Chaarcha Logo
Chaarcha logo
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
০১ নভেম্বর, ২০২৬
০১ নভেম্বর, ২০২৬
Chaarcha logo
সংক্ষেপেকানেক্টম্যাগাজিন

আমরা

আমাদের সম্পর্কেযোগাযোগবিধিনিষেধ ও শর্তাবলিগোপনীয়তার নীতি
Chaarcha logo
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
০১ নভেম্বর, ২০২৬
০১ নভেম্বর, ২০২৬
সর্বশেষবিশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
Chaarcha logo
সর্বশেষএক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণভাবনাভিডিওশর্টসজীবনচরচাম্যাগাজিনপ্রবাস
আমরা
  • আমাদের সম্পর্কে
  • যোগাযোগ
  • বিধিনিষেধ ও শর্তাবলি
  • গোপনীয়তার নীতি
এক্সপ্লেইনারবিশ্লেষণ

সম্পাদক: সোহরাব হাসান, প্রিন্টার্স বিল্ডিং (লেভেল–১৪), ৫ রাজউক অ্যাভিনিউ, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, ঢাকা–১০০০, বাংলাদেশ

|

স্বত্ব © চরচা

Chaarcha Logo
> বিশ্লেষণ

মার্কিন ডলারের শেষ অধ্যায় লেখা হচ্ছে

চরচা ডেস্ক

চরচা ডেস্ক

প্রকাশ : ১৮ অক্টোবর ২০২৫, ১২: ২৫
মার্কিন ডলারের শেষ অধ্যায় লেখা হচ্ছে

ভাবুন তো, সাল ১৯৪৪। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষভাগ। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ হ্যাম্পশায়ারের ব্রেটন উডস শহরের মাউন্ট ওয়াশিংটন হোটেল। সেখানে ৪৪টি মিত্রদেশের প্রতিনিধি একত্র হয়েছেন। সেই ঘরেই নেওয়া হতে যাচ্ছে এমন এক সিদ্ধান্ত, যা আগামী ৮০ বছরের জন্য বৈশ্বিক অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণ করবে।

Advertisement

ব্রিটেন সম্পূর্ণ নিঃস্ব, রিক্ত। অথচ তারা ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ছিল বিশ্বের আর্থিক পরাশক্তি। তাদের জাতীয় ঋণ পৌঁছে গেছে জিডিপির ২৪৯ শতাংশে। দুইটি বিধ্বংসী বিশ্বযুদ্ধের পর সমুদ্রশাসনকারী সাম্রাজ্যটি আর্থিকভাবে সম্পূর্ণ ন্যুব্জ। সভায় উপস্থিত সবাই জানে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য শেষ হয়ে এসেছে।

তখনই ঘটে ইতিহাসে বিরল এক ঘটনা। বিশ্বের রিজার্ভ মুদ্রার মর্যাদা হাতবদল হয়। ব্রিটিশ পাউন্ডের স্থান নেয় মার্কিন ডলার। কিন্তু এটি কেবল আর্থিক ক্ষমতা হস্তান্তর ছিল না। এটি ছিল গত পাঁচ শ বছর ধরে পুনরাবৃত্ত এক ধারার ধারাবাহিকতা। উত্থান, শীর্ষে আরোহন, অতিকায় আকার এবং শেষে পতন। ইতিহাসে বিশ্বের প্রতিটি রিজার্ভ মুদ্রাই একই জীবনচক্রের মধ্য দিয়ে গেছে। আর আজ মার্কিন ডলার সেই একই সতর্ক সংকেত দেখতে পাচ্ছে। অতীতে চারটি মুদ্রার পতনের আগে এমনটাই দেখা গিয়েছিল।

এই ভবিষ্যতের ইঙ্গিত বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ৫৭৫ বছর আগে, ১৪৫০ সালে। তখন পর্তুগিজ রিয়াল ছিল বিশ্বের প্রথম প্রকৃত রিজার্ভ মুদ্রা। প্রায় ৮০ বছর ধরে পর্তুগাল নিয়ন্ত্রণ করেছে বৈশ্বিক বাণিজ্য। এটি কোনো সৌভাগ্য ছিল না। পর্তুগাল তখন নৌচলাচল ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে বিপ্লব ঘটিয়েছিল। তারা আফ্রিকা, এশিয়া ও আমেরিকার নতুন সমুদ্রপথ আবিষ্কার করে বিশ্বের বাণিজ্য মানচিত্রই বদলে দেয়।

