দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমার আশঙ্কা করছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। সংস্থাটি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪ শতাংশে নামিয়েছে। এর আগে জুলাইয়ে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল এডিবি।
আজ বুধবার প্রকাশিত এডিবির সর্বশেষ এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক (এডিও) আপডেট-এ এসব পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এডিবির সাম্প্রতিক আপডেটে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতির ওপর জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং সম্ভাব্য শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বার্তা সংস্থা ইউএনবির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, উচ্চ খেলাপি ঋণ, জ্বালানি সংকট, ঋণের উচ্চ সুদ, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধিকে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা, জ্বালানি আমদানির ব্যয় এবং আবহাওয়াজনিত ঝুঁকিও প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে বলে জানিয়েছে এডিবি।
এডিবির মতে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হচ্ছে ব্যাংক খাতের চাপ। খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া এবং ব্যাংকের ব্যালান্সশিট দুর্বল হয়ে পড়ায় বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঋণের উচ্চ সুদহার। ব্যাংকগুলো তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সরকারি সিকিউরিটিজে অর্থ বিনিয়োগে বেশি আগ্রহী হওয়ায় বেসরকারি খাতে ঋণের জোগান আরও সীমিত হচ্ছে বলে জানিয়েছে এডিবি।
এডিবি বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে আসতে পারে। জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক চাহিদার দুর্বলতা এবং ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা শিল্প খাতকে চাপে রাখবে।
বিশেষ করে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতা। নতুন বিনিয়োগের অনুমোদন ও বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতাও বিনিয়োগের গতি কমিয়ে দিচ্ছে বলে মনে করছে এডিবি। সংস্থাটির মতে, এসব সমস্যা থাকলে ভবিষ্যতে মুদ্রানীতি কিছুটা শিথিল করা হলেও তার সুফল অর্থনীতিতে দ্রুত পৌঁছানো কঠিন হবে।
এডিবি বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশে উঠতে পারে। জুলাইয়ের পূর্বাভাসে এই হার ছিল ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। জ্বালানির দাম, পরিবহন ব্যয় ও আমদানি খরচ বাড়ার কারণে পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে। এর সঙ্গে আবহাওয়ার পরিবর্তন ও সম্ভাব্য শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাব কৃষি উৎপাদনেও চাপ তৈরি করতে পারে।
এডিবির পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি থাকবে ব্যক্তিগত ভোগ। প্রবাসী আয় বাড়ায় মানুষের ব্যয় করার সক্ষমতা কিছুটা বাড়তে পারে। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সেই আয় ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বড় একটি অংশ কমিয়ে দিতে পারে। অর্থাৎ আয় বাড়লেও পণ্য ও সেবার দাম দ্রুত বাড়লে সাধারণ মানুষের প্রকৃত ভোগক্ষমতা খুব বেশি বাড়বে না।
এডিবি মনে করছে, রেমিট্যান্সের প্রবাহ অর্থনীতিকে কিছুটা সহায়তা দিলেও বেসরকারি মুদ্রার রিজার্ভ ও বাহ্যিক খাতকে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করবে।
এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর চিংফেং ঝাং বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। তবে বাইরের নানা সমস্যা ও দেশের অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতার কারণে এই ঘুরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়া এখনো ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তিনি বলেন, “এখন অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাত, জ্বালানি নিরাপত্তা ও ব্যবসার পরিবেশে দ্রুত সংস্কার করা জরুরি। এসব সংস্কার হলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়বে, ভালো কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং বাংলাদেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী ও স্থিতিশীলভাবে এগিয়ে যেতে পারবে।”
এসব সংস্কার বাস্তবে মানুষের জন্য সুফল বয়ে আনতে বাংলাদেশকে সহায়তা করতে এডিবি প্রস্তুত রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।