Advertisement Banner

একটি দেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণি কতটা প্রয়োজনীয়?

একটি দেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণি কতটা প্রয়োজনীয়?
প্রতীকী ছবি। ছবি: এআই জেনারেটেড

যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত হিসেবে মধ্যবিত্তের উত্থানকে বিবেচনা করা হয়। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সমাজতাত্ত্বিকদের মত হচ্ছে, একটি দেশে যখন মধ্যবিত্তের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে, তখন সে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শক্ত ভিত্তি পায়। একই সাথে সেই দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নতি এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করার কার্যক্রম গতি পায়।

মধ্যবিত্ত একটি বিশেষণ পদ। এর বাংলা ব্যাকরণগত অর্থ হলো, ‘ধনী‑দরিদ্রের মধ্যবর্তী অবস্থাপন্ন গৃহস্থ; বিশেষ ধনী বা নিতান্ত দরিদ্র নয় এমন।’ বাংলা অভিধানের দেওয়া এই সংজ্ঞা অনুযায়ী, মধ্যবিত্ত অবশ্যই অবস্থাপন্ন। অর্থাৎ, অর্থনৈতিকভাবে মধ্যবিত্তরা স্বচ্ছল থাকে। মূলত দরিদ্র অবস্থা থেকে ধনীর দিকে যে যাত্রা, তার যাত্রাবিরতি এই মধ্যবিত্তে ঘটে।

মধ্যবিত্ত শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো ‘Middle Class’। ক্যামব্রিজ ডিকশনারি এর অর্থ হিসেবে বলছে, ‘এটি একটি সামাজিক গোষ্ঠী, যাতে সুশিক্ষিত মানুষ অন্তর্ভুক্ত থাকে, যেমন: চিকিৎসক, আইনজীবী ও শিক্ষকেরা, যাদের অর্থ উপার্জনের ভালো উৎস থাকে এবং এরা গরিব নয়, তবে খুব ধনীও হয় না।’

আর ব্রিটানিকা ডিকশনারি বলছে, ‘মধ্যবিত্ত একটি নির্দিষ্ট সামাজিক শ্রেণি। উচ্চ ও নিম্নবিত্তের মাঝখানে এর অবস্থান। মূলত এই শ্রেণিতে থাকে ব্যবসা‑বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট ও পেশাজীবী মানুষেরা। পেশাজীবীদের মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি–উভয়ই থাকে। পাশাপাশি থাকে দক্ষ শ্রমজীবীরাও।’

অর্থাৎ, মধ্যবিত্তরা ঠিক গরিব মানুষের মতো অভাবে ভোগে না। তবে স্বচ্ছল হলেও মাত্রাতিরিক্ত অর্থ‑বিত্ত তাদের থাকে না। সবই থাকে মাঝামাঝি।

middle class 2

অর্থনীতিতে নোবেলজয়ী অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় ও এসথার দুফলো ২০০৭ সালে বিশ্বের মধ্যবিত্ত শ্রেণি নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। সেই গবেষণায় অর্থনৈতিক উন্নয়নে মধ্যবিত্তের কয়েকটি প্রধান ভূমিকার কথা উঠে আসে। প্রথমত, মধ্যবিত্ত শ্রেণি সাধারণত উদ্যোক্তা বেশি তৈরি করে। এতে উৎপাদনশীলতার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে কর্মসংস্থানও। দ্বিতীয়ত, মধ্যবিত্তরা মানব পুঁজি তৈরিতে বিনিয়োগ করতে চায়, সঞ্চয়ের ওপর জোর দেয়। এতে করে মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা শিক্ষার সুযোগ দরিদ্রদের তুলনায় বেশি পায়। ফলে প্রশিক্ষিত শ্রমশক্তি সৃষ্টির বা বৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখা দেয়। এটি অর্থনৈতিক উন্নয়নে অত্যন্ত সহায়ক। তৃতীয়ত, মধ্যবিত্তের হাতে দরিদ্রদের তুলনায় অতিরিক্ত অর্থ থাকে। ফলে দরিদ্রদের তুলনায় বেশি ভোগ করে মধ্যবিত্তরা। যেকোনো বাজারকে চাঙা রাখার জন্য এই ভোগ অতীব প্রয়োজন। এতে বাজারে চাহিদা সৃষ্টি হয়, যা বিনিয়োগ বাড়াতে সাহায্য করে।

এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) ২০১০ সালের অক্টোবরে বৈশ্বিক মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিল। এর শিরোনাম ছিল, ‘Who are the Middle Class and What Values do They Hold? Evidence from the World Values Survey’। এই গবেষণায় আর্থিক বা সামাজিক সূচকে মধ্যবিত্ত নির্ণয়ের বদলে একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ব্যবহার করা হয়েছিল। মূলত কারা নিজেদের মধ্যবিত্ত মনে করেন, সেই দাবিটিকে প্রাধান্য দিয়ে এরপর বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। গবেষকেরা বলেছেন, যেসব দেশে উচ্চহারে বৈষম্য থাকে, সেসব দেশে আয়ের ভিত্তিতে নিজেদের মধ্যবিত্ত দাবি করার প্রবণতা কম। গবেষণায় আরও দেখা গেছে যে, ইতিবাচক রাজনৈতিক চর্চার বৃদ্ধি মধ্যবিত্তের সংখ্যা বৃদ্ধির সমানুপাতিক। অর্থাৎ, মধ্যবিত্তের সংখ্যা যত বাড়ে, রাজনীতি নিয়ে আগ্রহের পরিমাণ তত বাড়ে। কারণ মধ্যবিত্ত শ্রেণির রাজনৈতিক সচেতনতা সাধারণত উচ্চ ও নিম্নবিত্তের তুলনায় বেশি থাকে। এবং বৈশ্বিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করেই এই চিত্র পাওয়া গেছে। কারণ, মধ্যবিত্ত শ্রেণি তুলনামূলক ভালো পণ্য ও সেবা পাওয়ার চাহিদা জানায়। সেই সঙ্গে মধ্যবিত্তরা দেশের সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখতে চায়। ফলে মধ্যবিত্ত শ্রেণির আকার যত বড় হতে থাকে, তত ভালো পণ্য ও সেবা পাওয়ার চাহিদা বাড়ে। বাড়ে সরকারের অধিকতর জবাবদিহি নিশ্চিতের দাবিও।

ওইসিডি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার ২০২১ সালের এক প্রতিবেদনে লিখেছিল, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রায়শই মধ্যবিত্তরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মধ্যবিত্তের সংখ্যা বৃদ্ধি এক অর্থে কোনো ভৌগলিক এলাকার সামগ্রিক সম্পদ বৃদ্ধিও। আর যখনই সমাজে ধন‑সম্পদের পরিমাণ বাড়ে, তখন গণতান্ত্রিক চর্চা ও অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো এবং দুর্নীতির পরিমাণ কমানোর তাগিদও বাড়ে। ফলে সুশাসনের ক্ষেত্র উন্মুক্ত হয় এবং এর চাহিদা বৃদ্ধি পায়। এসবের পক্ষে সমর্থন আসলে আসে ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির কাছ থেকেই। কারণ, এই শ্রেণির কাছেই সুস্থির গণতন্ত্রের প্রয়োজনীয়তা বেশি থাকে। আর এভাবেই মধ্যবিত্তের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে দেশ ও সরকারের স্থিতিশীলতার পথ উন্মুক্ত হয়।

এর বাইরে একটি সমাজের সাংস্কৃতিক উন্নয়নেও মধ্যবিত্ত শ্রেণি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি একটি সমাজে নতুন নতুন সাংস্কৃতিক উপাদান যোগ করে এবং পুরোনো উপাদানকেও হালনাগাদ করার চেষ্টা চালায়।

অর্থাৎ, কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নতিকে সুস্থির করতে মধ্যবিত্ত শ্রেণি প্রয়োজন। আবার সেই দেশে গণতন্ত্র ও সুশাসনকে শক্ত ভিত্তি দিতেও মধ্যবিত্ত দরকার। এই শ্রেণি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি বাড়াতে কাজ করে। আবার এই শ্রেণিভুক্ত মানুষেরাই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তুলনামূলকভাবে বেশি অংশ নেয়। সুতরাং, মধ্যবিত্ত শ্রেণি ছাড়া একটি উন্নত দেশ গড়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।  

সম্পর্কিত