রাজধানীর খিলক্ষেত-ভাটারা এলাকায় পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আবদুল্লাহ আল জহিরের ‘গোল্ডেন সানরাইজ’ নামের বাড়িতে সপ্তাহে দুই-তিন রাতে পার্টি হতো বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। আর পুলিশ বলছে, ওই বাড়িতে মাদক সেবনসহ অন্যান্য কর্মকাণ্ড থেকে যে আয় হতো তার ৭০ শতাংশ পেতেন ডিআইজি আব্দুল্লাহ।
গত সোমবার ‘গোল্ডেন সানরাইজ’ নামের ওই বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ডিজে পার্টি ও মাদক সেবনের অভিযোগে ৮৪ জনকে আটক করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ডিবি উত্তরা বিভাগের এই অভিযানে উদ্ধার করা হয়, বিপুল পরিমাণ ইয়াবা, আইস, সিসা, মদ, গাঁজা, কুশ ও মাদক সেবনের বিভিন্ন সরঞ্জামা।
ওই বাড়ির মালিক ২৪তম বিসিএসের পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল জহির। তিনি পুলিশ সদর দপ্তরের রিঅ্যার অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স শাখার অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) ছিলেন। গতকাল মঙ্গলবার এক অফিস আদেশে তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও এলাকার নিরাপত্তা প্রহরী মেহেদী চরচাকে বলেন, “সেখানে সপ্তাহে দুই-তিন দিন রাতে পার্টি করা হতো এবং বেশ কিছু দামি গাড়ি আসত।”
এলাকার রাজমিস্ত্রি মইদুল ইসলাম চরচাকে জানান, “ওই বাড়িতে নিয়মিত তরুণ-তরুণীদের যাতায়াত ছিল এবং ভেতরে মদ্যপানের পাশাপাশি অসামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো। অনেক দামি দামি গাড়ি আসত সবসময়। গাড়ি থেকে তরুণ যুবক-যুবতী নেমে বাড়িতে ঢুকতো সন্ধ্যার পরে। বের হতো পরদিন সকালে।”
আয়ের ৭০ শতাংশ পেতেন পুলিশ কর্মকর্তা
ডিবির উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার ইলিয়াস কবির চরচাকে বলেন, “বাসাটি এয়ারবিএনবির মাধ্যমে মূলত একজন হোস্ট ও কো-হোস্ট দিয়ে পরিচালিত হতো। আটক কো-হোস্ট মাহবুবুল আলম জিজ্ঞাসাবাদে জানান, আতিথেয়তা ব্যবসা থেকে অর্জিত মোট আয়ের ৭০ শতাংশ পেতেন অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহির এবং বাকি ৩০ শতাংশ পেতেন কো-হোস্ট নিজে। সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই এই অভিযান পরিচালনা করা হয়।”
গোল্ডেন সানরাইজে আগত অতিথিদের গাড়ি। ছবি: চরচা
ইলিয়াস আরও বলেন, “অভিযুক্ত কর্মকর্তা নিজেই এখান থেকে হওয়া আয়ের ৭০ শতাংশ পেতেন। তার অগোচরে এসব কাজ হতে পারে, এটা সম্ভবই না। নিশ্চয়ই তিনিও জানতেন এসব অবৈধ কাজের খবর।”
ডিবি আরেকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আন্তর্জাতিক অনলাইন মার্কেটপ্লেস ‘এয়ারবিএনবি’ ও ট্রাভেলার প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে জন্মদিনের কথা বলে ৩৫ জন থাকার শর্তে বাড়িটি বুকিং নেওয়া হয়েছিল। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সেখানে দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত ডিজে পার্টি, উচ্চ শব্দে গান-বাজনা এবং মাদক সেবনের মতো কার্যক্রম চলছিল। আটকদের মধ্যে ২৬ জন নারী ও ৫৮ জন পুরুষ রয়েছেন, যাদের মধ্যে একজন আফগানিস্তানের নাগরিক এবং দুজন পুলিশ কর্মকর্তার সন্তানও রয়েছেন।