Advertisement
Advertisement
Advertisement

১৪৫৩ সালে অটোমানদের হাতে কনস্টান্টিনোপল পতনের পর পুরোনো মসলা-বাণিজ্যের পথ শত্রু শক্তির নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। তখন পর্তুগিজরা বেরিয়ে পড়ে বিকল্প পথের খোঁজে। আক্ষরিক অর্থেই আফ্রিকার চারপাশ দিয়ে ঘুরে তারা আবিষ্কার করে নতুন পৃথিবী। লিসবন হয়ে ওঠে বিশ্ব বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু। ইউরোপ থেকে এশিয়া পর্যন্ত সর্বত্র পর্তুগিজ রিয়াল মুদ্রা গৃহীত হয়।

পর্তুগিজ সাম্রাজ্যের প্রভাব তখন আফ্রিকা, ভারত, মালয়েশিয়া, জাপান থেকে শুরু করে চীনের ম্যাকাও পর্যন্ত বিস্তৃত। কিন্তু প্রতিবারের মতোই সাফল্য নিয়ে আসে অতিবিস্তার। চারটি মহাদেশে সামরিক ঘাঁটি বজায় রাখতে গিয়ে পর্তুগালের কোষাগার ফাঁকা হয়ে পড়ে।

এদিকে ডাচ, ব্রিটিশ ও ফরাসিদের প্রতিযোগিতা বাড়তে থাকে। তার ওপর ১৫৩০-এর দশকে রাজপরিবারে উত্তরাধিকারের সংকট দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলে। অবশেষে ১৫৮০ সালে পর্তুগাল স্পেনের অধীনে চলে যায়। গঠিত হয় আইবেরিয়ান ইউনিয়ন। ৮০ বছরের মাথায় পর্তুগিজ রিয়াল হারিয়ে যায়। তার জায়গা নেয় স্প্যানিশ রুপা।

স্পেনের উত্থান শুরু হয় বিশ্বের সবচেয়ে সমৃদ্ধ রুপার ভান্ডার আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে। বলিভিয়ার আন্দিজ পর্বতমালার পোটোসি পর্বতে, ১৫৪৫ সালে। ১৫৭৫ থেকে ১৬৩৫ সাল পর্যন্ত এখান থেকে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক রুপা উৎপাদিত হয়। স্পেন এখানেই ‘পিসেস অব এইট’ নামে রুপার মুদ্রা তৈরি করত, যার গায়ে ‘P’ অক্ষর দিয়ে চিহ্ন দেওয়া থাকত। এই মুদ্রাই হয়ে ওঠে প্রথম প্রকৃত বৈশ্বিক মুদ্রা।

ষোড়শ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত ‘স্প্যানিশ ডলার’ ছিল পশ্চিমা বিশ্বের সবচেয়ে স্থিতিশীল ও বিশ্বাসযোগ্য মুদ্রা। এমনকি ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত এটি আমেরিকায় বৈধ মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। স্পেনের এই আধিপত্য স্থায়ী হয় প্রায় ১১০ বছর। ১৫৩০-এর দশক থেকে ১৬৪০ পর্যন্ত। কিন্তু তারপর আবার দেখা দেয় সেই চেনা পথ। অতিবিস্তার ও ঋণের ভারে পতন। রাজা প্রথম চার্লস তার উত্তরাধিকারী দ্বিতীয় ফিলিপের জন্য পাহাড়সম ঋণ রেখে যান। তিন কোটি ৬০ লাখ ডুকাট। সাথে প্রতিবছর ঘাটতির আরও ১০ লাখ।

