চিকিৎসাবিজ্ঞানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার নতুন নয়। রোগীর উপসর্গ বিশ্লেষণ, পরীক্ষার ফল ব্যাখ্যা এবং সম্ভাব্য রোগ শনাক্ত করার কাজে ইতিমধ্যে বিভিন্ন এআই মডেল ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে এসব প্রযুক্তির বড় সীমাবদ্ধতা হলো, অনেক ক্ষেত্রে রোগীর সব উপসর্গ, পরীক্ষার ফলাফল ও চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে দ্রুত একটি সম্ভাব্য রোগ নির্ণয়ের চেষ্টা করা হয়। বাস্তবে চিকিৎসকেরা সাধারণত এভাবে কাজ করেন না। তারা রোগীর ইতিহাস জানেন, প্রাথমিক পরীক্ষা করেন, তথ্যের ভিত্তিতে সম্ভাব্য রোগের ধারণা তৈরি করেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন পরীক্ষা করিয়ে সেই ধারণা যাচাই করেন।
মাইক্রোসফটের গবেষকেরা এবার এমন একটি এআই টুল তৈরি করেছেন, যা চিকিৎসকদের এই ধারাবাহিক পদ্ধতি অনুসরণ করে রোগ নির্ণয়ের চেষ্টা করে। তাদের দাবি, জটিল চিকিৎসা পরিস্থিতিতে এই ব্যবস্থা সাধারণ চিকিৎসকদের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি নির্ভুলতা দেখিয়েছে।
এ বিষয়ে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মাইক্রোসফটের গবেষকদের এই গবেষণাটি গত বৃহস্পতিবার বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী সায়েন্স-এ প্রকাশিত হয়েছে। নতুন ব্যবস্থাটির বিশেষত্ব হলো, এটি শুধু রোগীর দেওয়া তথ্য থেকে সম্ভাব্য রোগের নাম বলে না; বরং রোগ নির্ণয়ের পুরো প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে পরিচালনা করে। কোন প্রশ্ন রোগীকে করা প্রয়োজন, তার চিকিৎসার ইতিহাসের কোন তথ্য গুরুত্বপূর্ণ, শারীরিক পরীক্ষায় কী কী বিষয় বিবেচনা করতে হবে এবং কোন পরীক্ষা কখন করানো উচিত–এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করে এই এআই টুল। পরবর্তী সময়ে পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করে প্রয়োজন হলে আরও পরীক্ষা করার সিদ্ধান্তও নেয়।
এই প্রক্রিয়া পরিচালনার জন্য ব্যবস্থাটিতে রয়েছে একটি ‘অর্কেস্ট্রেটর’। এটি মূলত এআইয়ের বিভিন্ন কার্যক্রম সমন্বয় করে এবং রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো সাজিয়ে দেয়। গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এর মাধ্যমে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে, যেখানে বিভিন্ন চিকিৎসাবিশেষজ্ঞের ভূমিকা অনুকরণকারী এআই এজেন্টরা পরস্পরের সঙ্গে সমন্বয় করে রোগীর সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে। নতুন তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থাটি তার প্রাথমিক অনুমান ও পরবর্তী পদক্ষেপের পরিকল্পনা হালনাগাদ করে।
এই পদ্ধতির গুরুত্ব বোঝা যায় জটিল রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে। অনেক রোগের উপসর্গ একে অপরের সঙ্গে মিলে যায়। আবার কিছু বিরল রোগের লক্ষণ এতটাই অস্পষ্ট হতে পারে যে, প্রাথমিক পরীক্ষায় সঠিক রোগ শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে শুরুতেই একটি নির্দিষ্ট রোগ ধরে নিয়ে এগোলে ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বরং পর্যায়ক্রমে তথ্য সংগ্রহ, সম্ভাব্য রোগের ধারণা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নির্বাচনের মাধ্যমে ভুলের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। মাইক্রোসফটের নতুন এআই ব্যবস্থা এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়াটিকেই প্রযুক্তির মাধ্যমে অনুসরণ করার চেষ্টা করছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গবেষকেরা ৩০০টিরও বেশি অত্যন্ত অস্বাভাবিক ও জটিল চিকিৎসা পরিস্থিতিতে নতুন ব্যবস্থাটির কার্যকারিতা পরীক্ষা করেছেন। এসব ক্ষেত্রে রোগীর সমস্যা বিশ্লেষণ করে রোগ নির্ণয়ের সামগ্রিক প্রক্রিয়া পরিচালনায় এআই টুলটি সাধারণ চিকিৎসকদের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি নির্ভুল ছিল। চিকিৎসকেরা যেখানে পাঠ্যবই ও ইন্টারনেটের তথ্য ব্যবহার করে রোগ নির্ণয়ের চেষ্টা করেছেন, সেখানে এআই টুলটি ধারাবাহিকভাবে তথ্য সংগ্রহ ও পরীক্ষা নির্বাচনের পদ্ধতি অনুসরণ করেছে। জরুরি বিভাগে ভর্তি হওয়া রোগীদের একটি বড় তথ্যভান্ডার থেকে নেওয়া পরিস্থিতিতেও ব্যবস্থাটি মানব চিকিৎসকদের চেয়ে ভালো ফল দেখিয়েছে বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন।