ডিবির অভিযানের সময় বাড়ির সামনে ছয়টি গাড়ি দেখা যায়। স্থানীয়দের মতে, আটক করার পর অনেকেই গাড়ি নিয়ে যেতে পারেনি। এই গাড়িগুলো আটকদেরই গাড়ি।
পুলিশ অফিসার্স হাউজিং-১ এর ২ নম্বর প্লটে অবস্থিত বাড়িটির পাশেই খিলক্ষেত থানার একটি পুলিশ ফাঁড়ি। ছবি: চরচা
রাজধানীর খিলক্ষেত-ভাটারা এলাকার পূর্বাচল পুলিশ অফিসার্স হাউজিং-১ এর ২ নম্বর প্লটে অবস্থিত বাড়িটির পাশেই খিলক্ষেত থানার একটি পুলিশ ফাঁড়ি। সেখানে সরেজমিনে গিয়ে কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তাকে পাওয়া যায়নি। ফাঁড়িতে অবস্থিত কয়েকজন কনস্টেবল জানান, এই বাড়িতে যে এমন কর্মকাণ্ড চলত, সে সম্পর্কে তারা কেউই কিছু জানতেন না।
এদিকে, ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম চরচাকে জানান, আটকদের গুলশান জোনের স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের মাধ্যমে ‘সামারি ট্রায়ালে’ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে সাজা দেওয়া হয়েছে। রায়ে ৫৯ জন পুরুষকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও এক হাজার টাকা জরিমানা এবং ১৬ জন নারীকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড ও ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়।
নিজের মালিকানাধীন বাড়িতে মাদক উদ্ধারের বিষয়ে অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহির একটি সংবাদমাধ্যমে দাবি করেন, জন্মদিনের অনুষ্ঠানের কথা বলে ভাড়া দেওয়া হয়েছিল এবং তাদের নীতিমালায় মাদক নিষিদ্ধ ছিল। বাড়ি মালিকের অগোচরে ভাড়াটিয়া অপরাধ করলে তার দায় বাড়ি মালিকের ওপর বর্তায় না।
এ বিষয়ে কথা বলতে আব্দুল্লাহ আল জহিরকে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
গোল্ডেন সানরাইজ’ নামক বাড়ির ছাদের দৃশ্য। ছবি: চরচা
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও সাবেক আইজিপি মোহাম্মদ নুরুল হুদা চরচাকে বলেন, “বাড়ি ভাড়া দেওয়ার আগে দেখা উচিত কাকে বাড়ি ভাড়া দেওয়া হচ্ছে এবং তারা সেখানে কী করবে। নিজের বাসা কারা ব্যবহার করছে, তা বাড়িওয়ালার নজরে থাকা উচিত। মাঝে মাঝে খোঁজখবর নেওয়া যায় এবং চুক্তির শর্ত অনুযায়ী বাড়িওয়ালা সময়ে সময়ে বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। এছাড়া যে সম্পত্তি ভাড়া দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবে কী কাজে ব্যবহার হচ্ছে- তা দেখার দায়িত্বও বাড়িওয়ালার ওপরই বর্তায়; বাসা ভাড়া দিলেই এই দায় কোনোভাবে এড়িয়ে যাওয়া যায় না।”
এ ধরনের ঘটনা ‘অত্যন্ত গর্হিত অপরাধ’ এবং বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্ত করে আইনি সাজার ব্যবস্থা করা উচিত বলে অভিমত ব্যক্ত করেন সাবেক আইজিপি মোহাম্মদ নুরুল হুদা।
এদিকে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেছেন, “ডিআইজির মালিকানাধীন বাড়ি থেকে মাদক উদ্ধারে বোঝা যায় দেশে আইনশৃঙ্খলার কতটা অবনতি হয়েছে।”
গতকাল মঙ্গলবার ফেসবুক পোস্টে তিনি আরও লেখেন, “সর্বত্র আইনশৃঙ্খলাবিরোধী ও অসামাজিক কার্যকলাপের পাশাপাশি চাঁদাবাজির মহোৎসব, ছিনতাই, লুণ্ঠন ও ডাকাতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মালিকানাধীন বাড়িতে এ ধরনের অপকর্ম সংঘটিত হওয়ায় জনমনে উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।”