গত বছর প্রধানমন্ত্রী এদি রামা যখন মারজানা কোককুকে আলবেনিয়ার সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করেন, তখন তার জীবন বদলে যায়। ২৫ বছর বয়সী এই তরুণী ছিলেন রামার বাছাই করা বহু তরুণ আইনপ্রণেতার একজন, যাদের দিয়ে তিনি তার সোশ্যালিস্ট পার্টির নতুন মুখ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু এ সপ্তাহে সেই কোককুই রামার পদত্যাগের দাবিতে চলা শিক্ষার্থীদের ব্যাপক বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন। তিনি বর্তমানে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
দুর্নীতি, কর্মসংস্থানের অভাব এবং সরকার তাদের জন্য কাজ করছে না, এমন ব্যাপক ধারণা মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ তৈরি করেছে। এ সপ্তাহে সেই ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। তরুণ বিক্ষোভকারীরা রাজধানী তিরানায় জড়ো হয়ে সরকারি ভবন ও ব্যাংকে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং পুলিশের দিকে রাস্তার পাথর ছুড়তে থাকে।
সরকার ও পুলিশ সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছে। পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৫০০ বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ৩৩০ জনকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া, প্রায় ১২০ জন পুলিশ সদস্য ও ৪৫ জন বিক্ষোভকারী আহত হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। তবে বিক্ষোভকারীদের মধ্যে আহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, কারণ অনেক আহত হওয়ার ঘটনা নথিভুক্ত হয়নি।
আলবেনিয়ার এই অস্থিরতা ইউরোপজুড়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদী আন্দোলনের একটি অংশ। ফ্রান্সেও উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আরও শিক্ষক ও উন্নত সুযোগ-সুবিধার দাবিতে কয়েক সপ্তাহ ধরে বিক্ষোভ এবং বিদ্যালয় অবরোধ করে আসছে।
তরুণদের বিক্ষোভে হুমকির মুখে রামার শাসন
শুক্রবার বিক্ষোভ চলাকালে কাছেই পুলিশ যখন কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করছিল, তখন কোককু বলেন, “দেশটি অসাধারণ। কিন্তু এই রাজনৈতিক অভিজাত শ্রেণি যে ভুল নীতিগুলো বাস্তবায়ন করেছে, তা আলবেনীয় জনগোষ্ঠী ও নাগরিকেরা দীর্ঘদিন ধরে যা চেয়ে আসছে এবং প্রত্যাশা করছে, তার সম্পূর্ণ বিপরীত।”
সাবেক বাস্কেটবল খেলোয়াড় রামা ২০১৩ সাল থেকে ক্ষমতায় রয়েছেন। যা কোককুর জীবনের প্রায় অর্ধেক সময়। গত বছর নির্বাচনে জয়ী হয়ে রামা চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় আসেন। তবে এরপর থেকে তার সরকার একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগে চাপে রয়েছে।
রামা কোনো অন্যায় করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এ সপ্তাহে রয়টার্সকে তিনি বলেন, তিনি পদত্যাগ করবেন না।
তিনি বলেন, “সরকার পরিবর্তন হয় গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে। গত বছর আমাদের নির্বাচন হয়েছে, সহিংসতার মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন হয় না।”
তবু চলমান বিক্ষোভ এখন পর্যন্ত তার শাসনের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।
এ সপ্তাহে বিক্ষোভকারীরা বলেছে, তাদের দাবি উপেক্ষা করা হয়েছে বলেই তারা সহিংসতার পথ বেছে নিয়েছে।
এর আগে আলবেনিয়ার দক্ষিণ উপকূলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এলাকায় একটি বিলাসবহুল অবকাশকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনাকে ঘিরে কয়েক মাস ধরে মূলত শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ চলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সমর্থনপুষ্ট এই প্রকল্পটি আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
রামার সরকারের বিরুদ্ধে এটিই একমাত্র বিতর্ক নয়। গত বছর কৌঁসুলিরা অভিযোগ করেন, তার উপপ্রধানমন্ত্রী পছন্দের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে নির্মাণকাজের চুক্তি পাইয়ে দেওয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। দুর্নীতির এ অভিযোগ রামা ও তার উপপ্রধানমন্ত্রী—দুজনই অস্বীকার করেছেন।
কোককু বলেন, “আমি তাদের নীতিগুলোর সঙ্গে একমত ছিলাম না। বিশেষ করে প্রকৃতি, আমাদের ভূমি এবং আমাদের আলবেনিয়ার বিরুদ্ধে তারা যেসব নীতি বাস্তবায়ন করছিলেন, সেগুলোর সঙ্গে।”
কুশনার-সমর্থিত প্রকল্পটি কোককুকে ক্ষুব্ধ করেছে। ভূমির সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তিনি উত্তর আলবেনিয়ার দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলের বাসিন্দা। সেখানে একটি হ্রদের তীরে তার পরিবার সাধারণ সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন একটি ছোট অতিথিশালা পরিচালনা করে।
চারপাশে তীব্র ঝাঁজালো কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়ার মধ্যে কোককু বলেন, “আমাদের দেশ মানে আলবেনীয় জনগণ। তারাই ভবিষ্যৎ গড়ে, বর্তমান নির্মাণ করে এবং দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। কোনো একক ব্যক্তি বা কোনো একটি সরকার নয়।”