রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থীদের সঙ্গে রেলওয়ে কর্মীদের বারবার সংঘাতের ঘটনায় চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। গত জুলাইয়ে ট্রেনের ভেতর এক শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগের পর সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে আরও দুই শিক্ষার্থীকে হেনস্তা ও মারধরের অভিযোগ উঠেছে ট্রাভেলিং টিকেট এক্সামিনার (টিটিই) ও রেলওয়ে নিরাপত্তা কর্মীদের (আরএনবি) বিরুদ্ধে।
সর্বশেষ গত রোববার রাতে রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে দুই শিক্ষার্থীকে বেধড়ক মারধরের ঘটনা ঘটে। এতে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা স্টেশনে গিয়ে ভাঙচুর চালান। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ঘটনার তদন্তে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় পেলেই রেলকর্মীদের আচরণ আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ২১ জুলাই রাবির আইন বিভাগের (২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষ) শিক্ষার্থী ফোরকান উদ্দীনকে ঢাকা থেকে রাজশাহীগামী পদ্মা এক্সপ্রেস ট্রেনে মারধর ও হেনস্তা করা হয়। যাত্রীদের কাছ থেকে রসিদ ছাড়া টাকা আদায়ের প্রতিবাদ করায় ৬-৭ জন টিটিই তার গলা ধরে দুই বগির মাঝখানে নিয়ে ঘাড়ে ও পিঠে মারধর করেন এবং জানালা দিয়ে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা চালান।
ওই ঘটনার প্রতিবাদে পর দিন চারুকলা এলাকায় আট ঘণ্টা রেলপথ অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। পরে রেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠকে চার দফা দাবি মেনে নেওয়া হলে এবং অভিযুক্ত টিটিইকে বরখাস্ত করা হলে অবরোধ তুলে নেওয়া হয়। একই সাথে বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনে যাত্রাবিরতির সিদ্ধান্ত হয়, যা আগামী ১৫ অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়ার কথা।
এদিকে, গত ১৭ সেপ্টেম্বর রাতে খুলনা থেকে রাজশাহীগামী সাগরদাঁড়ি এক্সপ্রেস ট্রেনে চেইন টানাকে কেন্দ্র করে এগ্রোনমি অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল এক্সটেনশন বিভাগের (২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষ) শিক্ষার্থী মৃন্ময় চক্রবর্তীকে একাধিক টিটিই হেনস্তা করেন।
ঘটনার ধারাবাহিকতায় গত রোববার রাতে রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের দুই শিক্ষার্থীর সঙ্গে রেলওয়ে নিরাপত্তাকর্মীদের কথা কাটাকাটি হয়। এর প্রতিবাদ জানাতে গেলে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী আইয়ুব আলীকে বেধড়ক পেটায় রেলওয়ের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। এ সময় রেলকর্মীরা ‘চাকরি গেলে যাবে, তবু দুই একটা ছাত্র মরুক’ বলে হামলা চালায় এবং একপর্যায়ে ওই শিক্ষার্থীর গায়ে থুথু নিক্ষেপ করে বলে অভিযোগ ওঠে। এমনকি এক শিক্ষার্থীর গায়ে রাবির লোগোযুক্ত টি-শার্ট দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করে মারধর করা হয়।
বর্তমানে আইয়ুব আলী রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (রামেক) চিকিৎসাধীন। সহকারী প্রক্টর গিয়াসউদ্দিন জানিয়েছেন, তার অবস্থা আশঙ্কাজনক। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষার্থীরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং রাতে স্টেশনে গিয়ে ভাঙচুর চালান।
রাকসু জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, ‘‘জুলাইয়ের ঘটনার পর টিটিই বরখাস্ত ও বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনে যাত্রাবিরতির সিদ্ধান্ত রেলকর্মীরা মেনে নিতে পারছে না। সেই ক্ষোভ থেকেই তারা রাবি শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হচ্ছে। কোনো শিক্ষার্থী অন্যায় করলে আইনে বিচার হোক, কিন্তু এভাবে ফেলে পেটানো মেনে নেওয়া যায় না।’’
রাবি প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান বলেন, ‘‘ঘটনাগুলো উদ্বেগজনক। রেল কর্তৃপক্ষের পেশাদারিত্বের অভাব রয়েছে। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় দায় সবার, যৌথভাবে সমাধান দরকার।’’
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘‘অতীতের কোনো ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় তারা বারবার এমন সাহস পাচ্ছে। আমরা জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।’’
সামাজিক-নাগরিক সংগঠন রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান বলেন, ‘‘বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়ে হামলা বা মারধর বরদাশতযোগ্য নয়। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সম্পদ স্টেশনে ভাঙচুরকারীদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। টিটিই ও আনসার সদস্যদের রাজনৈতিক প্রভাববলয় বা ক্ষমতার প্রভাবই এই সংঘাতের অন্যতম কারণ। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে এটি বড় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে।’’
রাবি শিক্ষার্থীকে মারধর ও ভাঙচুরের ঘটনা তদন্তে চার সদস্যের কমিটি গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক আহম্মদ হোসেন মাসুম।
কমিটির সদস্যরা হলেন- বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা মোসাম্মাৎ হাসিনা খাতুন, বিভাগীয় চিকিৎসা কর্মকর্তা ড. মো. শাকিল আহমেদ, আরএনবি কমান্ড্যান্ট রেজওয়ানুর রহমান এবং বিভাগীয় সংকেত ও টেলিযোগাযোগ প্রকৌশলী আহমেদ ইশতিয়াজ জহুর তানিম।
এর পাশাপাশি জেলা বিভাগীয় কমিশনারকেও আলাদা একটি কমিটি গঠনের অনুরোধ জানিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ। পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের জিএম আহম্মদ হোসেন মাসুম বলেন, ‘‘রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন দূরত্ব কাম্য নয়। আমি নিজে প্রতি মাসে অন্তত একবার শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে বসে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেব।’’