
অস্ট্রেলিয়ায় শিক্ষার্থী ভিসার কঠোর নীতি পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ, বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে প্রভাব
অস্ট্রেলিয়া সরকারের নতুন উদ্যোগে ভবিষ্যতে ভিসা আবেদন প্রক্রিয়ার কিছু পরিবর্তন আসতে পারে। তবে কঠোর নীতি পুনর্বিবেচনা করা মানেই ভিসা পাওয়া সহজ হয়ে গেছে, এমন নয়।
একটি গাছকে আমরা যখন দেখি, তখন তার কাণ্ড, ডালপালা, পাতা, ফুল কিংবা ফলই আমাদের চোখে পড়ে। গাছটি কতটা বড় হয়েছে, কতটা ছায়া দিচ্ছে, কত সুন্দর ফুল ফুটিয়েছে কিংবা কত ফল ধরেছে, আমরা তা সহজেই দেখতে পাই। কিন্তু মাটির নিচে তার শিকড় কতটা গভীরে গেছে, কত কঠিন মাটি ভেদ করেছে, কত পাথরের সঙ্গে লড়াই করে পথ তৈরি করেছে, কতটা পানি খুঁজে নিয়েছে, তার কিছুই আমরা দেখতে পাই না। অথচ গাছের দৃশ্যমান অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় ভিত্তি সেই অদৃশ্য শিকড়।
মানুষের জীবনও অনেকটা তেমন। আমরা একজন মানুষের সাফল্য দেখি, তার অবস্থান দেখি, তার পরিচিতি দেখি, তার সম্পদ দেখি, তার অর্জন দেখি। কিন্তু তার সেই জায়গায় পৌঁছানোর পেছনে কত রাতের নির্ঘুম পরিশ্রম, কত ব্যর্থতা, কত অপমান, কত অপেক্ষা, কত ত্যাগ, কত ভয় জয় করা এবং কতবার নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার গল্প আছে, তা আমরা খুব কমই দেখি। আমরা ফল দেখি, শিকড় দেখি না।
আর এখানেই মানুষের প্রতি আমাদের সবচেয়ে বড় অন্যায়গুলোর একটি ঘটে। কেউ যখন প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে পারে না, তখন আমরা খুব সহজেই প্রশ্ন করি, “তুমি পারলে না কেন?” “অন্যরা পারল, তুমি পারলে না কেন?” যেন সাফল্য কেবল পরিশ্রমের সরল ফল এবং যার হাতে ফল নেই, তার শিকড়ও নিশ্চয়ই দুর্বল। অথচ প্রকৃতি আমাদের অন্য কথা শেখায়। একটি গাছকে যত্ন দেওয়া হলেও সবসময় একই সময়ে ফুল বা ফল নাও আসতে পারে। মাটি, পানি, আলো, আবহাওয়া, রোগ কিংবা এমন অনেক কারণ থাকতে পারে, যা গাছের নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তবু তার শিকড় মাটির নিচে কাজ করে যায়।
মানুষের ক্ষেত্রেও তাই। আজ যে মানুষটি দৃশ্যমান সাফল্য অর্জন করতে পারেনি, তার ভেতরে হয়তো এমন অনেক পরিবর্তন ঘটছে, যা এখনো চোখে পড়ছে না। সে হয়তো শিখছে, শক্ত হচ্ছে, নিজেকে তৈরি করছে, ভুল থেকে উঠে দাঁড়াচ্ছে। ফল এখনো আসেনি বলে শিকড়ের বৃদ্ধি থেমে গেছে, এমন ভাবার কোনো কারণ নেই।
তবে এখানেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে, সব উচ্চতা কি সাফল্য? সব সংগ্রাম কি মহৎ?