রাজা দ্বিতীয় ফিলিপ স্পেনকে চারবার ঋণ খেলাপি ঘোষণা করেন। ১৫৫৭, ১৫৬০, ১৫৭৫ ও ১৫৯৬ সালে। এদিকে নতুন পৃথিবী থেকে অনবরত রুপা আসতে থাকায় মুদ্রাস্ফীতি ভয়াবহ আকার নেয়। তার শাসনামলে স্পেনে জিনিসপত্রের দাম চারগুণ বেড়ে যায়। আবার রাজা তৃতীয় ফিলিপের আমলে রুপার যোগান অর্ধেকে নেমে আসে। স্পেনের অর্থনীতি ধসে পড়ে। ১৬০৭ সালে আবারও দেউলিয়া হয় রাজকোষ। ১৬৪১ সালে আইবেরিয়ান ইউনিয়ন ভেঙে যায়। আর স্পেন হারায় বৈশ্বিক আর্থিক প্রাধান্য। এই সময় তলে তলে নতুন আর্থিক শক্তির উত্থান ঘটছিল-ডাচ প্রজাতন্ত্র।

১৬৪১ সালে আইবেরিয়ান ইউনিয়ন ভেঙে যায়। আর স্পেন হারায় বৈশ্বিক আর্থিক প্রাধান্য। এই সময় তলে তলে নতুন আর্থিক শক্তির উত্থান ঘটছিল-ডাচ প্রজাতন্ত্র।
১৬৪১ সালে আইবেরিয়ান ইউনিয়ন ভেঙে যায়। আর স্পেন হারায় বৈশ্বিক আর্থিক প্রাধান্য। এই সময় তলে তলে নতুন আর্থিক শক্তির উত্থান ঘটছিল-ডাচ প্রজাতন্ত্র।

সপ্তদশ শতাব্দীতে আমস্টারডাম হয়ে ওঠে বিশ্বের আর্থিক রাজধানী। উদ্ভাবন, বাণিজ্য ও মুনাফার ওপর দাঁড়িয়ে ডাচ মুদ্রা গিল্ডার ইউরোপের কার্যত প্রধান রিজার্ভ মুদ্রায় পরিণত হয়। আমস্টারডাম ব্যাংক আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে এক নির্ভরযোগ্য ও কার্যকর ব্যবস্থা চালু করে। পরে তা আধুনিক ব্যাংকিংয়ের ভিত্তি গড়ে দেয়।

ডাচ ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরাই আধুনিক অর্থব্যবস্থার পথিকৃৎ। তারা বিশ্বের প্রথম স্টক এক্সচেঞ্জ, নৌবীমা ব্যবস্থা, এবং পাবলিকলি ট্রেডেড কোম্পানির শেয়ার চালু করে। ১৬৪২ থেকে ১৭২০ সাল-প্রায় ৭৮ বছর ডাচ গিল্ডার বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু ইতিহাসের সেই পুরনো নিয়ম আবারও ফিরে আসে। অতিরিক্ত সম্প্রসারণ, যুদ্ধ, ঋণ ও ব্যর্থতা। চতুর্থ অ্যাংলো-ডাচ যুদ্ধ (১৭৮০–১৭৮৪) দেশটিকে দেউলিয়া করে ফেলে। ব্রিটিশদের সঙ্গে সংঘাতের চাপ সহ্য করতে না পেরে ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ধসে পড়ে।

ব্রিটিশ আধিপত্যের যুগ

আঠারো শতকের শেষভাগে ডাচ প্রজাতন্ত্রের পতনের পর বিশ্বের নতুন আর্থিক নেতৃত্ব নেয় ব্রিটেন। পাউন্ড স্টার্লিং, শিল্প বিপ্লব ও উপনিবেশিক সাম্রাজ্যের শক্তিতে ভর করে, পরবর্তী দুই শতাব্দী ধরে (১৭২০–১৯৪৪) বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে টিকে ছিল-যা আধুনিক ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের মুদ্রা আধিপত্য। ব্রিটিশ শাসনের শীর্ষ মুহূর্তে বিশ্বের ৬০ শতাংশ বাণিজ্য পাউন্ডে সম্পন্ন হতো। লন্ডন ছিল বৈশ্বিক বীমা, পণ্য ও বিনিয়োগের কেন্দ্র। ১৮১৬ সালের গ্রেট রিকয়েনেজ-এর পর স্বর্ণমান চালুর ফলে পাউন্ড হয়ে ওঠে পৃথিবীর সবচেয়ে স্থিতিশীল মুদ্রা।

