। তবে যুদ্ধ পুরোপুরি খারাপ নয়।
সাবেক পেন্টাগন কর্মকর্তা মাইক হোরোভিটজ তিনটি ইতিবাচক দিক তুলে ধরেন। প্রথমত, নতুন সস্তা অস্ত্র–যেমন লুকাস ড্রোন, যা দ্রুত উৎপাদন করা যায়। দ্বিতীয়ত, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা, “যা যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বড় পার্থক্য তৈরি করে।” তৃতীয়ত, লক্ষ্য নির্ধারণ ও কমান্ডে আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের বিস্তৃত প্রয়োগ।
তবে হোরোভিটজ নিশ্চিত নন এই সুবিধাগুলো দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির চেয়ে বেশি কি না। বরং নতুন অস্ত্র পরীক্ষা ও অভিজ্ঞতা অর্জনও ঝুঁকি তৈরি করে।
জো কস্তা বলেন, “আমরা আমাদের কৌশল চীনের সামনে প্রকাশ করছি। চীনারা শিখবে আমরা কীভাবে মাইন অপসারণ করি। তারা সময় ও কৌশল বুঝে নেবে এবং প্রয়োজনে তাইওয়ানে তা ব্যবহার করবে।”
ভ্যান্স ও ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠরা বলেছিলেন, ২০০১ সালের পর মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে আমেরিকা অনেক ক্ষতি করেছে এবং ভবিষ্যৎ চীনের সঙ্গে সংঘাতের জন্য সম্পদ সংরক্ষণ করা উচিত। কিন্তু ইরান যুদ্ধ এশিয়ার বাহিনীকে দুর্বল করছে। জাপান থেকে মেরিন ইউনিট সরানো হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া থেকে থাড সরানো হয়েছে এবং ভবিষ্যতের প্রস্তুতিও কমিয়ে দিচ্ছে।
সিএসআইএস-এর টম কারাকো বলেন, “এই পরিস্থিতিকে লুকানোর কোনো উপায় নেই। সাম্প্রতিক অস্ত্রব্যয়ের পরিমাণ এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষার দুর্বলতা এই দশকের বাকি সময়ে প্রশান্ত মহাসাগরে প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে।”