তবে এই ফলাফলকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না যে, এআই এখন সব ধরনের রোগ নির্ণয়ে চিকিৎসকদের চেয়ে এগিয়ে। গবেষণায় ব্যবহৃত নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পাওয়া ফলাফল এবং বাস্তব হাসপাতালে বিচিত্র উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীদের চিকিৎসা করা এক বিষয় নয়। রোগীর বয়স, পূর্ববর্তী অসুস্থতা, ওষুধের ব্যবহার, শারীরিক অবস্থা এবং পরীক্ষার ফলাফলের মতো বহু বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়। বাস্তবে রোগী সব তথ্য সঠিকভাবে দিতে পারেন না, আবার সব প্রয়োজনীয় পরীক্ষাও তাৎক্ষণিকভাবে করা সম্ভব হয় না। তাই গবেষণার ফলাফল আশাব্যঞ্জক হলেও বৃহত্তর পরিসরে পরীক্ষা ছাড়া এআইয়ের কার্যকারিতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।
মাইক্রোসফটের স্বাস্থ্য বিভাগের করপোরেট ভাইস প্রেসিডেন্ট ডমিনিক কিং রয়টার্সকে বলেন, পুরোনো ধরনের অনেক এআই ব্যবস্থা বহুনির্বাচনী প্রশ্নের পরীক্ষায় প্রায় শতভাগ নম্বর পাওয়ার পর্যায়ে পৌঁছেছে। কিন্তু বাস্তব চিকিৎসা পরিস্থিতি এমন নয়, এখানে রোগী চিকিৎসকের কাছে এসে তার সব সমস্যার একটি গোছানো বিবরণ তুলে ধরেন না বা পারেন না। কিংয়ের বক্তব্যের তাৎপর্য হলো, চিকিৎসাবিষয়ক জ্ঞানের পরীক্ষায় ভালো করা আর বাস্তবে রোগীর সমস্যা বুঝে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া এক নয়। নতুন এআই ব্যবস্থার লক্ষ্য হচ্ছে দ্বিতীয় কাজটিতে দক্ষতা অর্জন করা।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চিকিৎসার ব্যয়। গবেষকেরা জানিয়েছেন, অর্কেস্ট্রেটর পরিচালিত রোগ নির্ণয়ের প্রক্রিয়ায় ব্যয়ও মানব চিকিৎসকদের পরিচালিত প্রক্রিয়ার তুলনায় কম ছিল। মাইক্রোসফট এআই হেলথের প্রধান হার্শা নোরি বলেন, তারা শুধু এআই ব্যবস্থার নির্ভুলতা পরিমাপ করছেন না; রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা কতটা বিচক্ষণতা ও সতর্কতার সঙ্গে করা হচ্ছে, সেটিও মূল্যায়ন করছেন। এর অর্থ, কোনো রোগ শনাক্ত করার জন্য অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা কমানো গেলে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় হ্রাসের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে প্রতিবেদনে ব্যয় সাশ্রয়ের নির্দিষ্ট পরিমাণ উল্লেখ করা হয়নি।
এই প্রযুক্তির সম্ভাব্য ব্যবহার যাচাইয়ের পরবর্তী ধাপও গুরুত্বপূর্ণ। বোস্টনের বেথ ইসরায়েল ডিকনেস মেডিকেল সেন্টারের সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তিতে গবেষকেরা জরুরি বিভাগের অপেক্ষাকক্ষে থাকা রোগীদের অগ্রাধিকার নির্ধারণে এআইটির সক্ষমতা পরীক্ষা করবেন। জরুরি বিভাগে একসঙ্গে অনেক রোগী এলে কার অবস্থা বেশি গুরুতর এবং কাকে আগে চিকিৎসা দেওয়া প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এআই যদি রোগীর প্রাথমিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দ্রুত ঝুঁকি শনাক্ত করতে পারে, তাহলে চিকিৎসাকর্মীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা মিলতে পারে। তবে এই পর্যায়ের পরীক্ষার ফলাফল এখনো পাওয়া যায়নি।
মাইক্রোসফটের এই উদ্যোগ চিকিৎসায় এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দেয়। লক্ষ্য কেবল বিপুল পরিমাণ চিকিৎসাতথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য রোগের নাম বলা নয়; বরং চিকিৎসকের মতো প্রশ্ন করা, তথ্য যাচাই করা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নির্বাচন করা এবং নতুন তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা। এই পদ্ধতি কার্যকর প্রমাণিত হলে জটিল রোগ শনাক্তকরণে সহায়তা, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা কমানো এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থাপনা উন্নত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে এআইয়ের সিদ্ধান্তের নির্ভরযোগ্যতা, বাস্তব হাসপাতালে এর কার্যকারিতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। এই গবেষণার ফলাফলকে সম্ভাবনাময় অগ্রগতি হিসেবে দেখা যায়, চিকিৎসকদের বিকল্প হিসেবে এআইয়ের সক্ষমতার চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে নয়।