আঠারো শতকের শেষভাগে ডাচ প্রজাতন্ত্রের পতনের পর বিশ্বের নতুন আর্থিক নেতৃত্ব নেয় ব্রিটেন
আঠারো শতকের শেষভাগে ডাচ প্রজাতন্ত্রের পতনের পর বিশ্বের নতুন আর্থিক নেতৃত্ব নেয় ব্রিটেন

১৯২২ সালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য পৃথিবীর প্রায় প্রতি পাঁচ জনের একজন অর্থাৎ ৪৫ কোটি ৮ লাখ মানুষ এবং বিশ্বের এক-চতুর্থাংশ ভূমি নিয়ন্ত্রণ করত। তাদের আর্থিক সাম্রাজ্য অদম্য মনে হচ্ছিল। কিন্তু তখনই শুরু হয় পতন। ব্রিটেনের জাতীয় ঋণ ১৯১৪ সালে ছিল ৬৫ কোটি পাউন্ড। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯১৯ সালে তা পৌঁছায় সাত শ কোটিতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আরও ভয়াবহ আঘাত হানে। এই যুদ্ধ শেষে ১৯৪৫ সালে ব্রিটিশ সরকারের ঋণ দাঁড়ায় জিডিপির ২৭০ শতাংশে। যুদ্ধ জিতলেও ব্রিটেন হারায় তার আর্থিক মুকুট।

ব্রেটন উডস ও ডলারের যুগের সূচনা

এরপরই আসে ইতিহাসের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। ব্রেটন উডস সম্মেলন। ১৯৪৪ সাল। ৪৪টি মিত্রদেশের ৭০০ প্রতিনিধি ১ থেকে ২২ জুলাই নিউ হ্যাম্পশায়ারের মাউন্ট ওয়াশিংটন হোটেলে জড়ো হন। লক্ষ্য যুদ্ধবিধ্বস্ত বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থা পুনর্গঠন। সেখানে গৃহীত চুক্তিতে জন্ম নেয় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং বিশ্বব্যাংক। ব্রেটন উডস ব্যবস্থা অনুযায়ী, প্রতিটি বড় মুদ্রা ডলারের সঙ্গে এবং ডলার নিজে স্বর্ণের সঙ্গে ($৩০ প্রতি আউন্স) বাঁধা থাকে। এই চুক্তির মধ্য দিয়েই আনুষ্ঠানিকভাবে বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রার আসন পাউন্ড থেকে চলে যায় ডলারে। এরপরের ২৫ বছর ছিল আমেরিকান ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্যের যুগ। কিন্তু ১৯৭১ সালে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ডলারের স্বর্ণে রূপান্তরযোগ্যতা স্থগিত করেন। স্বর্ণমান বিলুপ্ত হয়। তবু ডলার ভেঙে পড়ে না। বরং এটি পায় নতুন এক ভিত্তি। যার নাম তেল।

পেট্রো ডলার ব্যবস্থার জন্ম

১৯৭৩ সালের ওপেক তেল সংকটের পর আমেরিকা সৌদি আরবের সঙ্গে কৌশলগত একটি চুক্তি করে। চুক্তি অনুযায়ী, আমেরিকা সৌদিদের সামরিক সুরক্ষা দেবে। আর সৌদি তেল শুধু মার্কিন ডলারে বিক্রি হবে। ১৯৭৫ সালের মধ্যে ওপেকের সব সদস্যই এই নিয়মে সম্মত হয়। এভাবেই জন্ম নেয় পেট্রোডলার ব্যবস্থা। কারণ তেল কিনতে হলে প্রতিটি দেশকেই ডলার দরকার। এই কৃত্রিম বৈশ্বিক চাহিদা আমেরিকাকে এমন বিপুল ঘাটতি বহনের সুযোগ দেয়, যা অন্য কোনো দেশের পক্ষে সম্ভব না। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ডলারের আধিপত্য ছিল প্রশ্নাতীত। ২০০০ সালের দিকে বিশ্বের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের ৭০ শতাংশই ছিল মার্কিন ডলারে।

