বাণিজ্যিকীকরণ, নগরায়ণ, কৃষি কার্ড বিতরণে স্বজনপ্রীতি ও অন্য পেশায় স্থানান্তরসহ মোট ১১টি প্রধান কারণে দেশের কৃষি খাতে নারীদের অংশগ্রহণ আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি)-এর এক সাম্প্রতিক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
আজ রোববার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘ভূমি ও কৃষিতে নারী কৃষকের অধিকার এবং খাদ্য নিরাপত্তা: আমাদের করণীয়’ শীর্ষক এক সেমিনারে গবেষণাটির ফলাফল ও বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরা হয়। সেমিনারে বক্তারা কৃষিতে নারীদের অবদান, তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি, মজুরি বৈষম্য এবং সহিংসতা ও নিরাপত্তার নানা দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
সেমিনারে কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তায় নারীর ভূমিকা তুলে ধরে মানবাধিকার কর্মী ও সমাজসেবী খুশী কবির বলেন, ‘‘ফসল উৎপাদন থেকে শুরু করে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই নারীর অনন্য অবদান রয়েছে। তবে কৃষিতে তাদের কতটুকু অধিকার দেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। পরিবার, সমাজ ও পুরুষদের অনুধাবন করতে হবে যে নারীর সঠিক স্বীকৃতি ও সমতা ছাড়া সমাজ কখনোই এগোতে পারে না।’’
রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ বাংলাদেশের সহকারী পরিচালক সুরাইয়া বেগম বলেন, সামাজিক কাঠামোগত বৈষম্যের কারণে নারীরা প্রতিনিয়ত অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ভূমিতে নারীদের একক স্বত্ব নেই, এমনকি সরকারি খাস জমিও তাদের একক নামে দেওয়া হয় না। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্টি হওয়া প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন নারী কৃষকরাই। তিনি অবিলম্বে কৃষিমজুরদের ‘কৃষক’ হিসেবে পূর্ণ স্বীকৃতি দেওয়া, কৃষির নীতি নির্ধারণে নারীদের অন্তর্ভুক্ত করা এবং করপোরেট কোম্পানিগুলোর আগ্রাসী খাদ্য রাজনীতি বন্ধের দাবি জানান।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষক ড. নাজিম উদ্দিন জানান, দেশের নারীরা প্রতিদিন গড়ে ৬ ঘণ্টা কৃষিতে অবৈতনিক শ্রম দিচ্ছেন এবং জাতীয় জিডিপিতে তাদের অবদান প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। অথচ সমাজে তাদের সঠিক স্বীকৃতি নেই। আজ নারীরা আর কেবল ‘সহায়ক কৃষক’ হিসেবে সীমিত থাকতে চান না, তারা পূর্ণাঙ্গ কৃষকের মর্যাদা চান।
সেমিনারে বক্তারা জানান, বাণিজ্যিকীকরণ ও নগরায়ণ, প্রবাসী আয়ের প্রভাব, দুর্গম এলাকায় কৃষি কর্মকর্তাদের সেবাদানে অনিহা, সুবিধাভোগীদের তালিকা থেকে বাদ পড়া, অন্য পেশায় স্থানান্তর, স্বীকৃতি না পাওয়া, বাজারের ন্যায্য মূল্যের অভাব, সীমান্ত এলাকায় মাদকের বিস্তার, কৃষি কার্ড বিতরণে স্বজনপ্রীতি, কৃষি উপকরণের চড়া দাম এবং জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব—এই ১১টি প্রধান কারণে মূলত কৃষিতে নারীদের সম্পৃক্ততা কমছে।
সেমিনার থেকে সরকারি খাস জমি উদ্ধার করে ভূমিহীনদের মধ্যে সমতার ভিত্তিতে নারী কৃষকদের বরাদ্দ দেওয়া, লিঙ্গভিত্তিক মজুরি বৈষম্য দূর করা এবং নারী কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তিগত ব্যবহারে দক্ষ করে তোলার জোর দাবি জানানো হয়।