Advertisement Banner

ডলারের দাপট টলছে, ইউয়ানের উত্থান

উইলিয়াম পেসেক
উইলিয়াম পেসেক
ডলারের দাপট টলছে, ইউয়ানের উত্থান
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

বিশ্ব অর্থনীতির ইতিহাসে এমন কিছু সময় আসে, যখন দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত শক্তির ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে ওঠে এবং বিকল্প শক্তির উত্থানের সম্ভাবনা স্পষ্ট হতে শুরু করে। বর্তমান বৈশ্বিক আর্থিক প্রেক্ষাপট ঠিক তেমনই এক সন্ধিক্ষণ। যুক্তরাষ্ট্রের ডলার, যা বহু দশক ধরে বিশ্বের প্রধান ‘সেফ হেভেন’ বা নিরাপদ বিনিয়োগের আশ্রয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত–তা এখন নানা কারণে চাপে রয়েছে। আর সেই ফাঁক পূরণের সম্ভাব্য দাবিদার হিসেবে ধীরে ধীরে উঠে আসছে চীনের ইউয়ান।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি ও সিদ্ধান্তগুলো এই পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। তার আরোপিত শুল্কনীতি, বাণিজ্যযুদ্ধ, এবং মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকায় আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতি– সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। শুধু তাই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর তার প্রকাশ্য চাপ এবং সমালোচনা ডলারের বিশ্বাসযোগ্যতাকেও প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

ডলারের এই ‘অতিরিক্ত সুবিধা’–যাকে একসময় ফরাসি অর্থমন্ত্রী ভ্যালেরি জিসকার দ’এস্তাঁ ‘মাত্রাতিরিক্ত সুবিধা’ বলেছিলেন–তা মূলত যুক্তরাষ্ট্রকে এমন সুযোগ দেয়, যেখানে তারা বিপুল ঋণ নিয়েও তুলনামূলক কম সুদে তা পরিচালনা করতে পারে। কিন্তু যখন সেই দেশের নীতি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা কমতে শুরু করে, তখন এই সুবিধাও ঝুঁকির মুখে পড়ে। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, বিদেশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের পরিমাণ কমে ২০১২ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। এটি নিছক অর্থনৈতিক সমন্বয় নয়; বরং একটি গভীর অনাস্থার সংকেত।

এই প্রেক্ষাপটে চীন নিজেকে একটি বিকল্প নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে। চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং-এর নেতৃত্বে চীন গত এক দশক ধরে ইউয়ানকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে সেই প্রচেষ্টার কিছু ফল দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ইউয়ান-ভিত্তিক বন্ড বা সরকারি ঋণপত্র এখন অনেক বিনিয়োগকারীর কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।

চীনের পক্ষে এই মুহূর্তে একটি বড় সুবিধা হলো জ্বালানি নিরাপত্তা। যখন মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা তেলের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে, তখন চীনের বিশাল কৌশলগত তেল মজুত এবং রাশিয়ার সঙ্গে সাশ্রয়ী জ্বালানি সম্পর্ক তাকে তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত রাখছে। এছাড়া ইরানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কারণে হরমুজ প্রণালীর মতো স্পর্শকাতর পথেও চীনের জাহাজ চলাচল কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকে। ফলে জ্বালানি-নির্ভর অর্থনীতির ঝুঁকি কম থাকায় ইউয়ানভিত্তিক সম্পদ তুলনামূলক স্থিতিশীল বলে মনে হচ্ছে।

তবে এই উত্থান একেবারেই বাধাহীন নয়। চীনের আর্থিক ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এখনো প্রশ্নের মুখে। ইউয়ান পুরোপুরি রূপান্তরযোগ্য নয়, অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে এর ব্যবহার এখনো সীমিত। উপরন্তু, চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিয়েও সংশয় রয়েছে। এসব কারণে অনেক বিনিয়োগকারী এখনো পুরোপুরি চীনের ওপর নির্ভর করতে দ্বিধায় ভোগেন।