১৯৭১ সালে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ডলারের স্বর্ণে রূপান্তরযোগ্যতা স্থগিত করেন। স্বর্ণমান বিলুপ্ত হয়। তবু ডলার ভেঙে পড়ে না।
১৯৭১ সালে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ডলারের স্বর্ণে রূপান্তরযোগ্যতা স্থগিত করেন। স্বর্ণমান বিলুপ্ত হয়। তবু ডলার ভেঙে পড়ে না।

ডলারের আধিপত্যে ফাটল

কিন্তু সংখ্যাগুলো এখন বদলাচ্ছে। ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, বৈশ্বিক রিজার্ভে ডলারের অংশ নেমে এসেছে ৫৭.৮ শতাংশে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের অংশ ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের সময়কার ৫০ শতাংশ থেকে কমে ২০২৫ সালের শুরুতে মাত্র ৩০ শতাংশে নেমেছে।

একই সময়ে দ্রুত বাড়ছে ‘ডি-ডলারাইজেশন’। ব্রিকস জোট (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা) এখন সম্প্রসারিত হয়ে যুক্ত করেছে মিসর, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে। মোট ১০ সদস্য ও ১৩ অংশীদার দেশ এখন ‘ব্রিকস ব্রিজ পেমেন্ট নেটওয়ার্ক’ গড়ে তুলছে। এখানে লেনদেন হবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রা দিয়ে, ডলার ছাড়াই। একই ইতিহাস। নতুন রূপে। অন্যদিকে, আমেরিকার আর্থিক ভারসাম্যও চাপে পড়ছে। ২০২৫ সালের ৬ মার্চ পর্যন্ত দেশটির সরকারি ঋণ দাঁড়ায় ২৯ ট্রিলিয়ন বা ২৯ লাখ কোটি ডলার, সঙ্গে সরকারি সংস্থার মালিকানাধীন আরও ৭.৪ ট্রিলিয়ন। মোট ঋণ ৩৬.৪ লাখ কোটি ডলার অর্থাৎ জিডিপির ১২৪ শতাংশ।

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি আবারও স্পষ্ট। পর্তুগাল, স্পেন, নেদারল্যান্ডস, ব্রিটেন-সবাই এই একই পথ অনুসরণ করেছিল। উত্থান, শীর্ষ, অতিকায় আকার ও পতন। প্রত্যেকটির আধিপত্য টিকেছিল ৭৮ থেকে ২২০ বছর, গড়ে প্রায় ৯৫ বছর। মার্কিন ডলার ১৯৪৪ সালের ব্রেটন উডস থেকে আজ (২০২৫) পর্যন্ত টিকেছে ৮১ বছর। ইতিহাস বলছে, বিশ্ব আবারও এক মোড় ঘোরার দ্বারপ্রান্তে।

প্রতিটি বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা চারটি ধাপ অতিক্রম করেছে: উত্থান, শীর্ষ, অতিবিস্তার, এবং পতন

প্রথম ধাপ-উত্থান: একটি দেশ উদ্ভাবনের মাধ্যমে আধিপত্য লাভ করে। সেটা হতে পারে বাণিজ্যে, অর্থনীতিতে, কিংবা সামরিক শক্তিতে। পর্তুগাল দক্ষ হয়েছিল বিশ্ব নৌপরিচালনায়। স্পেন সারা বিশ্বকে রুপায় ভরিয়ে দিয়েছিল। নেদারল্যান্ডস গড়ে তুলেছিল আধুনিক অর্থব্যবস্থা। ব্রিটেনের শিল্পবিপ্লব বৈশ্বিক বাণিজ্যের রূপ পাল্টে দেয়। আর আমেরিকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী শিল্পশক্তির উত্থানে শীর্ষে পৌঁছায়।

দ্বিতীয় ধাপ-শীর্ষে পৌঁছানো: এই স্তরে পৌঁছে রিজার্ভ মুদ্রাটি প্রায় সর্বজনীন হয়ে ওঠে। বিশ্বের ৬০ শতাংশেরও বেশি লেনদেন হয় সেই মুদ্রায়। ওই দেশ বা সাম্রাজ্যকে তখন অজেয় মনে হয়। যেন কোনো শক্তিই তাকে টলাতে পারবে না।

