রাজধানীর গুলশানে চার বছর বয়সী সাইবেরিয়ান হাস্কি জাতের পোষা কুকুর ‘কাই’কে গাড়িচাপা দিয়ে হত্যায় অভিযুক্ত গাড়িটি শনাক্ত করেছে পুলিশ। কালো রঙের টয়োটা ফরচুনার গাড়িটির নিবন্ধন নম্বরসহ গতকাল মঙ্গলবার রাতে গুলশান থানায় দণ্ডবিধির ৪২৮/৪২৯ ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।
তবে ঘটনার সময় গাড়িটির চালকের আসনে কে ছিলেন, তা নিশ্চিত হতে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ ও তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
গত ২২ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টার দিকে গুলশান-২-এর ৬৩ নম্বর সড়কে খেলছিল পোষা কুকুর কাই। সে সময় একটি কালো টয়োটা ফরচুনার গাড়ি মোড় ঘোরানোর সময় সড়কে সামনে বসে থাকা কুকুরটির ওপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দেয়।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ঘটনার পরপরই পথচারী ও স্থানীয় ভবনের নিরাপত্তাকর্মীরা গাড়িটি থামানোর চেষ্টা করলেও চালক গাড়ি থেকে নামেননি; জানলা নামিয়ে কিছু মুহূর্ত অবস্থান করেই দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন।
কুকুরটির অভিভাবক ইপ্সা নাজিয়া আদিবা ঘটনার পর সিসিটিভি ফুটেজে গাড়ির নম্বর স্পষ্টভাবে দেখা না যাওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিচার চেয়ে পোস্ট দেন। তিনি ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘‘কাইকে যে হত্যা করেছে, সেই ব্যক্তিকে খুঁজে পেতে আমাকে সাহায্য করুন।’’
আদিবা জানান, আড়াই বছর আগে এক বন্ধুর কাছ থেকে তিনি কাইকে নিজের কাছে নিয়ে আসেন এবং তাকে নিজের সন্তানের মতো লালন-পালন করতেন।
কুকুরটির অভিভাবক ইপ্সা নাজিয়া আদিবা চরচাকে বলেন, “আড়াই বছর আগে এক বন্ধুর কাছ থেকে কাইকে এনেছিলাম। চার বছর বয়সী সাইবেরিয়ান হাস্কি ‘কাই’ আমার কাছে কেবল একটি পোষা প্রাণী ছিল না, বরং সে ছিল আমার সন্তানের মতো এবং পরিবারের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।”
সিসিটিভি ফুটেজের বিবরণ তুলে ধরে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “একটি অসহায় প্রাণীকে কোন কারণ ছাড়াই যেভাবে ইচ্ছা করে গাড়িচাপা দিয়ে চালক দ্রুত কেটে পড়েছেন, তা কোন সাধারণ দুর্ঘটনা হতে পারে না।”
এ ঘটনার সুনির্দিষ্ট বিচার দাবি করে তিনি উল্লেখ করেন, পুলিশ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত চালককে শনাক্ত করে এমন এক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে অবলা প্রাণীর প্রতি এমন নিষ্ঠুর আচরণ করার সাহস আর কেউ না পায়।
আদিবা বলেন, “গাড়ির মালিকের সঙ্গে ফোনালাপের সূত্রে আমার মনে হয়েছে- ঘটনার সময় মালিকের প্রাপ্তবয়স্ক অটিস্টিক সন্তান হয়তো চালকের আসনে ছিলেন; তবে সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রমাণের ভিত্তিতে বিষয়টি চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করার দায়িত্ব পুলিশের।”
অভিযুক্তদের পাশের ভবনের এক প্রতিবেশী অডিও বার্তায় বলেন, “অভিযুক্ত পরিবারটির একটি প্রতিবন্ধী সন্তান রয়েছে এবং তাকে নিয়ে গাড়িটি প্রায়ই এলাকায় ঘুরে বেড়ায়, যার পেছনের অংশে স্পষ্ট আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।”
তিনি বলেন, “ওই পরিবারটির মধ্যে আগে থেকেই কুকুর নিয়ে তীব্র অসন্তোষ ছিল এবং এলাকার রাস্তার কুকুরকে খাবার দেওয়া নিয়েও তারা প্রতিনিয়ত আপত্তি জানাতেন। মূলত সেই পুরানো কুকুর বিদ্বেষ ও ক্ষোভ থেকেই পরিকল্পিতভাবে এই ঘটনা ঘটানো হয়ে থাকতে পারে।”
ঘটনাটি নিয়ে অপর এক প্রতিবেশী গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “কাইয়ের ঘটনার মাত্র চার-পাঁচ দিন আগেই ওই একই রাস্তায় আমার একটি পোষা কুকুরও অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে গাড়ি দুর্ঘটনার শিকার হয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছে।”
পর পর এলাকায় কুকুর চাপা পড়ার ঘটনার উল্লেখ করে তিনি ক্ষোভের সঙ্গে প্রশ্ন তোলেন, চালক কি স্রেফ অবহেলা নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে একের পর এক প্রাণীকে গাড়িচাপা দিয়ে চলেছে- তা পুলিশি তদন্তে বেরিয়ে আসা জরুরি।
পরে ফেসবুক পোস্টের সূত্র ধরে স্থানীয় বাসিন্দাদের সহায়তায় গত ১২ অক্টোবর গুলশানের ৬৮ নম্বর সড়কের একটি বাসা থেকে গাড়িটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
গুলশান থানার দায়িত্বরত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) আলমগীর বলেন, “ইপ্সা নাজিয়া আদিবার লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা নিয়ে আইনি প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে।”
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। চালকের অবহেলার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেলেও সুনির্দিষ্টভাবে চালকের আসনে কে ছিলেন, তা সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রমাণের ভিত্তিতে নিশ্চিত হয়ে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”