সংগ্রাম মানেই যে নৈতিকতা, তা নয়। একজন মানুষ নিজের স্বপ্ন পূরণের জন্য বছরের পর বছর পরিশ্রম করতে পারে, ব্যর্থতার পর আবার উঠে দাঁড়াতে পারে, জ্ঞান অর্জন করতে পারে, নিজের চরিত্র ও দক্ষতা গড়ে তুলতে পারে। আবার অন্য একজনও প্রচণ্ড পরিশ্রম করতে পারে, কিন্তু সেই সংগ্রামের উদ্দেশ্য হতে পারে ক্ষমতার কাছাকাছি যাওয়া, চাটুকারিতা করা, সারাদিন কোনো নেতার পেছনে দৌড়ানো, অন্যায়ের সঙ্গে আপস করা কিংবা দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদ ও প্রভাব অর্জন করা। সেখানেও সময় আছে, শ্রম আছে, ঝুঁকি আছে, কখনো অপমান সহ্য করার ক্ষমতাও আছে। অর্থাৎ সেটিও এক ধরনের সংগ্রাম। কিন্তু সেই সংগ্রাম মানুষকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, সেটিই আসল প্রশ্ন।
একজনের সংগ্রাম তার শিকড়কে গভীর করে, অন্যজনের সংগ্রাম হয়তো তাকে ওপরে তোলে, কিন্তু ভেতর থেকে শূন্য করে দেয়। একজন নিজের শক্তিতে দাঁড়াতে শেখে, অন্যজন অন্যের ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে নিজের উচ্চতা তৈরি করে। দুজনেরই উচ্চতা হতে পারে, দুজনেরই সংগ্রাম থাকতে পারে, কিন্তু তাদের উচ্চতার ভিত্তি এক নয়।
প্রকৃতির দিকে তাকালে আমরা পরজীবিতা, প্রতিযোগিতা, সহাবস্থান এবং পারস্পরিক নির্ভরতার নানা রূপ দেখতে পাই। কিন্তু প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মে চলে। একটি লতা অন্য গাছকে অবলম্বন করে ওপরে উঠতে পারে, কোনো জীব অন্য জীবের ওপর নির্ভর করে বাঁচতে পারে। সেখানে নৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রশ্ন নেই। মানুষ সেখানে আলাদা। মানুষ জানে, বোঝে, বিচার করতে পারে। তার বিবেক আছে। সে জানে কোনটি ন্যায়, কোনটি অন্যায়, কোনটি সম্মানের, আর কোনটি নিজের স্বার্থে অন্যের অধিকার ও মর্যাদা বিসর্জন দেওয়া।
এই কারণেই মানুষের কিছু আচরণকে শুধু ‘সংগ্রাম’ বলে মহিমান্বিত করা যায় না। ক্ষমতার পেছনে ছোটা, চাটুকারিতা, প্রতারণা কিংবা দুর্নীতির মাধ্যমে ওপরে ওঠার জন্য যে শ্রম দেওয়া হয়, সেটি সংগ্রাম হতে পারে, কিন্তু তা মনুষ্যত্বের বিকাশের সংগ্রাম নয়। বরং অনেক সময় তা মানুষের ভেতরের নৈতিক শক্তিকে ক্ষয় করার সংগ্রাম। রূপক অর্থে একে ক্ষমতার পরজীবী আচরণ বলা যেতে পারে, কারণ সেখানে নিজের শক্তিতে দাঁড়ানোর পরিবর্তে অন্যের ক্ষমতা থেকে সুবিধা নেওয়াই হয়ে ওঠে জীবনের প্রধান কৌশল।
আমাদের সমাজে এই বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই। যখন যোগ্যতার চেয়ে পরিচয়, পরিশ্রমের চেয়ে চাটুকারিতা, সততার চেয়ে সুযোগসন্ধানিতা এবং নীতির চেয়ে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা বেশি মূল্য পেতে শুরু করে, তখন সমাজের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে চায়, তারা ভয় পেতে শুরু করে। যারা সত্য বলতে চায়, তারা একসময় নীরব হয়ে যায়। আর যারা অন্যায়কে প্রশ্রয় দিয়ে ক্ষমতার সুবিধা নেয়, তারা ধীরে ধীরে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
এখানেই মানুষ ও অন্য জীবের মধ্যে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি ফিরে আসে। মানুষ নিজেকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব বলে মনে করে। তার জ্ঞান আছে, বিজ্ঞান আছে, প্রযুক্তি আছে, অসাধারণ সৃষ্টিশীল ক্ষমতা আছে। কিন্তু মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব কি শুধু তার বুদ্ধিতে? তার শক্তিতে? তার সম্পদে? তার ক্ষমতায়? নাকি তার আসল শ্রেষ্ঠত্ব তার বিবেকে?