এর পাশাপাশি চীনের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জও কম নয়। দীর্ঘস্থায়ী সম্পত্তি খাতের সংকট, ভোক্তা ব্যয়ের স্থবিরতা এবং মুদ্রাস্ফীতির বদলে মূল্যপতনের (deflation) আশঙ্কা–এসবই অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। চীনের প্রায় ৭০ শতাংশ পারিবারিক সম্পদ রিয়েল এস্টেটে বিনিয়োগ করা–এই বাস্তবতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার শুধু নীতিগত পরিবর্তনের ওপর নয়, বরং কাঠামোগত সংস্কারের ওপর নির্ভর করছে।

তবুও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে চীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা রয়েছে। তার আর্থিক বাজার তুলনামূলকভাবে ‘আলাদা’। চীনের সরকারি বন্ডের বড় অংশই দেশীয় বিনিয়োগকারীদের হাতে, ফলে হঠাৎ করে বিদেশি পুঁজি বেরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কম। এই বৈশিষ্ট্য ইউয়ানকে একটি ‘স্থিতিশীল’ বিকল্প হিসেবে তুলে ধরছে, বিশেষ করে এমন এক সময়ে যখন বিশ্বজুড়ে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ছে।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সমস্যা শুধু অর্থনীতির নয়; বরং প্রতিষ্ঠানগত আস্থারও। যখন প্রেসিডেন্ট প্রকাশ্যে বিচারব্যবস্থা, গণমাধ্যম, কংগ্রেস এবং অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের সমালোচনা করেন, তখন তা শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় থাকে না। বরং বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি সতর্ক সংকেত হয়ে ওঠে। ডলারের শক্তি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে; সেই বিশ্বাস ক্ষয়ে গেলে মুদ্রাটির অবস্থানও দুর্বল হয়ে পড়ে।

ইউরোপের ক্ষেত্রেও একটি পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘আমেরিকা প্রথম’ নীতির ফলে ইউরোপ নিজেদের প্রতিরক্ষা ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। এর ফলে ইউরোপীয় অর্থনীতিও নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করছে এবং বিনিয়োগকারীরা বিকল্প বাজার হিসেবে ইউরোপকে বিবেচনা করছেন। ফলে বৈশ্বিক পুঁজি প্রবাহ এখন আর একমুখী নয়; বরং বহুমুখী হয়ে উঠছে।

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ইঙ্গিত হলো–বিশ্ব অর্থনীতি ধীরে ধীরে একমেরু থেকে বহুমেরু কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে। যেখানে আগে ডলার ছিল একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়, সেখানে এখন ইউয়ান, ইউরোসহ একাধিক বিকল্প সামনে আসছে। যদিও ইউয়ান এখনো পুরোপুরি সেই জায়গা দখল করতে পারেনি। তবে তার সম্ভাবনা অস্বীকার করার উপায় নেই।

সবশেষে বলা যায়, ডলারের বর্তমান দুর্বলতা যেমন যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফল, তেমনি ইউয়ানের সম্ভাব্য উত্থানও চীনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের ফল। কিন্তু এই প্রতিযোগিতার ফল নির্ভর করবে একটি মৌলিক বিষয়ের ওপর–বিশ্বাস। যে দেশ তার অর্থনীতি, প্রতিষ্ঠান ও নীতিতে স্থিতিশীলতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারবে, শেষ পর্যন্ত তার মুদ্রাই হবে বিশ্বের প্রধান আশ্রয়।

এই মুহূর্তে বিশ্ব অর্থনীতি যেন এক নতুন সমীকরণের দিকে এগোচ্ছে। যেখানে পুরনো শক্তির দাপট কমছে, আর নতুন শক্তি নিজেদের জায়গা করে নিতে প্রস্তুত হচ্ছে। তবে এই রূপান্তর হবে ধীর, জটিল এবং অনিশ্চিত–যেমনটা ইতিহাসে সব বড় পরিবর্তনের ক্ষেত্রেই দেখা গেছে।

লেখক: টোকিও ভিত্তিক সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

(লেখাটি এশিয়া টাইমস অবলম্বনে)

সম্পর্কিত