তৃতীয় ধাপ-অতিবিস্তার: এ পর্যায়ে শুরু হয় ভাঙনের লক্ষণ। অত্যধিক সামরিক ব্যয়, বেড়ে চলা ঋণ এবং উৎপাদনের ঘাটতি দেশ বা সাম্রাজ্যকে দুর্বল করে তোলে। পর্তুগাল চার মহাদেশে নিজের শক্তি ছড়িয়ে দিয়েছিল। স্পেন বারবার ঋণখেলাপি হয়েছিল। নেদারল্যান্ডস ব্রিটেনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে নিজেই দেউলিয়া হয়ে পড়ে। দুই বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটেনের ঋণ জিডিপির ২৭০ শতাংশে পৌঁছে যায়। আজ যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ জিডিপির ১২৪ শতাংশ, আর শুধু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে ব্যয় করেছে ৮ লাখ কোটি ডলারের বেশি।

চতুর্থ ধাপ-পতন: রিজার্ভ মুদ্রাটি বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। ক্ষমতা সরে যায় অন্যত্র। প্রতিটি সাম্রাজ্যই একদিন এই বিচারক্ষণের মুখোমুখি হয়েছে।

এরপর কী? ইতিহাস কিছু ইঙ্গিত দেয়। স্পেন ১৫৮০ সালে পর্তুগাল দখল করার পর পর্তুগাল আর তার প্রভাব ফিরে পায়নি। আমেরিকা মহাদেশ থেকে বিপুল সম্পদ পাওয়ার পরও স্পেন শতাব্দীব্যাপী পতনের পথে যায়। নেদারল্যান্ডস সমৃদ্ধ ছিল, কিন্তু প্রভাব সীমিত হয়ে পড়ে আঞ্চলিক পর্যায়ে। আর ব্রিটেন আজও ধনী বটে। কিন্তু ১৯৪৫ সালের পর তার সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ে। বৈশ্বিক নেতৃত্ব ফিকে হয়ে যায়। ১৯৫০-এর দশকে বিশ্বের মোট বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের ৫৫ শতাংশই ছিল স্টার্লিং পাউন্ডে। কিন্তু মাত্র দুই দশকের মধ্যে সেই হার দ্রুত নেমে আসে। ব্রিটেন গত হয়ে আর্বিভাব হয় আমেরিকার।

তবে এই পরিবর্তনগুলো রাতারাতি ঘটে না। ব্রিটেনের পতনও ছিল ধীরে। আমেরিকা অর্থনৈতিকভাবে ব্রিটেনকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল অনেক আগেই। কিন্তু ডলার পাউন্ডের জায়গা নিতে সময় নেয় আরও কয়েক দশক। এখনও ধীরে পরিবর্তন হচ্ছে। এবার তা হচ্ছে চীন ও উদীয়মান বহুমেরু বিশ্বের উত্থানের সঙ্গে। ইতিহাস বলছে, প্রতিটি বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রার আয়ু গড়ে প্রায় ৯৫ বছর। মার্কিন ডলার এখন পর্যন্ত ৮১ বছর ধরে টিকে আছে।

নতুন আর্থিক যুগের নেতৃত্ব নেবে কে? কোনো একক শক্তি, নাকি এক বহুমেরু বিশ্ব।
নতুন আর্থিক যুগের নেতৃত্ব নেবে কে? কোনো একক শক্তি, নাকি এক বহুমেরু বিশ্ব।

আর মার্কিন ডলারের সব সতর্ক সংকেতই এখন পরিচিত। ডলারের বৈশ্বিক অংশ ৭০ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে ৫৮ শতাংশে। মার্কিন ট্রেজারি বন্ডে বিদেশি বিনিয়োগ কমছে। ব্রিকস বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলছে। পেট্রো ডলার চুক্তি ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে। আর আমেরিকার সামরিক উপস্থিতি ছড়িয়ে আছে ১৩০টি দেশে প্রায় নয় শ ঘাঁটিতে। পাঁচ শতাব্দীর অর্থনৈতিক ইতিহাসে যে ধারা বারবার ফিরে এসেছে, আজ সেটিই আবার ঘটছে।