কারণ মানুষ যদি জ্ঞান ব্যবহার করে অন্যকে ঠকায়, ক্ষমতা ব্যবহার করে অন্যায় করে, বুদ্ধি ব্যবহার করে দুর্নীতির পথ তৈরি করে এবং নিজের স্বার্থে সত্য ও বিবেককে বিক্রি করে দেয়, তাহলে তার জ্ঞান তাকে শক্তিশালী করতে পারে, কিন্তু মহৎ করে না। বরং মানুষের সবচেয়ে বড় বিপদ তখনই, যখন তার বুদ্ধি বেড়ে যায়, কিন্তু বিবেক ছোট হয়ে যায়।
তাই কাউকে শুধু তার ফল দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। যে মানুষটি আজও তার কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছাতে পারেনি, তার শিকড় হয়তো অনেক গভীরে যাচ্ছে। তাকে অপমান করার আগে তার অদৃশ্য সংগ্রামের কথা ভাবা দরকার। আবার যে মানুষটি খুব দ্রুত ওপরে উঠে গেছে, তার উচ্চতা দেখেই তাকে সফল বলে ধরে নেওয়াও ঠিক নয়। দেখতে হবে, তার শিকড় কোথায়, তার শক্তির উৎস কী, এবং সেই উচ্চতার নিচে তার বিবেক কতটা অটুট।
জীবনে ধীরে চলা লজ্জার নয়। দেরিতে ফল আসাও ব্যর্থতা নয়। কখনো কখনো সবচেয়ে শক্তিশালী গাছটিই সবচেয়ে বেশি সময় নিয়ে তার শিকড় গভীরে পাঠায়। মানুষের জীবনেও তাই। আজ আপনি যেখানে আছেন, সেটিই আপনার শেষ পরিচয় নয়। হয়তো আপনার ফল এখনো আসেনি, কিন্তু আপনার শিকড় তৈরি হচ্ছে। ব্যর্থতা আপনাকে শেখাচ্ছে, অপেক্ষা আপনাকে ধৈর্য দিচ্ছে, কষ্ট আপনাকে শক্ত করছে, আর প্রতিটি পতন আপনাকে আবার দাঁড়াতে শেখাচ্ছে।
তাই অন্যের ফল দেখে নিজের শিকড়কে ছোট করবেন না। অন্যের উচ্চতা দেখে নিজের পথকে ব্যর্থ ভাববেন না। মনে রাখুন, যে গাছের শিকড় গভীরে যায়, সে ঝড় এলে হয়তো দুলবে, কিন্তু সহজে উপড়ে যায় না।
মানুষের জীবনেও সত্যিকারের সাফল্য শুধু কতটা ওপরে উঠলাম, তার নাম নয়। সাফল্য হলো, কতটা গভীরে গিয়ে নিজেকে তৈরি করতে পেরেছি, কতটা সততা ধরে রাখতে পেরেছি, কতটা প্রতিকূলতার মধ্যেও মানুষ হয়ে থাকতে পেরেছি।
সব সংগ্রাম আমাদের ওপরে তোলে না। কিছু সংগ্রাম আমাদের ভেতর থেকে বড় করে, আর কিছু সংগ্রাম আমাদের ভেতর থেকে ছোট করে। তাই প্রশ্ন শুধু, “আমি কতদূর এগিয়েছি?” নয়। আরও বড় প্রশ্ন হলো, “এই পথ চলতে চলতে আমি কী হয়ে উঠেছি?”
শেষ পর্যন্ত মানুষের আসল উচ্চতা তার অবস্থানে নয়, তার চরিত্রে। তার আসল শক্তি তার ক্ষমতায় নয়, তার বিবেকে। আর তার আসল সাফল্য শুধু মাথা কতটা ওপরে উঠেছে, তা নয়, তার শিকড় কতটা গভীরে গেছে।
কারণ গাছকে ঝড়ের মধ্যে টিকিয়ে রাখে তার অদৃশ্য শিকড়, আর মানুষকে কঠিন সময়ের মধ্যেও মানুষ করে রাখে তার অদৃশ্য বিবেক।
লেখক: সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন। বর্তমানে সুইডেনপ্রবাসী
ই-মেইল: [email protected]
সাংবাদিক নিধি রাজদানের সঙ্গে বিয়ে সারলেন কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর
মিরপুরে ৩ মেট্রোস্টেশন বন্ধ, পুলিশের গাড়িতে আগুন
‘মাদরাসার সভাপতি-সেক্রেটারিও জানে না সেখানে কী পড়ানো হয়’
‘শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি পূরণে কোনো সরকারই দায়িত্ব পালন করেনি’
চুয়েটের শিক্ষার্থীরা ক্লাসে ফিরছেন, এক মাসের ঘাটতি মিটবে কীভাবে?

অস্ট্রেলিয়ায় শিক্ষার্থী ভিসার কঠোর নীতি পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ, বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে প্রভাব
অস্ট্রেলিয়া সরকারের নতুন উদ্যোগে ভবিষ্যতে ভিসা আবেদন প্রক্রিয়ার কিছু পরিবর্তন আসতে পারে। তবে কঠোর নীতি পুনর্বিবেচনা করা মানেই ভিসা পাওয়া সহজ হয়ে গেছে, এমন নয়।

খাবার নষ্ট করার মধ্যে গর্বের কী আছে?
খাবার শুধু মুখে তোলার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের ক্ষুধা, মর্যাদা, বিবেক ও দায়িত্ববোধ। মুখের খাবার যখন বুকের ভেতর প্রশ্ন জাগায়, তখনই হয়তো মানুষ হিসেবে আমাদের সত্যিকারের জাগরণ শুরু হয়।

মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের মেডিকেল পরীক্ষার ফি ৮ হাজার টাকা নির্ধারণ
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, মেডিকেল সেন্টারগুলোর কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও পরিদর্শন করা হবে। কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আমিরাতে বাংলাদেশি দুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এইচএসসির ফলাফল সন্তোষজনক
আবুধাবির শেখ খলিফা বিন জায়েদ বাংলাদেশ ইসলামিয়া প্রাইভেট স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিল ১৫ জন শিক্ষার্থী। ১৫ শিক্ষার্থীই পরীক্ষায় কৃতকার্য হয়েছেন। পাসের হার শতভাগ।