প্রশ্ন একটাই: এই রূপান্তর কি ঘটবে ধীরে, ব্রিটেনের পতনের মতো? নাকি হঠাৎ, নেদারল্যান্ডসের পতনের মতো? নতুন আর্থিক যুগের নেতৃত্ব নেবে কে? কোনো একক শক্তি, নাকি এক বহুমেরু বিশ্ব। যেখানে একাধিক মুদ্রা ভাগাভাগি করবে প্রভাব? ইতিহাস কখনো একেবারে পুনরাবৃত্ত হয় না। কিন্তু তার ছন্দ ফিরে আসে। আর যদি সেই ছন্দ এবারও সত্য হয়– তাহলে বলা যায়, আমরা এখন মার্কিন ডলারের আধিপত্যের শেষ অধ্যায়ের দিকে এগোচ্ছি।

বিষয়: আমেরিকাব্রিটেনমার্কিন ডলারবিশ্লেষণঅর্থনীতির খবরবিশ্ব অর্থনীতিপর্তুগাল
Advertisement
সর্বশেষ
  • ১

    সাংবাদিক নিধি রাজদানের সঙ্গে বিয়ে সারলেন কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর

  • ২

    মিরপুরে ৩ মেট্রোস্টেশন বন্ধ, পুলিশের গাড়িতে আগুন

  • ৩

    ‘মাদরাসার সভাপতি-সেক্রেটারিও জানে না সেখানে কী পড়ানো হয়’

  • ৪

    ‘শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি পূরণে কোনো সরকারই দায়িত্ব পালন করেনি’

  • ৫

    চুয়েটের শিক্ষার্থীরা ক্লাসে ফিরছেন, এক মাসের ঘাটতি মিটবে কীভাবে?

সম্পর্কিত
  • ইরান যুদ্ধ: বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছে উপসাগরীয় দেশগুলো

    ইরান যুদ্ধ: বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছে উপসাগরীয় দেশগুলো

    ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য এক কঠিন বাস্তবতা তৈরি করেছে। সামরিক শক্তি বৃদ্ধি, কূটনৈতিক তৎপরতা কিংবা হরমুজ প্রণালির বিকল্প জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা—কোনো উদ্যোগই এখন পর্যন্ত তাদের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি

  • এইচএসসির ফলাফলে বিপর্যয়, দায় কি শুধু শিক্ষার্থীর, নাকি রাষ্ট্রেরও?

    এইচএসসির ফলাফলে বিপর্যয়, দায় কি শুধু শিক্ষার্থীর, নাকি রাষ্ট্রেরও?

    গত ২২ বছরের মধ্যে চলতি বছর এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের জন্য প্রচলিত মূল্যায়ন ব্যবস্থা, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের অভাবকে দায়ী করছেন শিক্ষাবিদরা। তারা বলছেন, শিক্ষাদানের দুর্বলতার পাশাপাশি উত্তরপত্র মূল্যায়নের প্রথাগত পদ্ধতিও এই ফলাফলের জন্য দায়ী।

  • রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে পশ্চিম ইউরোপ

    রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে পশ্চিম ইউরোপ

    পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলো দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফ্রান্স, স্পেন ও পর্তুগালের মতো দেশে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ, তরুণ প্রজন্মের অসন্তোষ, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রচলিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আস্থাহীনতা ইউরোপের বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ

  • ইরান ও ইউক্রেন: যুদ্ধই গিলে খাবে ট্রাম্পকে!

    ইরান ও ইউক্রেন: যুদ্ধই গিলে খাবে ট্রাম্পকে!

    ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন ট্রাম্পের জন্য শুধু কংগ্রেসের আসনসংখ্যা নির্ধারণের লড়াই নয়; এটি তার পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর মার্কিন জনগণের মূল্যায়নেরও পরীক্ষা। ইউক্রেনের প্রতি অবস্থান পরিবর্তন, ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপ এবং শুল্কনীতির কারণে সৃষ্ট অসন্তোষ রিপাবলিকান ভোটব্যাংকেও প্রভ